top
logo


feed-image Feed Entries

ধারাবাহিক উপন্যাস
ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম পর্ব ৫ম | Print |  E-mail

ড. এরশাদ উল্লাহ

ইয়ুকি অপ্রতিভ হয়ে বলল, আমার ভুল হলে মা করবেন খালা। আমাকে তো কেহ স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে বলেনি। যা কিছু আমি শিখেছি তা প্রকৃতি থেকে শিখেছি। কেউ যদি বলে ইয়ুকি তুমি স্কুলে যাওনি কেন, তখন আমার লজ্জা করে। আমি তো এ পর্যন্ত এক জায়গাতে রয়েছি। আমি শহর-নগর কিছুই দেখিনি। তাই ‘কুয়ার ব্যাঙের সাথে নিজের তুলনা করলাম।
শোন ইয়ুকি, বুদ্ধি দিয়ে লজ্জা ঢাকা যায়। ফুরুকাওয়া তোমার অনেক প্রশংসা করেন। তিনি বলেছেন যে তুমি সব কাজ নিজে নিজেই করতে পার, তোমাকে কিছু বলে দিতে হয় না। তাই তোমাকে বলছি যে তোমার যোগ্যতার পরিচয় তোমার বুদ্ধির মাধ্যমে প্রমাণিত করবে। তারপর বললেন, ইয়ুকি যদি তুমি কিছু মনে না করো, আজ আমি তোমাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই।
ইয়ুকি হেসে বলল, শুধু একটি প্রশ্ন কেন খালা, আপনার ইচ্ছে হয় তো দশটি প্রশ্ন করতে পারেন। আমি যথা সম্ভব সঠিক জবাব দেবার চেষ্টা করব।
দু’কাপ সবুজ চা ও জাপানি ওছেনবে পিঠা ইয়ুকির সামনে রেখে মহিলা ইয়ুকির পাশে বসে বললেন, তোমার বাবা মার কথা শুনতে চাই আমি। তাঁদের মৃত্যু কিভাবে হয়েছে আমাকে খুলে বলবে কি?
ইয়ুকি বলল, আমার বাবা ওকিনাওয়ার যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর আমার মা কিউশুর একটি মুরুগির ফার্মে কাজ নিয়েছিলেন, কয়েক মাস পরে শত্রুর বোমায় মা সেই ফ্যাক্টরিতে মারা যান।
আকিহিরোর মা বললেন, সে কথা সামান্য শুনেছিলাম। তারপর তুমি কি করে এত দূরে নাকাজাতো গ্রামে এলে?
ইয়ুকি আওমরিতে তার আসার কথা বর্ণনা করে খুলে বলল। সাইয়োরি ও তার মায়ের মৃত্যুর কাহিনিও বলল। তারপর তানাকা পরিবারের কথাও বলল।
কিন্তু তোমার ঘরবাড়ি এখন কে দেখা-শোনা করছেন।
এবার ইয়ুকি মৃদু হেসে বলল, আমাদের কোন ঘর বাড়ি নেই। কিউশুতে আমরা ভাড়াটে বাড়িতে থাকতাম। আসলে আমরা ওকিনাওয়ার বাসিন্দা। শত্রু যখন ওকিনাওয়াতে হামলা করে তখন বাবা আমাকে ও মাকে নিয়ে ওকিনাওয়া থেকে কিউশিওর একটি গ্রামে সস্তা একটি ঘর ভাড়া করে রেখে গিয়েছিলেন। মায়ের মুখে যদ্দুর শুনেছি আমার দাদা-দাদী ওকিনাওয়াতেই শত্রুর বিমান হামলায় মৃত্যুবরণ করেন।
Ñতোমার নানা ও নানীকে তুমি দেখেছ?
