|
ইমদাদুল হক মিলন
এক যে ছিল বিড়াল প্রথমে একটি বিড়ালের গল্প। খুবই নরম নিরীহ ধরনের বিড়াল। বাড়িতে কোনও রকমের কোনও উৎপাত সে কখনও করেনি। যেমন করে থাকা যায় থাকে, যা খেতে দেয়া হয় খায়। মনিবের কাজ জান পরাণ দিয়ে করে। কাজ বলতে, বাড়িতে বেজায় ইঁদুরের উৎপাত ছিল, ইঁদুর নিধন করে সে বাড়ির পরিবেশ শান্তিময় করেছে। তারপরও মনিব হঠাৎ করেই তার ওপর রুষ্ঠ হয়ে উঠলেন। বিড়ালটা হয়তো বারান্দার কোণে শুয়ে ঘুমাচ্ছে হঠাৎই
তাকে এসে একটা লাথি দিলেন। বিড়ালটাকে কদিন খেতে দিলেন না। সবাই খেতে বসলে খিদার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বিড়ালটা হয়তো কাছে এলো। মনিব লাঠি দিয়ে তাকে পিটুনী দিলেন কিংবা লাঠি নিয়ে তাড়া করলেন। একদিন গলা চেপে ধরে বহুদূরে নিয়ে ফেলে দিয়ে এলেন। বিড়ালের স্বভাব হচ্ছে যত দূরেই ফেলা হোক মনিবের বাড়ি চিনে তারা ফিরে আসে। এই বিড়ালটাও ফিরে এলো। ফেলে দেয়ার পরও সে ফিরে এসেছে দেখে মনিব বেজায় খাপ্পা হলেন। বিড়ালটি যে ঘরে ছিল সেই ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে লাঠি দিয়ে বিড়ালটিকে পিটাতে লাগলেন। বিড়াল প্রথমেই পালাবার পথ খুঁজলো। না পেয়ে ভাবলো তাকে জানে বাঁচতে হবে। কী করা যায়? একটা সময়ে সে হিংস্র হয়ে উঠল। মনিব যেই আবার লাঠি তুলেছে তাকে মারবার জন্য অমনি বিড়াল লাফ দিয়ে পড়ল তার মুখের ওপর। ধারালো নখের আঁচড়ে ফালা ফালা করল মনিবের গাল, গলা। মনিব ‘বাবা রে গেছি রে, গেছি রে’ বলে লাঠি ফেলে পালালেন। কিন্তু মনিব তার সঙ্গে এরকম নিষ্ঠুর আচরণ কেন শুরু করেছিলেন এই কারণটা বিড়ালের জানা দরকার। একদিন সে জানতে পারল তাকে সরিয়ে বাড়িতে অন্য বিড়াল আনতে চেয়েছিলেন মনিব। বিড়ালের হাতে আক্রান্ত হওয়ার পর সেই আশা বাদ দিয়েছেন। বিড়াল মনে মনে হাসল। ও তাহলে এই মতলব? আচ্ছা ঠিক আছে। তারপর থেকে সে মনিবকে দেখলেই মুখ খিচিয়ে আক্রমণের ভঙ্গি করে আর মনিব ভয়ে দৌড়ে পালায়। বিড়াল তারপর সেই বাড়িতে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।
নিরীহ নারী এবার একজন মানুষের গল্প। মানুষটি নারী। ভদ্রমহিলার বয়স ষাট বাষট্টি। চুয়াল্লিশ বছর আগে বিয়ে হয়েছে। ছেলেমেয়েরা উচ্চশিতি। তিনজন ছেলেমেয়ের তিনজনই বিদেশে। বেশ ভালো অবস্থানে আছে তারা। ভদ্রমহিলার স্বামী মাঝারি মানের সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। বিদেশে ছেলেমেয়েদের কাছে গিয়ে দুচার ছমাস করে থেকে আসেন দু একবছর পর পর। ভদ্রলোক রিটায়ার করেছেন। নিজের ফ্যাটে থাকেন। চুলদাড়ি সাদা হয়ে গেছে। দেখলে সম্ভ্রম জাগে এমন একজন