top
logo


বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সেকাল একাল | Print |  E-mail

মোহাম্মদ আশিকুর রহমান আশিক

গত ৫ মে ২০১০ইং আমি বাসযোগে আমার অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম। জিপিও পার হতেই না হতে দুজন পত্রিকার হকার গাড়িতে উঠল আর যাত্রীরা যখন পত্রিকা হাতে নিলেন তার পরপর-ই কয়েকজনের মুখে শুধু একটি সংবাদ নিয়েই সমালোচনা শুনতে লাগলাম আর তা হল বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সষ্টিটিউট ছাত্রলীগের দুই গ্র“ফের মধ্যে সংঘঠিত সংঘর্ষের সংবাদ। যাত্রীদের একটিই কথা হায়, দেশে একি হচ্ছে! অনেকে তাদের ছেলেমেয়েকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দিতে গিয়ে তাদের ভয়ের কথা বলাবলি করলেন।
শুধু বরিশালেই না আজকাল পত্রিকা হাতে নিলেই অথবা টিভি অন করলেই  চোখে পড়ে বিভিন্ন স্থানে খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির খবর। এর মধ্যে ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন রকমের সাংঘার্ষিক ঘটনা ঘটাচ্ছে যা মোটেও কেউ কোনদিন কল্পনাও করেনি যে সৃষ্টিশীল সংগঠন কর্তৃক এইভাবে ধ্বংসের মহরত চলবে। তবে এই ঘটনা আমাদের দেশে যদিও তেমন নতুন নয়। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বিগত প্রায় তিন দশক ধরে এই অস্বাভাবিক অবস্থা লণীয় পর্যায়ে চলে এসেছে এবং উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আমাদের দেশে প্রায় শতাধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে, প্রতিটি দলের রয়েছে অনেক অংগসংগঠন। এই অংগসংগঠনের মধ্যে ছাত্র সংগঠন একটি সংগঠন এবং  কোন-কোনটি বৃহৎ। গোটা দশেক দল হবে যাদের ছাত্রসংগঠন রাজনীতির মাঠে বেশ সক্রিয়। এই ছাত্রসংগঠনগুলো বর্তমানের এই ধারা যদি অব্যাহত রাখে তাহলে হয়ত এক সময় তাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে চলাফেরা করতেও সাহস হারিয়ে ফেলবে।
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বেই যাত্রা শুরু করে। ঐতিহাসিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে তার যাত্রা শুরু হয় বিশ শতকের বিশের দশকের শেষ দিকে। তবে উনিশ শতকে এই অঞ্চলে যে ছাত্ররাজনীতি একেবারেই ছিল না তা বলা যাবে না। তৎকালে ইয়ংবেঙ্গল ছিল ছাত্রদেরই একটি আন্দোলন। উনিশ শতকের সত্তরের দশকের প্রথম দিকে ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক সঞ্চারের ল্েয সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ সময়ে আনন্দমোহন বসু ছাত্রদের রাজনীতিতে যোগদানের আহবান জানিয়ে রাজনীতি বিষয়ের উপর আনুষ্ঠানিক শিাদান শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থা এবং অভিভাবক বিশেষ করে স্কুল কলেজের শিকদের কড়া শাসন ছাত্রদের রাজনীতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ঐ সময়ে ঔপনিবেশিক সরকারের একটি চাকুরির জন্য বিদ্যার্জন ছিল সকল শ্রেণীর ছাত্রের জন্য একটি উচ্চাভিলাস। ১৯২৮ সালের দিকে নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি গঠিত হয়। তার আগে অবশ্য বাঙালি ছাত্রদের কোন নিজস্ব ছাত্র সংগঠন ছিল না। নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতির সভাপতি ছিলেন প্রমোদ কুমার এবং সম্পাদক ছিলেন যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র ও ছাত্র পত্রিকার সম্পাদক বীরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত। উক্ত সংগঠনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু ও অতিথি বক্তা ছিলেন নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু। ঐ সময়ে মুসলীম অভিভাবকগণ ও রাজনৈতিক নেতাদের অনাগ্রহের কারণে ছাত্রদের রাজনীতিতে তেমন অংশগ্রহণ ছিল না । তারপর ঢাকা শহরের কয়েকজন বুদ্ধিজীবী নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে একটি ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। যার কারণে ১৯৩০ সালের ১২ জুলাই মুসলিম ছাত্রদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.