|
দীলতাজ রহমান
এক মালসা আগুন নিয়ে পঞ্চাশোর্ধ তছিরন জবুথবু হয়ে বসেছিল গোয়ালে। ফিকে হতে হতে ঘুম এখন আসতেই চায় না। বিছানায় শুয়েও ঘোলা চোখে অন্ধকারে চেয়ে থাকতে হয় অনেক বছর ধরে। বয়সের ভারের চেয়ে স্মৃতিরা ভিমরুল হয়ে হুল ফোটাতে থাকে তার বিধ্বস্ত দেহমনে। তবু অবচৈতন্য ফুঁড়ে আজানের আগেই উঠে পড়তে হয়। প্রয়োজন তাকে ওভাবেই তৈরি করে নিয়েছে। জীবনের একবিন্দু সময়ও যেন আলস্যে না কাটে। নিজের হাতে কাজ যেন তছিরন টেনে বের করে। বাড়ির কুকুরের খাবারটিও ঠিক জায়গায়, ঠিক পাত্রে রাখতে এখনো ভুল করে না। কুকুরের প্রতি তার এই যতœপূর্ণ আচরণ কুকুরটিকে মানুষের ঢিল, গুঁতো খাওয়া থেকে রা করেছে। তছিরনের জন্য সবার চোখে কুকুরও ওই সংসারের একজন গণ্য সদস্য।
অতএব সমীহ কুকুরও পায়। শরীর নিঃসাড় হয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত লালি নামের গাভীর এক বছরের বাছুরের সারা শরীর হাতড়ে পোকা বাছে তছিরন। তারপর তাকে হাতের আন্দাজে উকুনের মতো দুই নখে টিপে মারে। নিজের নাতিপুতি হয় না। বারো বছর হতে চললো একমাত্র সন্তান জামশেদের বিয়ে হয়েছে। তবু এ নিয়ে তাকে কখনো আপে করতে শোনা যায়নি। কেউ উস্কানিমূলক কিছু বললে, তছিরন খুব স্বাভাবিক স্বরে উত্তর দেয়, খোদার ওপর কারু আত আছে? এই গোয়ালে জন্ম নেয়া লালি চতুর্থবারের মতো আবার পোয়াতি হয়েছে। এতেই তছিরন আহাদিত। কিন্তু ছেলের কুঁদানি শুনে গায়ের জড়ানো আধ ময়লা কাঁথাটা ঝেড়ে ফেলে, প্রায় উবু হয়ে চার হাত-পা একত্র করে উটের মতো হেঁটে গেলো গেটের কাছে। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বউকে মারমুখি ছেলের কাছ থেকে ছাড়িয়ে, একহাতে নিজের বুকে আগলে, অন্য হাতে এলোপাতাড়ি দুর্বল ক’ঘা জামশেদের বুকেপিঠে মেরে ঘুম ভেঙে উঠে আসা ক’জনকে হতবাক করে দিল তছিরন। তারপর ভাঙা ভাঙা গর্জনে বর্ষে যেতে লাগলো অনেকণ ধরে, গোলামের পুত, বউয়েরে যে খানকির বাইচ্চা কইলি, তর মায় খানকি না অইয়া তরে প্যাডে নিছিলো ক্যামনে লো গোলামের পুত! গাইল দিতি আর কোনো বাষা পাইলি না লো গোলামের পুত! শাশুড়িরে জামাই ক্যামনে খানকি কয়? মায়ের ধমকধামকে চুপসে খালি ঠোঙ্গা হয়ে গেলো পঁয়ত্রিশের জামশেদ আলী। আশেপাশে মানুষের চোখে তার কত সম্মান! এই বয়সে পাঁচ, পাঁচখানা ট্রাকের মালিক সে। জামশেদ আলীর অতীত তার বর্তমান পরিচিত সমাজে কৌতূহলের উদ্রেক করলেও, তাকে নিয়ে তামাশা করার স্পর্ধা কারো হয় না। বরং ছোট থেকে বড় হওয়ার মূলমন্ত্র তার নিষ্ঠাকে সবাই সমীহ করে চলে। তাছাড়া জামশেদ আলী স্বল্পভাষী এবং বিনয়ী। তাঁর গলা কখনো কেউ উঁচুতে চড়তে শোনেনি। মেজাজ বিগড়াতে দেখেনি। বরং মা তছিরন তার ঠিক উল্টো। কলতলায় একটু পানি গড়ালেও বাড়ি মাথায় তোলে। বাড়ির ভেতর কারো সামান্য ঝগড়ার গন্ধ পেলে, ন্যায়-অন্যায় এর বিহিত করতে তছিরন বোঁচা নাকটি তখনি আগবাড়িয়ে গলায়। তার নাকের ঝাঁঝে বিশ ঘর ভাড়াটিয়ার পুরো বাড়ি স্তব্ধ। কিন্তু গায়ের ঝালে কেউ কেউ বলে ওঠে, ‘বুড়ির স্বভাব আর গেলো না। আসলে বাড়ি বাড়ি ঝি’য়ের কাজ করে যার দিন গেছে তাছাড়া জোয়ানকালে জামাই মরছে, তাই শইল্যের ত্যাজ সবটুক জমা রইয়া গ্যাছে। অহনো সাঙাত দরকার...। ছেলেকে ঠেলে গেটের বাইরে বের করে নড়বড়ে খিলটা বুড়ি জোরসে লাগিয়ে দিল। অনেকগুলো চোখের পর্দার সামনে নাটকের অবতারণা শেষ হওয়ার পর যেনো মঞ্চটি অন্ধকারে তলিয়ে গেলো। অথচ ভিতর বাড়িতে ষাট পাওয়ারের বাল্বটি জ্বলছে। ঘরের আলোও দ্বিগুণ করা হলো আরেকটি বাল্ব জ্বালিয়ে। তছিরন আলগোছে, মৃদু পায়ে প্রায় লম্বা বউটির কোমর হাতে পেঁচিয়ে টিমটিম করে হাঁটতে লাগলো। নিজের মুখখানা বউয়ের বুকের অনেক নিচে পড়ে থাকলেও, যেন সেই ভারবাহী হয়ে হিঁচড়ে ঘরে এনেছে, এমনভাবে বিছানায় তুললো হাসনাকে। হাসনা গুছিয়ে বসলে সম্ভাব্য আশঙ্কায় চোখ কুঁচকে তছিরন তার কপালে আভাসটা ল করলো। বিষয়টি ছেলেমেয়ে না হওয়ার দোষের কিছু কি না। কারণ কান কথায় ভার করার মানুষের তো অভাব নেই। তছিরন আপন মনে বিড়বিড় করে উঠলো, রাইত য্যান কয়ডা বাজে...। গোলামের পুত কাজডা করলো কি? কাইল সকালে এত্তোগুলান বাড়াইট্টার সামনে আমার এই বউডা ক্যামনে মুখ দ্যাহাইবো? মাইনষে কইবো, সাতটা না পাঁচটা না, একটামাত্র পুত, হেইডারেই বেডি মানুষ বানাইতে পারলো না! আরে বউয়েরে কিছু কওনের থাকলে তারে গরে রাইখ্যা ক...। থাউক তুমি মন খারাপ কইরো না। এ্যর শাস্তি না অওন পর্যন্ত অরে আমি বাড়ি ডুকবার দিমু বাবছো? অইতে পারে অর পাঁচখান ট্রাক আছে। কিন্তু এই বাড়ির জমিনটুক আমার, বুজলা? এই বাড়ির জমিনটুক আমার। মাইনষের গরের মাডির দেয়াল গাঁইত্থা তয় টেকা জমাইছি। এইডা অহন না মফস্বল শহর অইছে। বাড়ি বাড়ি বিল্ডিং উঠছে। আগে তো আন্দার গ্রাম আছিলো। সব মাটির গর আছিলো। তুমি আইয়াই তো আমাগো মাটির গর পাইছো। ...