|
সাইফ বরকতুল্লাহ
বানভাসি। হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক, প্রভাত মিত্রের বানভাসি কবিতা দিয়েই লেখাটা শুরু করছি। কবিতাটি হল:
বৃষ্টি! বৃষ্টি! বৃষ্টি! ছই ছত্রিকার ফাটা বেলুনের মতো কে কোথায় গিয়েছে ছিটিয়ে বন্যার লাল জল বাড়ী ঘর গ্রামের মানুষ ভাসে
পাথফাইন্ডার নেই প্রাণ আছে কিনা কিছুই জানা ছিল না স্কুল বাড়িতে শুয়ে পিতামহ বানভাসি দুই চোখ দেখে ছায়া পথ রাত্রির শরীরে ডিঙ্গি নিয়ে মশাল, আলোয় তল্লাটে তল্লাটে খোঁজ
শব কূল হতে অকূলেতে জন্ম জন্মন্তর ভেসে যায় খোল নলচে কস্তুরি তামুক হাহাকার রেখে রিক্ত তীরের গভীরে
দুই বাংলাদেশকে
বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। বান (বন্যা) -বর্ষা এদেশের নিত্যসঙ্গী। ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল এই পাঁচ বছর প্রায় প্রতি বছরই বান (বন্যা) এসেছে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর ১৯৭৪ সালের বান (বন্যা) মারাত্মক তির স্বার রেখে যায়। এরপর ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী বান (বন্যা) এর ভয়াবহ রূপ দেখে নির্বাক হয়ে যায় সাধারণ মানুষ এবং বিশ্ববাসী। ১৯৯৮ সালের বান (বন্যা) গত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বান (বন্যা)। এ বানে সারাদেশে প্রায় ১২০০ এর মতো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। দেশের ৪৪টি জেলা বন্যায় ব্যাপক তিগ্রস্ত হয়। ফসলহানি হয় ল ল হেক্টর জমির। কিন্তু সকল রেকর্ডকে অতিক্রম করে ২০০০ সালের বান (বন্যা)।
তিন বান। বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যের উৎস। জন-জীবনে প্রচণ্ড দুর্ভোগের কারণ। এটা এখন নিয়মিত বার্ষিক ব্যাপার। এমনকি বান (বন্যা) এখন তার সময়সূচিও পরিবর্তন করেছে। পূর্বেকার দিনে বর্ষার সময়ে তার আগমন ঘটত, কদাচিৎ বর্ষা শেষেও। কিন্তু ইদানিং বর্ষারম্ভের পূর্বেই তার সাক্ষাত পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা এই অকাল বন্যার কারণ। তাই দেশের এক অঞ্চল যখন খরায় আক্রান্ত হয় তখন অন্য অঞ্চলে দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা। ১৯৫০ সালের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।
চার অষ্টাশিকে ছাড়িয়ে যাওয়া এবারের বন্যা মানুষের অসহায়ত্বকে প্রকটাকারে তুলে ধরেছে। বানভাসি মানুষের সীমাহীন দুর্গতি, সর্বস্ব হারানোর যন্ত্রণা, ক্ষুদা আর রোগব্যাধির ছোবলে বন্যা কবলিত জনপদ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ল ল আশ্রয়হীন মানুষ দিনের পর দিন ঘরের চালে উদ্বাস্তু হয়ে আত্মরার চেষ্টা করেছে। অনাহারে অর্ধাহারে কেটেছে তাদের দীর্ঘ প্রহর। নিরাশায় ডুবে যাওয়া মানুষগুলো দশ দিন যাবৎ চোখে আশার আলো জ্বালিয়ে নিরাপদে থাকা মানুষদের কাছ থেকে সাহায্যে প্রত্যাশায় পথ চেয়ে বসেছিল। কেউ আসে না সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। ক্ষুদায় নেতিয়ে পড়তে থাকে শিশু আর বৃদ্ধরা। প্রতিকূল প্রকৃতির সাথে লড়তে লড়তে কান্ত হয়ে পড়তে থাকে সমর্থ মানুষেরা। মানুষ আসে না ছুটে মানবতার হাহাকার দেখে-শুনেও। বিরূপ প্রকৃতির এই বাংলাদেশের ইতিহাসে যা সম্পূর্ণ অচেনা দৃশ্য, অকল্পনীয় বাস্তবতা।
পাঁচ কপোতারে তীরে বানভাসি মানুষ। চারদিকে পানি আর পানি। দূরের ঘর-বাড়িগুলোকে মনে হবে ছোট ছোট নৌকা। পানির বুক চিরে যাওয়া উঁচু রাস্তাটিকে মনে হচ্ছিল ভাসমান জাহাজ। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার খোসালনগর গ্রামের আকলিমা। খোলা আকাশের নিচে দুপুরের খরতাপে ওই রাস্তার ওপর একটার পর একটা ইট পেতে রান্না করছিলেন তিনি। কিছু জুটলে প্রতিদিন এ সময় রান্না হয়। তিন বেলা আধপেটা খেয়ে কোনরকমে বেঁচে আছেন তারা। প্রতি বছর বান আসলে এ অবস্থাই হয় আকলিমাদের। সমস্যা সমাধানের উপায় সামান্যই।
শুধু তাই নয়, বান আসলেই বাঁকড়া ইউনিয়নের খোসালনগর গ্রামের ওই রাস্তায় আশ্রয় নেয় ২০০টি বানভাসি পরিবার। এছাড়াও দিকদানার রাস্তায় ৬০টি, গোলদাপাড়ার মোড়ে ২৫টি ও তেলিয়াপাড়া মোড়ে ১০০টি পরিবার আশ্রয় নেয়। ৪০০ পরিবার আশ্রয় নেয় উজ্জ্বলপুর মাদ্রাসা, বাঁওড় অফিস ও প্রাইমারি স্কুলে। পানিবন্দি অন্যরা বাড়িতে মাচা করে থাকেন।
