top
logo


স্মৃ তি (শেষ পর্ব) PDF Print E-mail
Written by দশদিক ডেস্ক   
Thursday, 01 July 2010 10:22

একাত্তরের স্মৃতিকথা এবং তারপর ...
মোল্লা বাহাউদ্দিন

আমার নিজেরও গাড়ি ড্রাইভার আছে। শুধু অফিসে আসা যাওয়ার জন্য। ছুটির দিন থাকে না। বললাম, ঠিক আছে যাব। তবে যে কোন বৃহস্পতিবার। আধা বেলা অফিস, তারপর যাওয়া যাবে।
একজন বলল, আগামী বৃহস্পতিবার হুজুরের সময় হবে কি?
ঠিক আছে।
সেই বৃহস্পতিবার অফিস ছুটির পর বেরিয়ে দেখি চার পাঁচটা গাড়ি। সব গাড়িতেই মানুষ। একটা গাড়ি একটু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, বাকীগুলো অনেক পুরোনো। পরিষ্কার গাড়িতেই আমার

জন্য নির্দিষ্ট আসন ছিল। গাড়িগুলো চলল। মনে হল আমি একজন রাষ্ট্রপ্রধান। গার্ড দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আধা ঘন্টার মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম। একটা একতলা দালান। তিনটা রুম। আমার বসার জন্য একটা চেয়ারের ব্যবস্থা হয়েছে। কারণ তারা থাকে ফোরে বিছানা করে। কোন আসবাবপত্র নেই। সৌদি স্টাইল। আমার আদর যত্ন এমনভাবে হল যেন বাদশাহ আকবর। প্রজাদের দেখতে এসেছে।
খাওয়াদাওয়ার পর গল্প চলল। কে কিভাবে কবে এদেশে এসেছে। বেশিরভাগই বলল দিল্লী থেকে ভিসা নিয়েছে। কেউ বলল পাকিস্তান থেকে। কে কোথায় কাজ করে এসব কথাও হল। হঠাৎ করে একজন প্রশ্ন করল, ব্যারিস্টার সাহেবের সাথে হুজুরের পরিচয় আছে নাকি?
কোন্ ব্যারিস্টার?
ব্যারিস্টার আখতারুদ্দিন, তিনিই তো বেশিরভাগ মানুষের চাকরি দিয়েছেন। এখন সৌদিয়ার লিগ্যাল অ্যাডভাইজার।
ও, ঐ রাজাকারের কথা বলছেন! ওর কারণেই তো সৌদি আরব এখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। সে দেশের শত্র“। চিনি, স্টেট ব্যাংকের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার ছিল।
হঠাৎ করে ঘরের পরিবেশ বদলে গেল। সবাই চুপ হয়ে গেল। বেশ কিছুণ চুপচাপ বসে থেকে আমি বললাম, আচ্ছা এখন যাব। আপনাদের আথিতেয়তার জন্য অনেক ধন্যবাদ। বলে আমি উঠে দাড়াঁলাম। দরজার দিকে রওয়ানা দিলাম। কিন্তু কেউ উঠছে না। আসার সময় এতগুলো গাড়ি ছিল, এখন নেই। আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেও কেউ এলো না। আমি রাস্তায় এসে একটা টেক্সি নিয়ে বাসায় এলাম।
বসে বসে অঙ্কটা মিলাতে চেষ্টা করলাম। আমার নামের আগে মোল্লা দেখে তারা ভেবেছিল আমি তাদের লোক। তারপর একটা কোম্পানির ম্যানেজার, ইচ্ছে করলে ভিসার ব্যবস্থা করতে পারি। তাদের দলের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। দল ভারী হয়। যখন দেখল আমি তাদের দলের নই, তখন দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়াটা তাদের আরও লোকসান।
দিল্লীর দূতাবাসের কাজকর্মের সাথে তাদের কথাবার্তাও মিলে যায়। স্বাধীনতার পর দিল্লী দূতাবাস বেশিরভাগ রাজাকারের ভিসার ব্যবস্থা করেছে। সৌদি আরবে বেশিরভাগ রাজাকার আশ্রয় নিয়েছে। তের বছর সৌদি আরবে থেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান পাইনি। নেই যে তা নয়, কেউ পরিচয় দিত না। কারণ রাজাকারের মাঝে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে ঘৃণার পাত্র হতে চায় না কেউ।