তোমার ঝি-পুত না অইলে এটুক আমি তোমার নামে লেইখ্যা দিমু। আর অইলে তো সবই পাইলা! হাসনার মুখে কথা নেই। সে স্বামী জামশেদের চেয়েও স্বল্পভাষী। তারওপর আবার মেট্রিক পাশ। রূপে কিছুটা কটূ হলেও গুণে সবাই তার প্রতি মুগ্ধ। আর জামশেদের সঙ্গে হাসনার সম্পর্ক বরাবরই দেখতে স্বাভাবিক। তাদের ঝগড়াঝাটি যেমন কারো নজরে পড়েনি, সারিবদ্ধ ঘরের প্রায় বিশটি ভাড়াটিয়ার প্রতিটি পরিবারের নুন, মরিচ, পেঁয়াজ ঘাটতির মতো ঠুনকো প্রয়োজনেও বাড়ির ভেতর মহল শিশু ও মহিলাদের ধারকর্জের জন্য ঢোকা অবাধ। তবু কেউ তাদের হাসনাবানু ও জামশেদ আলীর কোনো অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিঃসন্তান এই একযুগেও দেখার অবকাশ পায়নি। আবার মুখপোড়া বেগুনের মতোও মুখের দশা করে রাখে না তারা, যা নিয়ে আড়ালে আবডালে একটু ঠাট্টা-মস্করা, তিরস্কার চলতে পারে। তছিরন আচমকা এমন ঘটনায় ঘাবড়েই গেছে। নাহলে সে পালঙ্কে উঠে শুতো না। তুলতুলে বিছানায় ঘুম আসে না তছিরনের। পাশে শোয়া হাসনার কন্ঠ বোঁজা। সে কোনো কথা বলছে না। জামশেদ গেটের ওপাশে কী করছে। বাইরে ফিনফিনে কুয়াশা। বেশ শীতভাব। জামশেদের গায়ে শুধু একটা গেঞ্জি। একটা সরু কাঠি দিয়ে গেটের খিলটা বাইরে থেকে তুলে ফেলে যে কেউ ভেতরে ঢুকতে পারে। কিন্তু জামশেদ ঢুকবে না এটা হাসনা জানে। মায়ের লাগানো খিল খোলার সাহস জামশেদ আলী আজো অর্জন করেনি। বাড়িতে কেউ ঢুকতে হলে আগে তছিরন গিয়ে দাঁড়ায়। দিনভর ড্রাইভার, হেলপার ক’জন যখন-তখন আসা যাওয়া করে ট্রাকের যন্ত্রপাতি নেওয়া আনা করে। কিন্তু তছিরন প্রতিবার তাদের মুখে ফেনা বের করে ছাড়ে কৈফিয়ত নিয়ে। তছিরনের কথা তাচ্ছিল্য করে একটা জিনিস বের করে নেয়, এমন সাহস সাত টনি ট্রাকের এক নম্বর ড্রাইভার আনসার আলীরও নেই। একদিন জামশেদ আলী মা’কে হেসে হেসে বলছিল, তুই তো মা তোর পুতের লাই¹া সবতেরেই যম ভাবস্। ছানার মতো আঁচলের নিচে ঢাইক্কা রাখবার চাস্ আমারে। কিন্তু তুই কী করসছ, তুই নিজেই জানস্ না। Ñকী আবার করলাম, বলে সিঁটিয়ে থাকে তছিরন। Ñনা, যা কিছু করস নাই, তরে মাফ করন যায়! Ñনা কইলে আবারো যদি সেইডা করি, তাইলে কি বালো অইবো, কয়বার মাফ করবি? Ñ সেইডাও ঠিক। শোন মা, সেদিন যে তুই কটকটিওয়ালাগো কাছে স্যেরদরে লোহালক্কড় বেঁচলি, ওগুলা বাতিল আছিলো না। বাতিলগুলা রইয়া গেছে। লাখ টেকার জিনিস দিয়া দিছোস্ তুই...। Ñহায়রে পুত এই ডাইনীর মতো কাজটা আমি করলাম? চোউকখের মাথা খাইছি পুত। অহন আঁটতে গ্যালেও উস্টা খাই। বয়স জানি কতো অইছে আমার, ষাইট অইবো না? Ñহঅ, তর মায় তরে জন্ম দেওনের সময় আমারে না কাছে বওয়াইয়া রাখছিলো, তর জন্ম তারিখ মনে রাহনের লাই¹া? Ñএই জীবনের লাই¹া তওবা করলাম, আর আমি কিছু বেঁচতাম না। আমি তো বাবছি ওগুলা পইড়া