বাঁকড়া ইউনিয়নের দেড় হাজার বানভাসি পরিবারের দিন কাটছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মাঝে। তারা চরম মানবিক বিপর্যয়ের শিকার। রাস্তায় আশ্রিতরা পলিথিন দিয়ে টং বানিয়ে সেখানে গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগির সঙ্গে বাস করছে। বাড়ির পোষা কুকুরটিরও আশ্রয় ওই একই টং ঘরে।
টং ঘর আর আশ্রয় কেন্দ্রের পাশেই খোলা জায়গায় মলত্যাগ করতে হচ্ছে তাদের। পশু-পাখির মলের সঙ্গে মানুষের মল একাকার হয়ে দূষিত করছে পরিবেশ। এতে ডায়রিয়া-আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগ ছড়াচ্ছে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে মনিরামপুর উপজেলার ডুমুরখালি, পাঁচপোতা, গোয়ালবাড়ি, মোক্তারপুর, ঝাঁপা, হানুয়ার, নেওলাপাড়া এবং কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি ও কোমরপুর গ্রামে। এসব গ্রাম কপোতারে উপচেপড়া পানিতে ভাসছে। মনিরামপুরের দেড় শতাধিক পরিবার উঁচু রাস্তায় টং বানিয়ে এবং ১৬০টি পরিবার রাজগঞ্জ হাইস্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। সাতীরার তালা ও কলারোয়া উপজেলার আটটি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রামের চিত্র একই।
ছয় কপোতারে এ সমস্যা দীর্ঘ দুই দশকের। তবে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে ২০০০ সালে ভয়াবহ বন্যার সময় থেকে। সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের নামে প্রবাহমান কপোতাকে সংকুচিত করে উজানে ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁপুর থেকে ভাটিতে সাতীরার পাটকেলঘাটা পর্যন্ত ২০টি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে তাহিরপুর, চৌগাছা, ছুটিপুর, বাঁকড়া, ত্রিমোহিনী, সরসকাটি, মাশিলা, ধূলিয়ানী, বুজতলা ও ঝিকরগাছার দুটি ব্রিজ উল্লেখযোগ্য। ব্রিজগুলোর মধ্যে আবার দু-একটি এত ছোট যে সেগুলোকে কালভার্ট বলা ভালো। এসব ব্রিজ-কালভার্টের কারণে জোয়ারের পানি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে স্বাভাবিক স্রোতধারা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে নদের তলদেশে পড়া পলি অপসারিত হতে না পারায় সাগরদাঁড়ি থেকে উজানে উৎসমুখ তাহিরপুর পর্যন্ত কপোতা নাব্যতা হারিয়ে হাজামজা নদে পরিণত হয়েছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ক্রমান্বয়ে ভাটিতেও নদটি মরে যাচ্ছে। ফলে কপোতা অববাহিকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে কপোতা বাঁচাও আন্দোলন সমন্বয় কমিটির দাবির মুখে সরকার পর্যায়ক্রমে নদের ১৪০ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা নেয়। ২০০৩-২০০৪ সালে এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৮ কোটি ৭৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩০ কিলোমিটার খনন করা হলেও ফলোআপ না থাকায় ওই টাকা পানিতে গেছে। কপোতা সমস্যা যে তিমিরে সে তিমিরেই থেকে গেছে।
এর ফলে যশোর ও সাতীরার পাঁচ উপজেলার সাত লাখ মানুষ প্রতি বছর ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। কপোতা বাঁচাও আন্দোলন সমন্বয় কমিটি বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে দেয়া স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেছে। কপোতা সমস্যার সমাধান না করায় দণি-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য, জনজীবন এবং সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়েছে। সর্বশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় যশোরের কেশবপুর উপজেলার সুড়িঘাটা থেকে পাইকগাছার কাশিমনগর পর্যন্ত ড্রেজিং করে পলি অপসারণ, তিগ্রস্তদের সাহায্য, তিপূরণ, খাদ্য সহায়তা ও দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পাঠিয়েছে এবং দাবি আদায়ে অবস্থান ধর্মঘটও পালন করেছে।
শেষ কথা বানভাসি মানুষ। বাংলাদেশে এখনো বর্ষাকালে নানা দুভোর্গের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে। আজ পৃথিবী বদলে গেছে। বদলে গেছে মানুষের লাইফস্টাইল। যোগ হয়েছে প্রযুক্তির উন্মাদনা। তাই আজ বাংলাদেশকে বদলাতে হবে। ব্যবস্থা নিতে হবে কীভাবে বানভাসি মানুষদের আগে রা করা যায়। বর্ষাকালে কীভাবে ভালোমতো চাষ-বাস করা যায়। তাহলেই পাল্টে যাবে বানভাসি মানুষের দুঃখ, কষ্ট।
|