মানুষ। কিন্তু তাঁর ভিতরকার মানুষটির কথা শুনলে যে কেউ শিউরে উঠবেন। গত কয়েকবছর ধরে তিনি উঠতে বসতে, বলতে গেলে প্রতিটি মুহূর্ত স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। সেই নির্যাতন নানা রকমের। খেতে বসেছেন, কোনও কারণ নেই, ভাতের প্লেটটা ছুঁড়ে মারলেন স্ত্রীকে। বাড়ির কাজের জন্য স্ত্রী দশ বারো বছর বয়সের একটি বাচ্চা ছেলেকে এনেছেন। কথায় কথায় নির্দয়ভাবে মারছেন সেই ছেলেটিকে। আর স্ত্রীকে তো মারছেন যখন তখনই। কোনও কোনওদিন এমন মার মারেন, ভদ্রমহিলা শয্যাশায়ী হয়ে যান। গলা টিপে ধরে দুয়েকবার মেরে ফেলবারও চেষ্টা করেছেন। ওই বাচ্চা কাজের ছেলেটি একদিন বাধা দিতে গেছে, ছেলেটিকে এমন মার মেরেছেন, সেই ছেলের মরো মরো অবস্থা। কাঁদতে কাঁদতে সে পালিয়ে গেছে। স্বামীর মার খেতে খেতে ভদ্রমহিলার শরীরের নানা জায়গায় বড় বড় ত। কিন্তু এই কষ্টের কথা তিনি কাউকে বলতে পারেন না। বললে নিশ্চয় ভদ্রলোকের কানে সেকথা যাবে, তখন তিনি আরও রাগবেন, অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়াবেন। গোপনে শারীরিক কষ্ট সহ্য করা আর কান্না ছাড়া কোনও পথ নেই ভদ্রমহিলার। যে ফ্যাটে তাঁরা থাকেন সেই ফ্যাট বাড়িতে একজন মহিলা ডাক্তার আছেন। শরীরের ত ভয়াবহ আকার ধারণ করার ফলে গোপনে তিনি সেই ডাক্তারের কাছে গেছেন। ডাক্তার তাঁকে দেখে আঁতকে উঠেছেন। এমন হয়েছে কীভাবে? স্বামীর সম্মান নষ্ট হবে এই কারণে ভদ্রমহিলা আসল কারণ বলতে চাননি। শুধু চোখের জল ফেলেছেন। ডাক্তার আর উকিলের কাছে কোনও কিছু লুকাতে হয় না এই শিা তাঁর আছে। একসময় আসল ঘটনা তিনি বললেন। ডাক্তার হতভম্ব হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বলেন কী? এ কী করে সম্ভব? এ তো অবিশ্বাস্য! আপনি কি ছেলেমেয়েদেরকে ঘটনা জানিয়েছেন? না। ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে। বাবার চরিত্রের এইসব দোষের কথা জানলে তাদের মন খারাপ হবে। তারা হয়তো দেশে চলে আসবে। তখন দেখা দেবে অন্য সমস্যা। তাই বলে এভাবে বসে বসে নির্যাতিত হবেন? এছাড়া কী করার আছে? ছেলেমেয়েদের বলতে না চান আপনার আত্মীয় স্বজন, ভাইবোনদের জানান। ভদ্রলোকের বন্ধুদের জানান। সবাই মিলে সমস্যাটার সমাধান করুন। আত্মীয় স্বজনরা কেউ কেউ জানে, আমার ভাইবোনরাও জানে। দুয়েকবার তারা এই নিয়ে কথা বলতে এসেছে, আমার স্বামী তাদেরকে অসম্মান করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর বন্ধুরাও জানেন ঘটনা। তাঁর চরিত্রের এই কুৎসিৎ দিক জানতে পেরে তাঁরা কেউ আর আমার স্বামীর সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখেনি, তাঁর