আবর্জনা অইয়া আছে। এহনতন বাতিল জিনিসগুলা বউরে বুজাইয়া দিস্। Ñবউয়েরে বুজাইয়া দিলে তর তো আবার বুহে ঠাঁডা পড়বো। তুই তো সবঐ চাস্ নিজে আগলাইয়া রাখতে। Ñক্যানযে চাই, সেইডা আমি বাইচ্চ্যা থাকতে তুই বুজতি না। এর লাই¹া ইচ্ছা করে, কইদিন পলাইয়া থাইক্কা দেহি, তুই কেমনে চলোস্। এমনে পলাইলে তো খুঁজতি না। বুইড়া অইয়া গেছি। বুইড়া মাইনষেরে কে খোঁজে? তয় একবার আমার ইচ্ছা আছে, যেইদিকে দুই চোউখ যায়, যামুগিয়া। Ñযা গিয়া। আমার উপর তুই এহনো পাথরের মতো শাসন চাপাস্। মাজে মাজে অসহ্য করোস তুই মা...। Ñযামু মানে? তুই কি ভাবছোস আমি একলা যামু? আরে আমি জানি, আমি একলা গেলে কেউ আমারে খুঁজবো না। তাই তো অপো করতাছি, তর একটা পোলাপাইন অউক আগে। অইলে তারে কোলে লইয়া যামু...। মা আর ছেলের এতোটা সহজ সম্পর্কে বউ হাসনাবানু যেন ওদের দুজনের কাছেই বেশ ভার। মা-ছেলের এই সমান সমান তুই-তোকারি, শাসনের ধরন, প্রশ্রয়, সবকিছুতে হাসনার প্রথমদিকে বেশ অস্বস্তি হতো। এখনো তাদের মাঝখানে কোন ভুমিকা রাখতে পারে না এবং এখনো তাকে নিষ্ক্রীয় হয়ে না পড়ার ভূমিকাটি-ই বরং ওঁৎ পেতে খুঁজে বের করতে হয়। রান্নাবান্নার আয়োজন না দেখলে, শাশুড়ি নিজেই সময় আন্দাজ করে আনাজপাতি গোছাতে শুরু করে দেয়। বউ ছুটে এসে কেড়ে নিলে তছিরন বলে, আমি বাবলাম, তোমার বুজি শইলডা বালা না। তছিরন বিধবা হওয়ার ক’দিন পর থেকেই আর ঘরে বসে পেট চলছিলো না। তখন বাড়ি বাড়ি ঝি’য়ের কাজ নিতে হলো তাকে। পাঁচটাকা পুঁজি জমিয়ে একদিন জামশেদের গলায় গামছা দিয়ে বেঁধে দিতে হয়েছিল একঝুড়ি বাদাম। আজতক কাহিনির শুরুটা ঠিক এমন ছিল। তছিরন এই কথা নিজেই চাউর করে। যে দুঃসহ দিন সে পার করে এসেছে। তাকে আর কে কি বিপদের ভয় দেখাতে পারে। একটা সূক্ষ্ম মারমুখি ভাব নিয়ে তাই নিজের জীবনবৃত্তান্ত সবার মগজে আরোপ করে রাখা। জামশেদের বাবা মারা যাওয়ার পর তছিরনের আবার বিয়ে হয়েছিল। সে বিয়েতে স্বামীর ভাত-কাপড়ের দায় গ্রহণের ভার ছিল না। ছিল শুধু কলঙ্ক এড়াবার প্রয়োজন। যৌবনের একজন অভিভাবক। ব্যাস্। নিজের খুব একটা মত ছিল না তছিরনের। কিন্তু কখন কে অপবাদ দিয়ে বংশের মুখে কালি লেপে। দু’মুঠো ভাত যারা মা-বেটার পাতে দিতে পারেনি, বাইশ বছরের যুবতী তছিরন তার পাঁচ বছরের শিশু জামশেদকে নিয়ে আগল টপকে কাজে নেমে গেলে, তখন তারাই বিধবা ভাবী-বোনের ইজ্জতের দাবীদার হয়ে একজনকে জোগাড় করে এনেছিল চেষ্টা-তদ্বিরে। দু’জনের পেট পালতে নাভিশ্বাস ওঠে তছিরনের। আর সেই ধকল, যেন বেলা শেষে দিনের গল্পের মতো তছিরন আজো জুড়ে বসে পরম্পরা ছাড়া। তার ওপর, .....