top
logo


কেউ জানে কেউ জানে না PDF Print E-mail
Written by দশদিক ডেস্ক   
Thursday, 01 July 2010 09:38

ধারাবাহিক রচনা
শরাফুল ইসলাম

হঠাৎ ট্রেনের কামরায় ঢুকে পড়লো ৫/৬ জন যুব।  চাদর জড়ানো দেহ। মুহূর্তেই শরীর থেকে খসে পরে গেল চাদর। অন্দর মহল থেকে বেরিয়ে এলো রাইফেল আর ষ্টেনগানের নল। সবগুলো অস্ত্রের মুখ তাক করা হলো। কামরায় বসে থাকা যাত্রীর বুকের দিকে। যুবকদের মধ্য থেকে একজন বললো চিৎকার করে কোন লাভ নেই, সঙ্গে যা আছে দিয়ে দিন।

যাত্রী বললেন, তোমরা কারা ?    
এতগুলো অস্ত্রের

মুখে নির্বকার যাত্রীর এমন সাহসী প্রশ্ন শুনে হয়তো বা মুহূর্তেই মনের

ভেতরে হোচট খায় অস্ত্রধরীরা।

আমাদের চেনার দরকার নেই। আজই আপনার জীবনের শেষ দিন। আগে সঙ্গে যা যা আছে বের করুন। তোমাদেরকে দেবার মতো আমার কাছে তেমন কিছু নেই। তোমরা কি চাও। যাত্রীর উত্তর।

অস্ত্রধারীদের ইতস্ততা দেখে যাত্রী বুঝতে পারলেন যে এরা পেশাগত ডাকাত নয়। উদ্দেশ্য রাজনৈতিক।  তাই তিনি বিভিন্ন কৌশলে ওদের সঙ্গে সম্মোহনী ভাষা আর আচরনে কিছু মহৎ বাক্য উচ্চারন করলেন। দেখলেন, বন্ধুকধারীদের কণ্ঠ অবরোহনের দিকে। কথা বলতে বলতে ব্যাগ থেকে পারফিউম বের করে বললেন-তোমাদেরকে উপহার দেওয়ার মতো এই পারফিউম ছাড়া আমার কাছে আর কিছু নেই।

ঐন্দ্রজালিক ভাবে সম্মোহিত হয়ে গেল অস্ত্রধারী যুবকরা। তাদের মধ্যে থেকে একজন হাত বাড়িয়ে পারফিউমটি নিয়ে বললো, সাবধানে যাবেন। সাবধানে লিখবেন। আজ আপনি বেঁচে গেলেন।

আবার গায়ে চাদর জড়িয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলো যুবকরা। এভাবেই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছিলেন কবি আল মাহমুদ। আর এই ঘটনাকেই উপজীব্য করে তিনি লিখেছিলেন অসাধারন গল্প “সৌরভের কাছে পরাজিত”।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। পাশপাশি গদ্য সাহিত্যে তাঁর অসাধারন প্রতিভা বর্তমান কালের গদ্য লেখকদেরকেও ইর্ষান্বিত করেছে। প্রায় ৭৫ বয়সের বর্ষিয়ান এই পুরোধা কবিকে ১৯৭৮ সাল থেকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই থেকে দীর্ঘদিন প্রায় নিয়মিত দেখা, কথা, অনেকটা আড্ডার আদলে সময় কাটানো ছিল আমার সেই তারুণ্য প্রাপ্তির নিশানা। সাহিত্য প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া। পত্রিকা অফিস চষে বেড়ানো কবিদের সান্নিধ্য অর্জন কবিতার আসর, আলোচনা, সমালোচনা সব মিলিয়ে কবি কিংবা লেখক হওয়ার চেতনায় আকণ্ঠ ডুবে যাওয়া নাবিক হতে চেয়েছিলাম।

কবি আল মাহমুদ একজন অতি প্রাঞ্জল ব্যাক্তি। যিনি আমাদেরকে খুব সহজেই সেই সৌরভের কাছে পরাজিত যুবকদের মতো সম্মোহিত করেছিলেন। এত বড় মাপের একজন কবিকে কখনোই দেখিনি সামান্যতম অহংবোধের সীমারেখা স্পর্শ করতে। এক কথায় বলা যেতে পারে, তিনি একজন প্রবীন বন্ধু হিসেবে আমাদের চাহিদা মতো সময় ব্যায় করেছেন। কখনো মগবাজারের নয়াটোলার সেই খেজুর গাছের তলায়, কখনো বা এই গাছ সংলগ্ন বাসায় কখনো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে।