দেখেছি, কিন্তু তারা সম্ভবত জীবিত নেই। তাঁদের সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। কিছুণ চিন্তা করে ইয়ুকি বলল, আপনি নিশ্চয় শুনেছেন ওকিনাওয়ার অর্ধেকের চেয়েও বেশি লোক মারা গেছে। আমি মনে করি না যে তাঁরা আজবব্দি বেঁচে আছেন। আর আমার পে সেখানে গিয়ে তাদের  খোঁজাও সম্ভব নয়। আমি পৃথিবীর এমন একজন এতিম যার বংশের শেখড় সবগুলি যুদ্ধের কারণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। আমি একটি শেখড়বিহীন গাছের মতো, ঘুর্নিঝড় যে কোন সময় এসে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আকিহিরোর মা ইয়ুকির করুণ কাহিনি শুনে চোখের পানি মুছে বললেন, কনো না, সে সময়ের ঝড়-তুফান যখন তোমাকে উড়িয়ে নিতে পারল না। এখনকার ছোট ঝড়-তুফানও তোমাকে উড়িয়ে নিতে পারবে না। একটু থেমে মহিলা বললেন, তুমি নিজেকে এতটা হালকা ভাবো কেন, ইয়ুকি? ফুরুকাওয়াসান ও তাঁর স্ত্রী ভাল মানুষ। তাঁরা তোমাকে তাঁদের মেয়ে বলেই জানেন। তোমাকে তাঁদের প্রয়োজন আছে বৈকি!
Ñখালা আমি জানি না ফুরুকাওয়া-পরিবার সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন। আমি সেখানে ভেসে এসে তাঁদের ওখানে কাজ করছি। তাঁরা এখন সবাইকে বলেন যে আমি তাঁদের দত্তক মেয়ে। কিন্তু আপনি একটু চিন্তা করে দেখেছেন কি যে আজঅব্দি আমি তাঁদের বাড়ির একজন মেইড হয়েই কাজ করছি। তাঁরা যদি আমাকে তাঁদের মেয়ে মনে করত তাহলে আমাকে স্কুলে পাঠায়নি কেন? স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া ইচ্ছে আমার ছিল। আমার কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না খালা। আমি মনে করি যে শুধু মুখেমুখে বলে অন্যের সন্তানকে নিজের সন্তান করা যায় না। আমি তো মাত্র নয় বছরের মেয়ে ছিলাম। আমাকে যদি তাঁদের মেয়ে করার ইচ্ছে থাকত তখনই করতে পারতেন।
এই সময় ইয়ুকি তার চোখের পানি মোছে বলল, এত ধন সম্পত্তি দিয়ে তাঁরা কি করবেন। তবে একটি কথা মনে রাখবেন খালা, কোন ধন সম্পত্তির উপর আমার বিন্দু মাত্র লালসা নেই। সেখানে আমি কাজ করে খাচ্ছি মাত্র। চিরদিনের জন্য সে বাড়িতে আমি থাকতে চাই না। আমি নিজেকে সে বাড়ির মেইড ছাড়া কিছু মনে করি না। এখন আমি একজন প্রাপ্ত বয়স্কা নারী। আমার ভাগ্য আমি নিজেই নির্ধারণ করব। কারো প্রভাবে আমি চলব না।
আকিহিরোর মা ইয়ুকিকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আমার চেয়েও তোমার জীবন বড় করুণ। আমি আমার দু’টি শিশু সন্তানকে বাঁচাবার জন্য সব রকম কাজ করেছি। বিপদের দিনগুলোতে কেউ আমাকে সাহায্য করেনি। আমি তোমার মনের কথা সব বুঝতে পারছি। মহিলা চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, সে দিনগুলোতে তোমার মতো নীরবে আমিও কম কাঁদিনি। আমি আমার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে তোমার কথাও চিন্তা করি। আমি আমার অন্তরের অনুভূতি দিয়ে তোমার কথা ভাবি। হয়তো বা তোমার মতো এমন অনেকে বিপন্ন জীবন যাপন করছে।
ইয়ুকি বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, খালা। এত দিন কারো কাছে আমার মনের কথা খোলে বলার কোন লোক পাইনি। আজ আপনাকে কিছু কথা বলতে পেরে নিজেকে কিছুটা হালকা বোধ করছি। তারপর ইয়ুকি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, খালা, আমাকে এখন ফিরতে হবে। লিস্টের জিনিসগুলো দয়া করে দেন, রাত হলে একা আমি ঘরে যেতে পারব না।
আকিহিরোর মা বললেন, আগামী দিন তুমি বরং আরো সকালে এসো। তাহলে অনেক কথা বলা যাবে। কেমন?