ব্যাটায় আইলে আর যাইতে চাইতো না। খালি বালোমন্দ খাওনের বায়না। যাওনের সময় নতুন তবন দেও। পাঞ্জাবি দেও। গ্রামের মানুষ কইবো কি? কিছু যদি না-ই পাইলা, তয় বিধবা বিয়া কইরা কি লাভ? এই কথা শোনার তন মরণ বালা। তাই সাহস কইরা কইয়া ফেললাম, তয় বিয়া না কইরা কারো ঢেমনা সাইজ্জা থাকতেন! ব্যাডাই আশ্চর্য অইয়া জানতে চাইলো, ঢেমনা আবার কি? কইলাম পাড়ার মাগীরা তো রাইত-দিন সমানে পয়সা লইয়া ব্যাডাগো লগে শোয়। তারপরও তাগো ইচ্ছা করে, বিনা পয়সায় তাগোরে কেউ একটু সোহাগ করুক। নিজে আতে তুইললা ব্যাডার মুখে পুইরা খাওয়াইতে তাগো ইচ্ছা করে। আঁচল দিয়া মুখ মোছাইয়া দিতে ইচ্ছা করে। কিছু বখশিস দিতেও ইচ্ছা করে। আর এই ইচ্ছার বলি যে ব্যাডা অয়, হেই ব্যাডাই ঢেমনা...। এই কথা শুইন্যা আমার সেই ব্যাডায় কট্টর কট্টর কইরা তাকাইতো আমার দিকে। তয় আস্তে আস্তে আবার চাউনি নরম অইতো। বালা মাইনষের মতো কাটাইতো কয়দিন। এক, একবার মনে অইতো আর যাইবো না। কিন্তু যাওনের লাইগাই তো আইতো! একবার ফিইরা আইতে অনেক দেরি করলে কইলাম, এতোদিন দেরি করছেন ক্যান? তহন কইলো, আমার বড় বউয়ে কয়, আমি যা কামাই করি, বেবাক বলে তোমারে দিইয়া ফেলি। এইবার পলাইয়া আইছি! জামশেদ এট্টু বড় অইলে, যহন এট্টু রোজগারপাতি করতে লাগলো, আমারও একটু বুদ্ধি খুলতে লাগলো। মনে অইতে লাগলো, সাহস বাড়তাছে আমার। ভাইগো লগে, জামশেদের চাচাগো লগে মোকাবেলা অইতে পারুম। তাই ভাবতে লাগলাম, ভাত-কাপড়ের শর্তে মাইয়ামানুষ কোনো ব্যাডার লগে তার শরীর লইয়া বিয়া নামের চুক্তি করলে করুক। ঘুইরা-ফিরা বিয়ার কারণ তো সেইডাই। কিন্তু যেই ব্যাডা আমারে ভাত-কাপড় দিবো না, তার লাই¹া আমার নিজেরে সতীলক্ষ্মী সাজাইয়া রাহন লাগবো? বরং তার লগে শোওনডাই আমার দিনে দিনে ঘেন্নার অইয়া উঠলো। হ্যায় থাকন মানেই আমার শরীলডা মনে রাখন। নইলে শইল ক্যান, তহন তো আত্মার কথাও মনে থাহনের কথা আছিলো না আমার। ... একদিন আমি ব্যাডারে কইলাম, শোনেন, এইবার আপনি আমারে তালাক দেন। নাইলে আপনের বউ যেমুন কয়, আপনি আমারে সব দিইয়া ফ্যালেন। তেমনি আমার পোলাও তো বড় অইতাছে। কোনদিন কইবো, আমার মা তার জামাইয়েরে সব দিইয়া ফ্যালে। ...