কবি আল মাহমুদ গল্পের ছলে তাঁর লেখার অনেক পটূভূমি সম্পর্কে বলতেন। বলতেন মনোজগতের দৃষ্টিতে অনুসন্ধানের কথা। বরাবরই তাঁর মুখ থেকে যেই যাতনার কথা আমি শুনেছি সেটা হচ্ছে দেশ প্রেম। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছিলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রনাঙ্গনের যুদ্ধের মতোই তিনি সার্বনিকভাবে অনুভবে আত্মস্ত করেন মাতৃভূমিকে, তাই আরও একবার বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসার পথেও ক’জন যুবক চাদর খুলে অস্ত্র প্রদর্শন করেছিলো কবিকে। সেই ঘটনা অন্য সময় পত্রস্ত করার আশা রাখি।

মুক্তিযোদ্ধা কবির ভাবনা এরকম  “মূলত সরকার বিরোধী মনোভাব আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি। কারণ, সদ্য স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের আশা আকাংখ্যা যেমন সর্ব মুখী, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার েেত্রও নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত সরকারের সীমাবদ্ধতা বহুমুখী। আর এই দুয়ের সমন্বয়হীনতায় কারণে সংবাদপত্রের পাতায় বিভিন্ন েেত্র ব্যর্থতা কিংবা নাগরিক জীবনের দুঃখ দুর্দশা ফলাও করে প্রকাশিত হতে থাকে। যেহেতু আমাদের ধৈর্য্য মতা সীমিত, তাই সরকার পও সব সমালোচনা কিংবা ব্যর্থতা স্বীকার না করে মতার প্রায়োগিক কৌশলে অনেকটা দমননীতি গ্রহণ করে।”

আল মাহমুদ স্বাধীনতার পর দৈনিক গনকণ্ঠ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক হন। সরকার বিরোধী অবস্থানের কারণে পত্রিকাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মূলত জাসদ সমর্থিত পত্রিকা গনকণ্ঠ সরকারের যাবতীয় ব্যর্থতাকে ফলাও করে প্রকাশ করে। বিশেষ করে সরকারের সঙ্গে স্বাধীনতার যুদ্ধে সার্বিক ভাবে সহযোগিতাকারী দেশ ভারতের স্বাধীনতা উত্তরকালীন আচরন গনকণ্ঠ সহজভাবে নিতে পারেনি। যেহেতু তৎকালীন জাসদ নেতা মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল স্বাধীন দেশের ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করেন এবং বন্দী হন। তাই গণকণ্ঠ ভারত বিরোধী প্রচারে সোচ্চার হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে জাসদের গণ বাহিনী দমনে সরকারী দমননীতিও সহজভাবে নিতে পারেনি পত্রিকাটি। ব্যাপক যুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় স্বদেশ প্রেমের সংজ্ঞা। যা সেই সময় ব্যাপক সমর্থন ও পায়। কবি আল মাহমুদ এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সরকার কর্তৃক জেল বন্দী হন। এবং মুক্তিপন ১৯৭৫ সালে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বদেশ সমাজ এবং স্বাধীন দেশের পরিচালকদের কাছে তাঁর প্রত্যাশা ছিল স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন সমন্বয় এবং সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা।