শহিদুল্লাহকে দায়িত্ব দেওয়া হয় একটি ছাত্র সংগঠন গঠন করার জন্য। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালে অষষ ইবহমধষ গঁংষরস ঝঃঁফবহঃ অংংড়পরধঃরড়হ  গঠিত হয়। ঐ সংগঠনের মূলনীতি ছিল রাজনীতিতে অংশগ্রহণে বিরত থাকা। ঐ সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য লে. কর্নেল এইচ সোহরাওয়ার্দী মুসলীম ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। কিন্তু অই সংগঠনটি মুসলিম রাজনৈতিক নেতারা পরিচালনা করতেন বিধায় তাদের রাজনৈতিক দলের নানা দল- উপদল এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইত। এভাবেই ধীরে ধীরে এই সংগঠনটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হতে থাকে, টেইলর হোস্টেলের ছাত্ররা মুসলিম লীগ ও কারমাইকেল হোস্টেলের ছাত্ররা কৃষক প্রজা পার্টি এ দুটি রাজনৈতিক দলের অনুসারী হয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর এই প্রক্রিয়া আরও প্রকট আকার ধারই করে। উক্ত নির্বাচনের পর জিন্ন্াহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের বিস্তার ঘটলে ছাত্ররা মুসলিম লীগ অনুসারী হয়ে ওঠে। ১৯৩৮ সালে এই ছাত্র সংগঠনের নাম পরিবর্তন হয়ে নতুন নাম করণ হয় অষষ ইবহমধষ গঁংষরস ঝঃঁফবহঃ খবধমঁব । পুনর্গঠিত সংগঠনের সভাপতি ঢাকার আবদুল ওয়াসেক এবং সাধারণ সম্পাদক যশোরের শামসুর রহমান। পরবর্তীতে এই সংগঠন পাকিস্তান আন্দোলনে ছাত্রদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে জিন্নাহর ঘোষণার পর মুসলিম ছাত্রলীগের উপর খাজা পরিবারের প্রভাব লোপ পেতে থাকে। মুসলিম ছাত্রলীগের খাজা বিরোধী উপদলটি অষষ ইবহমধষ গঁংষরস ঝঃঁফবহঃ খবধমঁব থেকে বেরিয়ে এসে একই সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করে এবং তাদের নেতৃত্বে ঐ বছরেই শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। এই জাতীয় আন্দোলনে ছাত্রদের অবদান ছিল সর্বজনস্বীকৃত। ১৯৬৮-১৯৭১ সময়কাল ছিল ছাত্র রাজনীতির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। তবে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রদের গোপন সংগঠন ‘নিউকিয়াস’ এর ভূমিকা ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই নিউকিয়াসই ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে পরিচিত। তার পরবর্তী ৬-দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার আন্দোলন, ১১-দফা আন্দোলন এমনকি ‘৭১ সালের ২রা মার্চ স্বাধীন বাংলার প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ৩রা মার্চ ‘৭১ স্বাধীন বাংলার ইশ্তেহার পাঠ, ৭ মার্চ ’৭১ পর্যন্ত প্রায় সকল েেত্রই ছাত্রদের অবস্থান ছিল নেতৃত্বদানকারী  অবস্থানে। স্বাধীন বাংলার ‘জয়বাংলা শ্লোগান’, শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি সবই ছিল ছাত্র কর্তৃক প্রদত্ত। তৎকালে ছাত্রদের গঠনমূলক চিন্তা-ভাবনা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, দেশের জন্য আন্দোলন, সংগ্রামই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করতে থাকে। একমাত্র ছাত্রদের কারণে ছয় দফা আন্দোলন ব্যর্থ হলে তা পরবর্তীতে স্বাধীনতার আন্দোলনে অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ২৬ মার্চ ও ২৭ মার্চ ‘৭১ স্বাধীনতা ঘোষণা ছিল মূলত ৩রা মার্চ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঘোষণারই স্বীকৃতি।