কইতে কইতে ব্যাটায় একদিন আমার ওপর ফুঁইস্যা উঠলো। গায়ে আতও তোলা শুরু করলো। শ্যাষে আমি একদিন জামশেদের আতে মুগুর তুইল্লা দিলাম। কইলাম, এই সীমানায় পাড়া দিলে ওয়ারে ছাতু বানাইয়া দিবি। দূর থেইক্কা ওই মুগুর দেইখ্যাই আর আহে নাই। কতোদিন পরে একজনে একখান কাগজ লইয়া আইয়া কইলো, তালাকনামা। মেলা দেরি কইরা বুজলাম, কলমার চাইয়া মুগুরের জোর বেশি। কৌতূহলে জটলা পাকিয়ে, চোখ উদগ্র করে বসে থাকা বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে শাশুড়ির এমন অকপট স্বীকারোক্তিতে হাসনা বানুর খুব অসোয়াস্তি হয়। টানটান উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও শ্রোতাদের কেউ ভয়ে একটি প্রশ্নও করতে পারে না। কেমন সিঁটানোভাব থাকে সবার। কারণ প্রশ্নকারীর ওপরই হয়তো বিস্মৃত হয়ে আসা প্রতিপরে ঝাল গিয়ে পড়বে। এরকম হয়েছেও ক’বার। হাসনাবানুর কানপর্যন্ত যেটুকু এসে পৌঁছে তাতে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। তারপর বারো বছর স্বামী জামশেদের স্ত্রীত্ব বরণ করেও স্বামীকে ভালোবাসতে না পারা। বত্রিশ পার হতে চললো বয়স। এখনো মা হতে পারলো না। এ নিয়ে স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করে, সে মনোবৃত্তি তার হয় না। যে মানুষ নিরীহ মানুষ দিয়ে সরকারি জিনিস চুরি করায়। তারপর তাদের বখশিসের নামে নামমাত্র কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করে। ক’দিন আগে টঙ্গী জংশনের কাছে রেল লাইনের নিচে দেয়ার বিশাল কাঠ চুরি করতে যাকে পাঠিয়েছে, সে ধরা পড়েও নেপথ্যে থাকা জামশেদের নামটি প্রকাশ করেনি। কিন্তু মনিবের সঙ্গে যোগাযোগের লোক মারফত সাহায্য প্রার্থনা করেছিল। জামশেদ তার দাবি হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে, কোনো অসৎ মানুষের জন্য তার কোনো দয়া নেই। পরিশ্রমী, ধার্মিকদের জন্য আছে। প্রয়োজনে নুলো, ভিখিরিদের দান খয়রাত করবে। কিন্তু চোরের জেলে পঁচে মরা উচিৎ। হাসনা এই প্রথম ফুঁসে ওঠে, বদররে ছাড়াইয়া আনো। ওর বউ ছেলেমেয়ে কান্নাকাটি করতাছে। আর বিষয়ডা আমার মনে চাপ দইরা আছে। আমি পাগল হইয়া যামু...। জামশেদ জানে, পোস্ট অফিসের মাছি মারা প্রাক্তন কেরানি শ্বশুরের ঘরে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে আছে আরো দু’টি মেয়ে। শ্বশুর নিজে বড় বড় কথা বললেও, তার বড় ছেলে দু’টির কামাই-রোজগার ভালো না। অতএব হাসনাবানুর যাওয়া অতো সোজা না! আর গেলেই কি? যাক না? যা! যা! যা! শুনতে শুনতে হাসনা বিছানা ছেড়ে নিচে নামে। বলে, এইসব কান্ড তোমার মা’য়ের কাছে কইয়া দিমু। হ্যায় তো জানে পোলা তার কত্তো বালো! এই বালোডা হ্যায় জাইন্না মরুক। মায়ের কথা বলায় জামশেদ এই প্রথম হাসনাকে আক্রমণ করে। তছিরন সেদিনের পর থেকে বউকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার ধারনা ছেলেমেয়ে হয় না বলেই ঝঞ্জাটের শুরু হয়েছে। অতএব সে মরে গেলে ঘরের অশান্তি সামলাবে কে? ছেলেকে ধমকে বলেছে, বউরে লইয়া ডাক্তরের কাছে যা। তুই নিজেও চিকিৎসা ল! ম্যাগে ম্যাগে ব্যালা তো কম অইলো না। অহনো পোলাপান না অইলে, বুইড়া বয়সে অইলে মানুষ করবি কবে? Ñআমার আবার কী চিকিৎসা? তর বউয়েরে লইয়া যা! Ñলইয়া যামু মানে? আমি তো চিনি খালি সরকারি হাসপাতাল! এইহানে তো ব্যাডারা শুদু বেতন লওনের লাইগা বহে। চিকিৎসা করনের লাইগা তো তাগো ঝকমইক্যা আলাদা জায়গা বানানো আছে। যেহানে মানুষের আত খুইল্লা টেকা রাইহা দেয়। Ñআইচ্চা মা, তুই টেকা লইয়াই যা। Ñদোষডা কার, না জাইন্না আমি পরের মাইয়ারে একলা লইয়া টানাহেঁচড়া করতে পারুম না। মাইয়ামাইনষেরে ইন্দুর-বিলাইয়েরতন দামডা কেডা বেশি দেয়। সে ডাক্তরই কি, আর গরের ব্যাডাই কি? তুই নিজে খোঁজখবর লইয়া টাকা খরচ কইরা বালা ডাক্তর দেহা। Ñহ্যায় যাইবোনি, আগে জিগা! Ñযাইবো না মানে? অ বউ, তুমি আইজ কাইলের মধ্যে দিনণ ঠিক করো, ডাক্তরের কাছে যাইবা...। ঘর থেকে বারান্দায় ছুটে এসে তড়িৎ গতিতে আবার ভেতরে ঢুকে গেলো হাসনাবানু। আসা এবং যাওয়ার পলকমাত্র সময়ে সে মা এবং ছেলের মগজে ‘না’ শব্দের একটি পেরেক শুধু পুঁতে দিয়ে গেলো। এতে মা বেটা একসঙ্গে আট্টাস লেগে থাকে। জামশেদ স্থির। তবু তছিরন হাত ইশারা দিল, তুই খাঁড়ো, আমি দেখুমনে। তছিরন ভেতরে ঢুকে হাসনাবানুকে ল করে দৃঢ়স্বরে আদেশ দিল, আমার চোউখের দিষ্টে তাকাও। হাসনা তাকালো না। তছিরন নিজের কাছে নিজে আরো অসহনীয় হয়ে উঠলো তাতে। কারণ জামশেদের জন্য আরো সুন্দরী, আরো অবস্থাপণœ ঘরের মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু এই মেয়েটিকে দেখে তছিরনের মনে হয়েছিল, খালি সুন্দর চেহারা আর বইয়ের বিদ্যা ছাড়াও মানুষ সুন্দর আর বিদ্যান হতে পারে। আর সেই সুন্দরতা, সেই বিদ্যাই আসল। হাসনাবানুর মা-বাবা, তাদের পরিবেশ তছিরনের চোখে সেরকম একটি আভাসই প্রমাণ করেছিল। এতোদিন বউ হাসনাবানু সে ধারণা অটুট রাখলেও, এখন সব মিথ্যা মনে হচ্ছে। তছিরণের নড়বড়ে দাঁত কিড়মিড় শব্দ করছে। ছেলে তার অবাধ্য হয় না, অথচ বউ এতো সাহস পেলো কোথায়? থিতু তছিরনের মুখের দিকে না তাকিয়েই হাসনা সূঁচের মতো নিচুস্বরে বলে উঠলো, পোলাপাইন না অইয়াই বাঁচছি। আপনার পোলার স্বভাব আগে বালো করতে কন। তারপর যেহানে নেন, যামু! যাক, তবু বুকের স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে রা পেলো তছিরন। বললো, আমার পোলায় আবার তোমার কি করলো? -ওই যে আমাগো ভাড়াইট্ট্যা বদর জেলে গ্যাছে আপনার পোলার দোষে। তারে দিয়া কতো কিছু চুরি করায়। এহন সে জেলে যাওনে আপনার পোলা তার বউ-পোলাপাইনেরে চিনেই না। কয়দিন ধইরা বদরের বউপোলাপানের কাঁন্দন হুনতাছেন? Ñহ বলেই তছিরন ডুঁকরে উঠলো। তারস্বরে পাঁজর ভেঙে রব উঠলো, হায়, হায়, হায়রে...। আমার পোলায় চোর পালনের চোর অইছে...। মায়ের বেসামাল ঝরঝর কান্নার সাথে জামশেদ অবশ হয়ে আসতে লাগলো। বিলাপ শুনে ছুটে এসেই সে বুঝতে পারছে, হাসনাবানু তার কী সর্বনাশ করেছে। কিন্তু এখন সে নিজেই বড় দুর্বল। জামশেদ এই প্রথম বুঝতে পারে, প্রতিশোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠার আগে শরীর ছাড়াও শক্তির অন্য কোথাও উৎস থাকে। মায়ের জোয়ানকালটা সংহারমূর্তির মতো বিবেকশূন্য জামশেদের চোখে ভেসে ওঠে। বড় বেপরোয়া, দুর্মর সে মূর্তি। মাকে নিয়ে কোন পুরুষ কানাঘুষো করলে, তাকে ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে দেয়নি। তাকে মানুষের কাছে নাকাল, হেয় করে ছেড়েছে মা। যেন ফণা তোলা সাপের মাথায় বাড়ি দিয়ে তবে ছেড়েছে। জামশেদ বড় সত্যি করে জানে, মা তাকে কখনো পরের বাড়ি থেকে চেয়েও কিছু খাওয়ায়নি। নিজের কাজের মূল্য ছাড়া। সেই মাকে আজ বড় অসহায় দেখাচ্ছে। দুই পা ছড়িয়ে ঘরের মধ্যখানে হেঁচকি তুলে কাঁদছে তছিরন। জামশেদ নিজের অজান্তে আবার জড়োসড়ো শিশুটি হয়ে উঠলো। তার এসময়ে কী করণীয় ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। চোখ কাঁৎ করে একবার শুধু তাকালো তার বহুদূরের মানুষ স্ত্রী’র বিমর্ষ মুখের দিকে। তারপর নিজের অজান্তে হাত চলে গেলো মায়ের মাথার’পর। জামশেদ খুব গাঢ়ো করে বলতে চেয়েছিল কথাটি। পারলো না। বড় হালকা শোনালেও মায়ের কাছে ওয়াদা বলে কথা। বললো, তোর কসম মা, আমি আর কোনদিন অন্যায় কাজ করতাম না। করলে ছোডবেলার মতো তুই আমারে লাঠি দিয়া পিডাইস্ ...। এই গাড়ি-বাড়ি তুই নিজের আতে দান কইরা দে মা, আমি কিচ্ছু কমু না তোরে। খালি ওরে আমাগো লগে নিবি না। ও আমাগো কেউ না! বলে জামশেদ তর্জনি আঙ্গুল হাসনা বানুর কপাল ফুটো করার মতো তাক করে থাকে কিছুণ। কিন্তু আঙ্গুল কপালে ঠেকানোর সাহস পায় না। তছিরনের কান্না ততণে শেষ হয়ে গেছে। বৃষ্টি শেষের ধোয়া প্রকৃতির সে স্নিগ্ধস্বরে ধীরে ধীরে বললো, ওই আমাগো সব। ওরে আমি ফুল-চন্দন দিয়া বরণ করমু। কারণ আমার রক্তমাংসের সন্তানরে ওই আমারে চিনাইয়া দিছে।
|