ইয়ুকি বলল, খালা, আমাকে সব রান্নার কাজ করতে হয়। ইচ্ছে থাকলেও আরো সকালে আমার পে দোকানে আসা সম্ভব নয়। হাতে ব্যাগটি নিয়ে সে বলল, একদিন তাঁদের অনুমতি নিয়ে আমি আসব খালা। তখন অনেক কথা বলা যাবে।
বের হওয়ার সময়ে আকিহিরো স্কুল থেকে ফিরল। ইয়ুকিকে দেখা মাত্র সে হাত তুলে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করে বলল, আমি ফিরে আসলাম মাত্র, আর এখন তুমি চলে যাচ্ছ?
ইয়ুকি বলল, রাত হয়ে যাবে, এক কিলোমিটার পথ আমি একা রাতে যেতে পারব না। আর রাতে খেঁকশিয়াল দেখলেও আমি ভয় পাই। এখন তুমি আমাকে যেতে দাও।
আকিহিরো বলল, সন্ধ্যায় আমি সেদিনের মতো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসব। দয়া করে তুমি পনের মিনিট অপো করো।
ইয়ুকি অস্ফুট স্বরে বলল, খালা দেখলে কিছু মনে করবেন। তুমি আমাকে আটকে রেখো না।
কিন্তু আকিহিরো ইয়ুকির কোন কথা শুনল না। সে ইয়ুকির হাত ধরে তার মায়ের সামনে টেনে নিয়ে গেল।
আকিহিরোর মা বললেন, তুই তাকে যেতে দে, মেয়ে মানুষ, সন্ধ্যা হলে তার ফিরতে সমস্যা হতে পারে।
ইয়ুকি বলল, শোন আকিহিরো, ঘরে ফিরে আমাকে তাদের দু’জনের রান্না করে খাওয়াতে হবে। এখন দয়া করে আমাকে যেতে দাও। তারপর ইয়ুকি ব্যাগটি হাতে নিয়ে উঠে ঘর থেকে বের হয়ে হাটতে লাগল। আকিহিরো কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না।
সেদিন আকিহিরো আর কোন কথা বাড়াল না। সে শুধু ইয়ুকিকে আরো কিছুণ থাকতে বলেছিল। কিন্তু সে তাকে আটকিয়ে রাখতে পারল না। আকিহিরো বুঝতে পারল যে ইয়ুকি ইতিমধ্যে তার মনের মধ্যে বড় এক ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিবিড়ে ইয়ুকিকে সে কিছু কথা বলতে চায়। কিন্তু সময় খারাপ। সামনে পরীা, তাকে এখন রাত জেগে পড়াশোনা করে পরীার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এখন ডিসেম্বর মাস, সামনের ফেব্র“য়ারি মাসে ফাইনাল পরীা। কিন্তু এখন একটা দিন ইয়ুকিকে না দেখে সে থাকতে পারে না। ইয়ুকি প্রতিদিন বিকাল তিনটায় দোকানে আসে। এখন এই দোকানে আসা যাওয়াটাই ইয়ুকির জন্য বড় আনন্দের, এ কথা ইয়ুকি আগেও তাকে বলেছিল। তবে হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে ইয়ুকির কথা ভেবে এখন সে রাত জেগে পড়াশোনা করে। ইয়ুকিকে যদি আপন করে পেতে হয়, তাহলে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। ইয়ুকির কষ্টের দিনের অবসান চায় আকিহিরো। সেদিন রাতে সামান্য খেয়ে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল আকিহিরো।
সাত
কুবোসানের ছেলে রিউতারো জুনিয়র হাই স্কুলে আকিহিরোর সহপাঠী ছিল। তার বাবা জেলে। তাদের ছোট আকৃতির দু’টো ট্রলার আছে। জাপান সাগরে মাছ ধরে অকশনে বিক্রি করে তাদের সংসার চলে। এখন তারা স্বচ্ছল পরিবার। বাবাকে সাহায্য করার জন্য রিউতারো জুনিয়র স্কুল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। তারপর সে তার বাবার সাথে সমুদ্রে মাছ শিকার করতে যায়। তাই সে আর সিনিয়র হাই স্কুলে যায়নি। তার বাবা কুবোসান অবশ্য আকিহিরোর বাবার সহপাঠী ছিল। কয়েক মাস রিউতারো তার বাবাকে সাহায্য করে সে এখন গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ শিকার পছন্দ করে না। একদিন সে তার বাবাকে জানিয়ে দিল যে মাছ ধরা তার পছন্দ নয়।
ছেলের কথা শুনে রিউতারোর বাবা মনে কষ্ট পেলেও এখন তিনি তাকে প্রতিদিন মাছ শিকারে যাওয়ার জন্য বেশি চাপাচাপি করেন না। একদিন ছেলেকে কুবোসান জিজ্ঞেস করেছিল, মাছ ধরা যদি তোর পছন্দ না হয় তাহলে তোর অন্য কোন পছন্দের পেশা থাকলে আমাকে বল আমি সে ব্যাপারে কি করা যায় চিন্তা করব। কিন্তু রিউতারো তার কোন পছন্দের পেশা আজঅব্দি খুঁজে পায়নি। সে এখন গ্রামের এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে রিউতারো বাজারে এসে চায়ের স্টলে বসে চা আর সিগারেট খায়। আকিহিরোর মায়ের দোকানেও মাঝে মাঝে সিগারেট কিনতে আসে। একদিন দোকানে ইয়ুকিকে দেখে আকিহিরোর মাকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, এটা কার মেয়ে, খালা?