সঙ্গে মেলামেশা করে না। ডাক্তার ভদ্রমহিলা তারপর একটু অন্যভাবে বুঝতে চাইলেন ব্যাপারটা। আপনার স্বামী কি বিয়ের পর থেকেই এমন? না। আজ চার পাঁচবছর ধরে এরকম হয়েছে। শুরু থেকেই তিনি একটু রাগি। কিন্তু এরকম ছিলেন না। মানে এতটা টর্চার আমাকে কখনও করেননি। তাহলে এই বয়সে এরকম হওয়ার কারণ কী? ভদ্রমহিলা আবার চোখ মুছলেন। তিনি এক মহিলার পাল্লায় পড়েছেন। মহিলার সঙ্গে তাঁর অবৈধ সম্পর্ক। সেই মহিলার কারণে তিনি আমার ওপর টর্চার চালাচ্ছেন। আমাকে তাঁর বিছানায় শুতে দেন না, কারণ গভীররাতে মোবাইলে মহিলার ফোন আসে। তিনি তাঁর সঙ্গে রাত জেগে কথা বলেন। আমি জোর করে তাঁর বিছানায় শুতে গেলে, গভীররাতে চুপিচুপি তিনি কথা বলার জন্য ফোন হাতে বারান্দায় চলে যান। টাকা পয়সা প্রচুর খরচা করছেন সেই মহিলার জন্য। ওই মহিলাই তাঁর মাথাটা খারাপ করে দিয়েছে। তারপরই তিনি ডাক্তার ভদ্রমহিলার একটা হাত দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। আপনার আল্লার দোহাই লাগে, আমি যে আপনার কাছে এসেছিলাম, আপনি আমাকে অষুদ দিয়েছেন আর এসব কথা যে আপনাকে আমি বলেছি তা যেন কিছুতেই আমার স্বামীর কানে না যায়। উনি যদি ঘুণারেও এসব টের পান তাহলে আমাকে জানে মেরে ফেলবেন। কিন্তু এভাবে একজন মানুষ বাঁচতে পারে না, এভাবে একজন মানুষের জীবন চলতে পারে না। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। আপনি থানায় যান, আপনার স্বামীর ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করুন। অথবা মানবাধিকার সংস্থার কাছে যান, নারী কল্যাণ সংস্থাগুলোর কাছে যান তাঁরা আপনাকে সাহায্য করবে। আইনের সাহায্য নিন। এভাবে কেন ঘরে বসে বসে মার খাচ্ছেন? এভাবে চললে আপনি মরে যাবেন। ভদ্রমহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, সবই আমি বুঝি। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। ওসব করতে গেলে আমাদের সম্মান নষ্ট হবে, ছেলেমেয়েদের সম্মান নষ্ট হবে। এবার ডাক্তার ভদ্রমহিলা একটু রাগলেন। এইসব ফালতু সম্মানবোধের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। আপনি আমার কথা শুনুন। আইনের সাহায্য নিন। এই অবস্থা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করুন। আর যদি কোনও পথ না পান তাহলে সেই বিড়ালটির পথ ধরুন। তারপর মহিলাকে তিনি বিড়ালের গল্পটা বললেন।
