|
বাংলা একাডেমীর ফেলোশিপে ভূষিত ড.কাজুও আজুমা |
| Print | |
E-mail |
|
পিবি সরকার
বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর কর্মসাধনা শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে বাংলা ভাষা শিক্ষার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৭ সালে তিনি শানি-নিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি বিভাগে অধ্যাপক হয়ে যান, সেখানে ছিলেন আড়াই বছর। এই সময় তিনি এবং তাঁর মহীয়সী স্ত্রী অধ্যাপিকা কেইকো আজুমা দুজনেই গভীরভাবে বাঁধা পড়েন বাঙালি ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রীতিবন্ধনে। জাপানে ফিরে এসে ১৯৭১ সালে গঠন করেন ‘টেগোর সমিতি জাপান’, গ্রহণ করেন কিছু প্রকল্প। এর মধ্যে শুরু হয় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ। জাপানে তিনি অন্যান্য প্রবাসী বাঙালি ও জাপানিদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন, শরণার্থীদের জন্য অর্থসংগ্রহ ইত্যাদি কাজে ব্যাপৃত হয়ে পড়েন। তার মধ্যেই চলতে থাকে তাঁর বাংলা সাহিত্য নিয়ে গভীর অভিনিবেশসহকারে পড়ালেখা, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গবেষণা। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাপানে রাষ্ট্রীয় সফরে এলে পরে তিনি তাঁর দোভাষী এবং সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তখনই বঙ্গবন্ধুর ভক্ত হিসেবে মুজিব-পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। ১৯৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধু নিহত হন বহু জাপানির মতো তিনিও গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন। প্রায়শ তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যাদ্বয়ের খোঁজখবর নিতেন। বাংলাদেশে এবং জাপানেও একাধিকবার তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন- রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত রচনাসমূহের জাপানি অনুবাদ প্রকাশের প্রধান উদ্যোগী হিসেবে কাজ করেন। ১২ খন্ডে প্রকাশিত এরকম বড় কাজ আর কোনো দেশে হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক কাজ। ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা ছিল: শানি-নিকেতনে একটি জাপান বিষয়ক প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করা যা ছিল কবি রবীন্দ্রনাথের আমৃত্যু একটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের বাস-বায়নই ১৯৯৪ সালে স'াপিত ‘নিপ্পনভবন’ যা উদ্বোধন করেন তৎকালীন ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি আর কে নারায়ানণ। এই প্রকল্পটি নিয়ে তাঁকে বহুবার টোকিও-কলকাতা-দিল্লী যাতায়াত করতে হয়েছে। কাজেই বোঝা যায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে কী পরিমাণ ভালোবাসেন। সারা জীবন ভর কত লেখা যে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ এবং বাংলা-বাঙালি নিয়ে, কত বক্তৃতা দিয়েছেন, অনুষ্ঠান করেছেন, দুই বাংলার পথেপ্রান-রে ঘুরে বেড়িয়েছেন তার হিসেব করলে তালিকা দীর্ঘই হতে থাকবে। তাঁর আমন্ত্রণে দুই বাংলা অঞ্চল থেকেই কত বাঙালি জাপানে এসেছেন বিভিন্ন উপলক্ষে তারও হিসেব নেই। মোদ্দাকথা, বাঙালি হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের আরাধ্য। ‘আজুমাসান’কে চেনেন না দেশ-বিদেশের সুসংস্কৃত মানুষ এমনটি আশা করাই বাতুলতা। তাঁরই উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল ‘আন-র্জাতিক সাহিত্য সংস'া’ জাপানসহ উপমহাদেশের লেখক.সাহিত্যিকদের নিয়ে। একাধিক সম্মেলনের আয়োজনও করেছিলেন। ।
অনন্য কর্মগুণ ও সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেছেন অনেক পুরস্কার, পদক, সম্মাননা, সংবর্ধনা। তার মধ্যে ১৯৯৮ সালে কলকাতা রবীন্দ্রভারতী থেকে ‘রবীন্দ্রপুরস্কার’, ২০০০ সালে বিশ্বভারতী থেকে ‘দেশিকোত্তম’, ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ‘রবীন্দ্রপুরস্কার’ এবং ২০০৮ সালে জাপানের রাষ্ট্রীয় পদক উল্লেখযোগ্য। ‘কিন' মানুষের ভালোবাসা পাওয়াটাই আমার জন্য সবচে বড় পুরস্কার। আমি যদি আবার জন্মগ্রহণ করি তাহলে বাঙালি হিসেবে জন্ম নিতে চাই’ বলেছেন ২০০৭ সালে কলকাতায় তাঁরই উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘ভারত-জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র’ এর উদ্বোধনকালে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের সিলেটে অনুরূপ ‘বাংলাদেশ-জাপান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তাঁর বাঙালিপ্রীতির আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এ পর্যন- তিনি বাংলাদেশ থেকে কোনো পুরস্কার পাননি। ২০০৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমী তাঁকে মর্যাদাসম্পন্ন ফেলোশিপ প্রদান করে জাতিকে শাপমুক্ত করল। এই সম্মান তাঁর অনেক আগেই পাওয়া উচিৎ ছিল। গত বছর মাসিক দশদিক এর মাধ্যমে আমি একটি প্রচার চালাই এই বিষয়ে। বাংলা একাডেমীর সেটা নজরে পড়েছে এবং যোগ্যব্যক্তির যোগ্য বিবেচনায় বিরল বাঙালিপ্রেমী অধ্যাপক ড.কাজুও আজুমার এই স্বীকৃতিতে আমরা আনন্দিত এবং গর্বিত। তাঁকে জানাচ্ছি আমাদের রক্তিম অভিনন্দন। বাংলা একাডেমীকে ধন্যবাদ। দ।
বর্তমানে অধ্যাপক আজুমা চিবা-জেলার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর বয়স ৭৯ বছর, স্মৃতিশক্তিলুপ্ত এই কৃতী মানুষটি ২০০৬ সালে ‘টেগোর’ নামে শেষ নমস্কার হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছেন জীবনের শেষ গ্রন'। |