আকিহিরোর মা বলেছিলেন, ফুরুকাওয়ার মেয়ে।
এতদিন তো আমি তাকে দেখিনি, বাবা বলেছিলেন ফুরুকাওয়ার কোন সন্তান নেই। এখন আপনি বলছেন মেয়েটা ফুরুকাওয়াসানের! আমার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার মনে হচ্ছে না।
আকিহিরোর মা আবার বললেন, হ্যাঁ, সে ফুরুকাওয়ার মেয়ে। সেদিন রিউতারো মেয়েটিকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার কঠিন মুখের দিকে চেয়ে কথা বলেনি। ঘরে ফিরে গিয়ে রিউতারো তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, বাবা, তুমি বলেছিলে ফুরুকাওয়ার কোন সন্তান নেই। আজ কোজিমাসানের দোকানে দেখলাম ফুরুকাওয়ার মেয়ে কেনাকাটা করতে এসেছিল।
কুবোসান বললেন, পাগল নাকি, ফুরুকাওয়ার এখন সন্তান এলো কোথা থেকে। না, তার কোন সন্তান নেই। তবে অনেক আগে শুনেছিলাম একটি মেয়ে তার বাড়িতে মেইডের কাজ করে। তুই সে মেয়েটির কথা বলছিস না তো?
রিউতারো প্রতিবাদ করে বলল, কোজিমাসান আমাকে বললেন যে মেয়েটি ফুরুকাওয়ার নিজের মেয়ে। ইচ্ছে থাকে তো তুমি গিয়ে ফুরুকাওয়াকে জিজ্ঞাসা করে দেখো।
কুবোসান ছেলের সাথে সেদিন কথা না বাড়িয়ে বললেন, একদিন তার বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখব।
এক রোববারে কুবোসান ফুরুকাওয়ার বাড়িতে গেলেন। অনেক দিন পরে কুবোসানকে দেখে ফুরুকাওয়া তাকে সমাদর করে ঘরে বসিয়ে অনেক কথা বলছিলেন। ইয়ুকি চা এনে দেওয়ার সময় তাকে দেখে কুবোসান বললেন, এ মেয়েটি কে?
ফুরুকাওয়া জবাব দিলেন, আমার মেয়ে।
-তোমার আবার মেয়ে এলো কোথা থেকে?
ফুরুকাওয়া হেসে এবার সত্য কথাটি বললেন, আসলে আমার পালক মেয়ে। নিজের মেয়ে করে নেব ভাবছি।
-কাউন্সিল অফিসে রেজিস্ট্রি করেছ?
-না, এখনো করিনি। তবে সাপ্তাহ খানেকের মধ্যে করব।
-কার মেয়ে কার নাতিন তা তুমি কিছুই জানো না। নয় বৎসর তোমার বাড়িতে সে কাজ করছে। এতদিন পরে তাকে তুমি নিজের মেয়ে করার চিন্তা করছ। সে যাই হোক, তা তোমার ইচ্ছে। তারপর নিম্নস্বরে বললেন, বেশ মিষ্টি মেয়ে তো! এমন সুন্দরী মেয়ে আমাদের গ্রামে আর আমি দেখিনি। লেখাপড়া কতটুকু করেছে, তা জানো কি?