১৯৮৮ সালে চলে গেলাম নিউইয়র্ক। আগের পরিচিত দুএকজন ছিল। তাদের একজনের বাসায় উঠলাম। নিজের জন্য বাসা খুঁজে বের করলাম তিন চার দিনের মাঝেই। যার বাসা ভাড়া নিলাম তার বাড়ি চিটাগাং। নাম অহিদ। তার সাথে কনস্ট্রাকশনের কাজ করে আরও কয়েকজন বাঙালি। তারা সবাই আমাকে সাহায্য করার জন্য উঠেপড়ে লাগল। জামান সাহেব নামে একজন একটা সোস্যাল সিকিউরিটি কার্ড দিয়ে বলল, আপাতত আপনার কিছুই নেই, এটা ছাড়া কাজ পাবেন না। আপাতত এটা ব্যবহার করতে পারেন। ইচ্ছে করলে নিয়েও নিতে পারেন। কার্ড নিলাম, কিন্তু ব্যবহার করতে হয়নি। এদের সাথে আর একজন ছিল নামটা ভুলে গেছি, সে বলল আমার ছোট ভাই এসেছে আর্মি ট্রেনিংএ। চার বছরের জন্য। বাংলাদেশ থেকে একমাত্র একজনই সেলেক্ট হয়েছে এবং সেটা আমার ভাই।
শুনে খুব খুশি হলাম। একটা বাঙালি ছেলে আমেরিকায় এসেছে ট্রেনিং নিতে, এটা একটা সুখবর। বললাম, নিয়ে আসেন একদিন আমাদের এখানে। আমাদের সাথে খাবে একবেলা।
আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সন্তানকে যেদিন নিয়ে এলো সেদিন সাথে ছিল জামান, অহিদ এবং ইকবাল।
ছেলেটা দেখতে ছিপছিপে, সুন্দর চেহারা। বয়স আঠার উনিশ হবে। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কি?
আজমী।
তুমি তো আমাদের ভবিষ্যৎ। দেশে ফিরে গিয়ে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, হাতে থাকবে অনেক মতা। তোমার রাজনৈতিক চিন্তাধারা কি?
আছে একটা।
সেটা কি? কোন্ দলের রাজনীতি তোমার নীতির সাথে মিলে?
জামাত। বলে একটু মুচকি হাসল। মুখের ভাব দেখে মনে হল এই কথাটা শুনলে আমি খুব খুশি হব। কারণ আমি একজন মোল্লা।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম! কাকে দাওয়াত করলাম! আর তার সাথে যারা এসেছে তারা কে! আমি তো একটা বোকা। এখন তো আর অপমান করা যায় না। কোন রকমে আথিতেয়তা শেষ করে বিদায় দিলাম। পরে জানলাম আজমী জামাতের মাওলানা নিজামীর ছেলে (এখন সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে বহিষ্কৃত)। আর জামান সেই জামান যার পুরো নাম শামসুজ্জামান, বুদ্বিজীবী হত্যাকারী কুখ্যাত খুনি রাজাকার।
কিছুদিন পর দেখলাম মুক্তিযোদ্ধা ঐক্য পরিষদ নামে একটা সংঘটন হচ্ছে। ইচ্ছে হল গিয়ে দেখি ওরা কি করতে চায়। সেই থেকে শুরু হল প্রায় সব কয়টা সংগঠনের সভায় যাওয়া। পেছনে বসে সব শুনি। দেখলাম এখানে মুক্তিযোদ্ধার অভাব নেই। অনেক। যাদের বয়স যুদ্বের সময় হয়ত ছিল আট দশ তারাও মুক্তিযোদ্ধা। প্রবাসে মুক্তিযোদ্ধা অনেক। তারা এই নিউইয়র্ক শহরে থেকে বিশ্বজনমত গড়ে তুলে আমাদের অনেক সাহায্য করেছে। তারা মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় যাদের কোন দেখা পাওয়া যায়নি আজ বিশ বছর পর তারাও দাবী করে মুক্তিযোদ্ধা। আসল মুক্তিযোদ্ধা বেশ কিছু আছে। তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কিছু অমুক্তিযোদ্ধা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবী করে এবং আসল মুক্তিযোদ্ধারা তাদের দাবীকে মেনে নেয় দল ভারী করার জন্য। পরবর্তীতে বেশ কয়েকটা সংগঠন জন্ম নিল। একটা বিএনপি সমর্থন করে, আর একটা আওয়ামী লীগ। দেখা গেল একটা প্রতিযোগিতা চলছে। কোন কোন সংগঠন মুক্তিযোদ্ধাকে পুরষ্কৃতও করছে। নিজেদেরকে প্রকাশ করার জন্য, কাগজে তাদের নাম আর ছবি ছাপার জন্য তারা সব চেষ্টা করে যাচ্ছে। কে যে আসল মুক্তিযোদ্ধা তা বোঝা মুস্কিল হয়ে পড়ল। তখন আমার ইচ্ছে হল প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধ আসলে কারা করেছে। তাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে এবং তাদের যথাযোগ্য সম্মান দিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ জানে না মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীর দান কত। তারা কি করেছে। দীর্ঘ ছয় বছর সময় নিয়ে আমি যোগাড় করেছি সত্যিকার ইতিহাস। লিখেছি “স্বপ্ন নগরী নিউইয়র্ক”। তাতে এইসব দেশপ্রেমিককে আর কিছু দিতে না পারি অন্তত কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারি, একটা ধন্যবাদ দিতে পারি। বড় কথা তাঁরা অমুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে হারিয়ে যাবে না।