একবার কথা প্রসঙ্গে কবি আল মাহমুদ বলেন, আমি জানি এবং বুঝি যে, একটি নতুন দেশ পরিচালনা করা সুকঠিন কাজ। তাই রাতারাতি দেশের সমস্ত মানুষ সুখী হয়ে যাবে, সর্বেেত্র ব্যাপক উন্নতি ঘটে যাবে তা সম্ভব নয়। একটা নতুন দেশকে সার্বিকভাবে গড়ে তুলতে হলে সুন্দর সুশৃংখল সমন্বয় এবং পরিকল্পনা গ্রহন করা হলো প্রাথমিক কাজ। কিন্তু আমার কাছে তখন মনে হয়েছে যে, আমরা অর্থাৎ আমাদের নেতৃবৃন্দ অনেক বেশী এলোমেলো। সমন্বয়হীনতা এবং শৃংঙ্খলার ব্যাপক অভাব আমাকে মানসিকভাবে পীড়ন দেয়। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, তা সম্ভবত অমূলক হয়ে যাচ্ছে মনে করে একজন লেখক হিসাবে তাড়না অনুভব করি।
উল্লেখ্য কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার কসবা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। যখন তিনি ঢাকায় আসেন তখন তিনি ২১ বছরের টগবগে তরুণ। তাঁর সৃজনশীলতার প্রারম্ভ ১৯৫৪ সালে। ঢাকা ও কোলকাতার পত্রিকায় এক যোগে প্রকাশিত হতে থাকে কাব্য জগতের সুচারু পুরুষ আল মাহমুদের কবিতা। খুব অল্প সময়েই সাড়া ফেলে দেয় সাহিত্য জগতের এই নবাগত যুবক। কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবি মহল আমলে নেয় কবিতার এই রাজপুত্রকে। বুদ্ধদের বসু তাঁর সম্পাদিত কবিতা নামক বিখ্যাত সংকলনে বিখ্যাত লেখকদের সঙ্গে যুক্ত করেন আল মাহমুদের নাম। শুধু তাই নয়, বুদ্ধদের বসু তাঁর সম্পাদকীয়তে আল মাহমুদকে একজন জায়েন্ট (এরধহঃ) কবি হিসেবে তখনই স্বীকৃতি দেন। এরপর থেকে আল মাহমুদ আর ডান বাম দেখেননি। লেখার মান দন্ডের বিবেচনায় যে কোন বোদ্ধা লোকরা খুব সহজেই প্রতাপশালী এই কবিকে বিবেচনায় নেন। সিকান্দার আবু জাফরের সমকাল মানে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ লেখকদের বিচরণ ত্রে। মেধার বিকিরণে সমকাল আর আল মাহমুদ যুগল শব্দে পরিনত হন।

কবি শাসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ দু’জনই ছিলেন আমাদের কাছে গুরু প্রতীম। কিন্তু তাঁদের দু’জনের সম্পর্ক নিয়েও নানা কথা প্রচলিত ছিল কিংবা আছে।

এ প্রসঙ্গে কবি আল মাহমুদ বলেন কবি শামসুল রাহমান একজন বড় কবি। অন্যতম প্রধান কবি। জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী দল গঠন করার সময় ঘোষনা নামে য চমৎকার একটি প্রকাশনা করেছিলেন তাঁর সম্পাদক ছিলাম আমি। এবং সেই সংকলনে কবি শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে লেখা কবিতা তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা সহ দু’টি কবিতা আমি নিজে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে সংযুক্ত করি। আমাদের মনন জগতের কথা কি সবাই জানে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুলের সম্পর্ক নিয়েও মুখ রোচক ভিত্তিহীন অনেক কথা প্রায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাঁদেরকে যারা ঝঃঁফু  করেছেন তাঁদের সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান রাখেন যারা একমাত্র তারাই জানেন দু’জনের সম্পর্কের মুল গতি প্রকৃতি। তাছাড়া আমাদের সহজোত প্রবৃত্তিই হলো সৃজনশীল কাজে মগ্ন মানুষরা যখন খ্যাতির শিখরে যাবে তখন প্যারালাল খ্যতিমান মানুষটিকে প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে। সৃজনশীলতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হয়না, মহানসৃষ্টি কালজয়ী কাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হয়না।

তবে কবি আল মাহমুদ সৃজনশীল লেখা সম্পর্কে বলেন, আমি কখনো ফরমায়েশী লেখা লিখিনা। লিখতে পারিনা লিখা হয়না। ফরমায়েশী লেখা ভাল হতে পারে তবে যুগোত্তীর্ণ হবে কিনা সন্দেহ। (চলবে)

Last Updated on Saturday, 03 July 2010 09:08
 

 


bottom

Designed & Developed by Doshdik Media Ltd.
House# 2, Road# 7, Sector# 3, Uttara Model Town, Dhaka-1230, Bangladesh
Phone: +880-2-8919351, +880-2-8919351, +880-2-8956608, +880-2-8956608, Fax: +880-2-8963402,
E-mail: info@doshdik.com
Doshdik Media Limited. All rights reserved.