প্রাইমারী স্কুলও পাশ করেনি। দুঃখী মেয়ে, নয় বৎসরের মাথায় সে তার মা বাবাকে হারিয়েছে।
-কোন্ এলাকার মেয়ে?
-কিউশু এলাকার।
-কিন্তু তুমি একটি কাজ ভাল করোনি। তাকে স্কুলে পাঠানো তোমার কর্তব্য ছিল।
ফুরুকাওয়া বললেন, আমাদের কাজের মেয়ের দরকার ছিল। তাই স্কুলে পাঠাইনি।
-স্কুলে পাঠাইনি বললেই সব দায়দায়ীত্ব শেষ হয়ে যায়নি তোমার। চিন্তা করে দেখো কাজটা ভাল করোনি। এ কথা বলে সেদিন কুবোসান চলে এলেন।
ডিসেম্বর মাসে প্রচুর তুষারপাত হয় আওমরিতে। খাল-বিল-জমিন সর্বত্র কোমল শুভ্র তুষার পড়ে সাদা হয়ে গেছে। এ সময় জাপানের প্রকৃতি ভিন্নরূপ ধারণ করে। এ এলাকায় ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তুষারপাত হয়। কখনো কখনো নভেম্বরের শেষার্ধ থেকে এপ্রিলের প্রথমার্ধ পর্যন্ত তুষার পড়ে। যেদিন তুষার পড়ে সেদিন বাতাস কম থাকে বলে অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগে না। কিন্তু তার পরের দিন যখন উত্তরের বাতাস বইতে শুরু করে তখন অসহ্য শীত অনুভূত হয়। এখানে শিশু এবং যুবক-যুবতীরা শীতকালে সাদা তুষারের উপর খেলা করে। কিন্তু মুশকিল হয় বয়স্ক লোকদের। তারা তখন হিটার জ্বালিয়ে ঘরে বসে থাকে। তাছাড়া জাপানি রাইস ওয়াইন খেয়ে অনেকে শরীর গরম করে ঘুমায়। মহিলারা ঘরে টুকটাক কাজ করে। তুষার যখন শক্ত হয়ে বরফে পরিণত হয়, তখন রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করার সময়ে পা পিছলে অনেকে হাত পায়ে আঘাত পায়। সবাই তখন সাবধানে হাঁটে।
ইয়ুকি এই বরফের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আকিহিরোর মায়ের দোকানে কেনাকাটা করতে আসে। যেদিন অতিরিক্ত তুষারপাত হয় সেদিন সে আসে না।
এদিকে কিছুদিন পূর্বে রিউতারো একটি মোটর সাইকেল কিনে সারা গ্রাম  টো টো করে ঘোরে। সে প্রায় দিনেই চায়ের স্টলে বসে আড্ডা দেয়। একদিন সে ইয়ুকিকে বরফের উপর দিয়ে আকিহিরোর মায়ের দোকানে আসতে দেখে তার পিছে পিছে সেও দোকানে প্রবেশ করে ইয়ুকিকে জিজ্ঞেস করল, এই মেয়ে, তোমার নাম কি?
-ইয়ুকি।
Ñতুমি ফুরুকাওয়াসানের মেয়ে?
Ñনা, আমি তাঁর বাড়িতে কাজ করি।
-তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, তুমি রাজি? কোন প্রকার ভণিতা না করেই রিউতারো সরাসরি নির্লজ্জের মতো কথাটা বলে ফেলল।
-আমি মেয়ে মানুষ, আমার সাথে কি ধরনের বন্ধুত্ব করতে চান?
-কি যে বলো তুমি, মেয়ে বলে কি বন্ধুত্ব করা নিষেধ?
ইয়ুকি কোন কথা না বলে চুপ করে রইল।
রিউতারো বলল, ইয়ুকি।
-বলুন।
এখান থেকে তোমার অনেক পথ হেটে যেতে হয়, তাই না? আমি তোমাকে আমার মোটর সাইকেলে উঠিয়ে তোমার বাড়িতে পৌঁছে দিতে চাই।
-প্রয়োজন নেই। বিলম্ব না করে তৎণাৎ উত্তর দিল ইয়ুকি।
-প্রয়োজন নেই বলছ কেন? আমি যদি তোমাকে মোটর সাইকেলে করে পৌঁছে দেই, তাহলে কি লজ্জার কিছু আছে, কেউ তোমাকে কিছু বলবে?