নিউইয়র্ক ছেড়ে কানাডায় আগমন। এখানে এসে কোন সংগঠনের সভায় যাই না। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখি মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণ ছাপা হয়। এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। কি লাভ এসব নিয়ে কথা বলার। যে যেভাবে পারে সেভাবে চালিয়ে যাক তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকগুলো ভাগে ভাগ করা যায়। এক: অস্ত্র নিয়ে যারা সরাসরি যুদ্ধ করেছে। দুই: রাজনৈতিক নেতাদের আতœীয়স্বজন যারা কিছুই করে নাই, পরবর্তিতে ‘সাংঘাতিক’ মুক্তিযোদ্ধা। তারাই স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করেছে।  তিন: দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা বিনিময়ে যারা কিছুই চায় নাই এবং পায়ও নাই। যুদ্ধশেষে যার যার বাড়িতে ফিরে গেছে। কেউ তাদের খবরও নেয়নি। এখন তাদের কেউ কেউ রিক্সা চালায়, বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। চার: সুবিধাবাদী মুক্তিযোদ্ধা যারা যেখানে সুবিধা পেয়েছে সেখানেই নিজেকে বিক্রি করেছে এবং আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। পাঁচ: ষোল ডিভিশন মুক্তিযোদ্ধা যারা লুট সন্ত্রাস খুন আর অসামাজিক কাজ করে মুক্তিযোদ্ধার নামে কলঙ্ক ছড়িয়েছে। ছয়: সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধা যারা সার্টিফিকেট যোগাড় করে অফিস আদালতে সুবিধা নিয়েছে। সাত: আহত মুক্তিযোদ্ধা। তাদের দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে যুদ্ধরত অবস্থায় আহত হয়েছে। আর এক ভাগ আহত মুক্তিযোদ্ধা যারা যুদ্ধে যায়নি অথচ আহত হয়েছে। তাদের কেউ কেউ হয়ত যুদ্ধে যাবার ইচ্ছেও ছিল না। দেশের ভিতরেই আত্মরার্থে পালিয়ে থাকা অবস্থায় জল্লাদ বাহিনীর হাতে ধরা পরে প্রাণ দিয়েছে, কেউ কেউ অমানুষিক অত্যাচারে আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে গেছে। তাদের কেউ কেউ মিডিয়ার সাথে জড়িত বলে তাদের নাম সারা দেশে বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অথচ যুদ্ধে যাবার কোন ইচ্ছেই ছিল না তাদের। আট: স্বঘোষিত মুক্তিযোদ্ধা। এই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবাসেই দেখা পাওয়া যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের নামের আগে বা পেছনে থাকে তাদের পদবী, মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বের জন্য খেতাব ইত্যাদি। নামের আগে থাকে বীর, সাহসী বা অন্য কোন বিশেষণ। কানাডায় এসে দেখা পেলাম “মহা” মুক্তিযোদ্ধার! এটাই বোধ হয় শেষ বিশেষণ শুনলাম। আগে কখনও কোথাও শুনিনি।

Last Updated on Sunday, 04 July 2010 07:05
 

 


bottom

Designed & Developed by Doshdik Media Ltd.
House# 2, Road# 7, Sector# 3, Uttara Model Town, Dhaka-1230, Bangladesh
Phone: +880-2-8919351, +880-2-8919351, +880-2-8956608, +880-2-8956608, Fax: +880-2-8963402,
E-mail: info@doshdik.com
Doshdik Media Limited. All rights reserved.