স্বাধীনতা পূর্ব বিভিন্ন সময়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ও স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৯০ সালের এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণই প্রমাণ করে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন ছিল ও আছে। কিন্তু বর্তমানে যে ধারায় ছাত্র রাজনীতি চলছে তাতে প্রমাণ করে ছাত্র রাজনীতি অতীতের মতো আগামী প্রজন্মকে তেমন কোন সফলতা দিতে পারবে না। ইতিহাস থেকে যা জানলাম তা হল: স্বাধীনতার পূর্বে ছাত্ররা দেশ গঠনে রাজনীতির শিাগ্রহণ করত এবং নেতারা তাদেরকে রাজনীতির শিা দিতেন। বিভিন্ন দল ও উপদলের অনুসারী ছাত্র সংগঠনগুলো যুক্তফ্রন্ট গঠন করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে দেশ মাতৃকার গঠন ও উন্ন্য়নে সবসময় রাজনীতির চর্চা করত। এখন দেখছি ব্যাক্তি স্বার্থে ও নেতার স্বার্থে নিজ দলেই এৎড়ঁঢ়রহম সৃষ্টি করে অস্ত্র হাতে হানাহানি করছে। স্বাধীনতা পূর্ব রাজনীতি ছিল দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য এখন যা হচ্ছে সব কিছুই তার বিপরীত স্বার্থে। এখনকার ছাত্র রাজনীতিতে আমরা যা দেখছি তা যেমন ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, হত্যাকান্ড, ভর্তি বাণিজ্য, হলের সিট বাণিজ্য ইত্যাদি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ছাত্র সংগঠনগুলিকে কলুষিত করছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ে ঘটে যাওয়া মেধাবী ছাত্র হত্যাকান্ড আজ ছাত্র রাজনীতি থাকবে কি থাকবে না এই প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। অথচ একটি দেশের জন্য ছাত্ররাই হচ্ছে একমাত্র ভবিষ্যৎ কর্নধার। তাদের মধ্যে অবশ্যই রাজনীতি থাকবে তবে তা হবে অবশ্যই গঠনমূলক নতুবা জাতি অচিরেই রাজনীতি শূন্য হয়ে পরবে। বর্তমান ধারার রাজনীতি দেখে মনে হচ্ছে দেশে যত অরাজকতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আন্দোলন, মিছিল মিটিং সব কিছু ছাত্রদের মাধ্যমেই করানো হচ্ছে, আর তার ফায়দা লুটছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। মনে হচ্ছে বর্তমানে দেশে রাজনীতির নামে অপরাজনীতি চলছে, এই অপরাজনীতির কারণে ছাত্ররা কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রকৃত রাজনীতি অনুপস্থিত। এজন্যই ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ড.এমাজউদ্দিন সাহেব বলেছেন ‘ছাত্র রাজনীতির অনুপস্থিতই যত দুষ্কর্মের কারণ’ (দৈনিক প্রথম আলো, ১৪.০২.২০১০ইং)। সত্যিই যদি ছাত্র সংগঠনে ছাত্র রাজনীতি অনুপস্থিত থেকে থাকে তাহলে রাজনৈতিক নেতা ও দলকেই এর জবাব দিতে হবে কেন এই সংগঠনে রাজনীতি অনুপস্থিত আছে? এখনকার যারা সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা আছেন তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই তো স্বাধীনতা পূর্ব সেই গর্বিত ছাত্রনেতা ছিলেন তাহলে কেন, কোন্ লোভে, কিসের আশায় তাঁরা সেই আদর্শ থেকে সরে দাঁড়ালেন? কেন তাঁরা তাঁদের সেই আদর্শে অটুট থাকতে পারলেন না, কিসের ভয়ে কিসের মায়ায় অথবা কার অনুরোধে?

 

 


bottom

Designed & Developed by Doshdik Media Ltd.
House# 2, Road# 7, Sector# 3, Uttara Model Town, Dhaka-1230, Bangladesh
Phone: +880-2-8919351, +880-2-8919351, +880-2-8956608, +880-2-8956608, Fax: +880-2-8963402,
E-mail: info@doshdik.com
Doshdik Media Limited. All rights reserved.