বিড়াল থিউরি নিজের ফ্যাটে ফিরে এসে চরিত্রটা একদম সেই বিড়ালের মতো করে ফেললেন ভদ্রমহিলা। প্রথমেই শাড়ির আঁচলে একটা ধারালো নতুন ব্লেড বেঁধে রাখলেন। হাতের কাছে সবসময় একটা বটি আর একটা শলার ঝাড়–। ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি যা নেয়ার নিয়ে ফেললেন। ভদ্রলোক দুপুরবেলা বাড়ি ফিরেছেন। স্ত্রীকে তিনি বহুদিন ধরেই তুই তোকারি করেন। বাড়ি ফিরেই বললেন, ভাত দে। সঙ্গে অশ্লিল একটা গাল। ভদ্রমহিলা সঙ্গে সঙ্গে সেই বিড়ালের মতো মুখ খিচিয়ে বললেন, আগে ভাষা ঠিক কর। নয়তো ভাতের বদলে ঝাড়– মারবো। ভদ্রলোক হতভম্ব। কী? এতবড় সাহস? আমাকে ঝাড়– মারবি? দাঁড়া দেখাচ্ছি কে কাকে ঝাড়– মারে? বলেই তেড়ে গেছেন স্ত্রীর দিকে। স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাছে রাখা ঝাড়–টা তুলে নিলেন। নিয়ে আর কোনও কথা নেই সাটাসাট তিন চারটা বাড়ি লাগিয়ে দিলেন ভদ্রলোকের কোমর এবং পশ্চাৎদেশ বরাবর। আচমকা ঝাড়–র এরকম বাড়ি, ভদ্রলোক দিশেহারা গলায় বললেন, আরে, আরে করে কী? এই, এই... ভদ্রমহিলা তখনও সমানে ঝাড়– চালাচ্ছেন আর দাঁত মুখ খিচিয়ে বলছেন, আর তুই তোকারি করবি? আর গাল দিবি আমাকে? আর হাত তুলবি গায়ে? এখন তো ঝাড়– মারছি, তারপর বটি দিয়ে কোপ দেব। এই যে আঁচলে ব্লেড বেধে রেখেছি, ব্লেড দিয়ে পোচ দেব। এখন মারলাম তোকে, বিকেলবেলা যাবো তোর ওই মহিলার কাছে। ওটাকেও একই কায়দায় পিটাবো। প্রেম পিরীতির হালুয়া টাইট করে দেব। এতদিন চুপচাপ থেকে তোর অত্যাচার সহ্য করেছি, আর এক মুহূর্তও করবো না। ভদ্রলোক ফ্যাল ফ্যাল করে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই দুপুরে স্ত্রী তাঁকে ভাতই দিলেন না। দুপুরটা না খেয়ে কাটলো তাঁর। বিকেলবেলা স্বামীর মোবাইলটা সিজ করলেন ভদ্রমহিলা। এই ফোন তুই আর ধরতে পারবি না। যদি বাড়ির বাইরে গিয়ে মহিলাকে ফোন করিস সেই খবরও আমার কানে আসবে। তাহলে তুই আর বাড়ি ফিরতে পারবি না। বাড়ি ফিরলেই ঝাড়–র বাড়ি, বেশি বাড়াবাড়ি করলে বটির কোপ আর নয়তো ব্লেডের পোচ। আজ রাতটা সময়, কাল সকাল থেকে তুই একদম ঠিক হয়ে যাবি। তুই তো কুকুর হয়ে গেছিস, এখন মগুরটা তোকে আমি উঠতে বসতে মারবো। আমাদের আত্মীয় স্বজন আর তোর বন্ধুবান্ধব সবাই জানে তুই আমার ওপর অত্যাচার করিস। আজ থেকে যে পুরো ব্যাপারটাই উল্টে গেছে, এটা তুই বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। সুতরাং তুই এতদিন আমার ওপর যত অত্যাচার করেছিস তার একশোগুণ বেশি আজ থেকে তোর ওপর আমি করবো। স্বামী হতবাক। কয়েকদিন পর ভদ্রমহিলা হাসিমুখে ডাক্তার ভদ্রমহিলার কাছে গেলেন। গিয়ে বললেন, সব ঠিক হয়ে গেছে। ভদ্রলোক একদম সোজা হয়ে গেছেন। ওই মহিলার সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। আমাকে যমের মতো ভয় পান আর তোয়াজ করেন। আপনার বিড়াল থিউরি এন্টিবায়োটিকের কাজ দিয়েছে।
|