-লজ্জার কিছু আছে কি নেই সেকথা আপনাকে বলার প্রয়োজন মনে করি না। আমি হেঁটে হেঁটে এসেছি, হেঁটে হেঁটে ফিরে যেতে পারব। আপনাকে আমি চিনি না, আমি কেন আপনার মোটর সাইকেলে উঠে ঘরে ফিরব?
-ও বুঝেছি। তুমি আমাকে চিনতে পারোনি, তাই সঙ্কোচবোধ করছ। আমার নাম রিউতারো কুবো। আমি এই গ্রামের বাসিন্দা। তাছাড়া আমার বাবাকে ফুরুকাওয়াসান চেনেন। তাঁরা দু’জন স্কুল জীবন থেকে বন্ধু ছিলেন।
ইয়ুকির মনে পড়ল কুবোসান একদিন ফুরুকাওয়ার বাড়িতে গিয়েছিল। সেদিন ইয়ুকি কুবোসানের সব কথা আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনেছে। তখন তার মনে হয়েছিল কুবোসান খারাপ লোক নয়। কেননা ফুরুকাওয়াসানকে সে ইয়ুকিকে ‘স্কুলে না পাঠানোর জন্যে’ শক্ত কথা বলেছিল। ইয়ুকিকে স্কুলে না পাঠানোর জন্য এই প্রথম একজন লোক নাকাজাতো গ্রামে প্রতিবাদ করেছিল। এখনো কুবোসানের কথাগুলি ইয়ুকির কানে বাজে।
ততণে আকিহিরোর মা কেনাকাটার ব্যাগটি ইয়ুকির হাতে দিয়ে বললেন, শোন, বরফের উপর দিয়ে সাবধানে হেঁটে যাবে, নইলে আছাড় খেয়ে পায়ে চোট লাগতে পারে।
রিউতারো তখন বলল, আমি মোটর সাইকেলে করে তাকে পৌঁছে দেব, খালা।
-তা কি করে সম্ভব? তোমাকে তো ইয়ুকি চেনে না। আর প্রথম সাাতে কোন মেয়েকে এ ধরনের প্রস্তাব করা অশোভনীয়।
-রিউতারো লজ্জা পেল। সে কোনমতে বলল, আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইছি মাত্র।
-একজনকে এক নজর দেখে, তার সম্পর্কে না জেনে না শুনে কি করে বন্ধুত্ব করার কথা বলছ। কিন্তু মেয়েটি নিরীহ, সে তোমাকে চেনে না বলেছে।
রিউতারো বলল, আমি দুঃখিত খালা। তারপর নীরবে সে দোকান থেকে বের হয়ে তার মোটর সাইকেল স্টার্ট করল।
ইয়ুকি বলল, খালা আজ আমার একা যেতে ভয় লাগছে। দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন।
অজানা-অচেনা লোক দেখলে ইয়ুকি বড় ভয় পায়। আমেরিকার সৈন্যগুলো যখন সাইয়োরি ও তার মাকে গুলি করে হত্যা করেছিল সে কথা তার মনে পড়ে যায়। আজ গায়ে পড়ে রিউতারোর কথাবলাটা ইয়ুকির পছন্দ হয়নি।
এবার সমস্যায় পড়লেন আকিহিরোর মা। ইয়ুকি আজকের মতো এর আগে কোনদিন তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেনি। একে তো রাস্তা ঘাট সব বরফে আবৃত, কিন্তু ইয়ুকি আজ সে কারণে সাহায্য করার জন্য বলেনি মনে হচ্ছে। কারণ, তার মতো তরুণী এতটুকু পথ হেঁটে যেতে পারবে। রিউতারোর ভয়ে এ কথা বলছে না তো! বড় ভাবনায় পড়লেন মহিলা।
আকিহিরোর মা বললেন, এখন কাকে তোমার সঙ্গে পাঠাই বল। আকিহিরো স্কুল থেকে ফিরলে তাকে না হয় বললতাম।
ইয়ুকি বলল, আমি কি কিছুণ অপো করব, খালা?
ঠিক আছে অপো কর।
কিন্তু সেদিন আকিহিরোর ঘরে ফিরতে দেরিীহয়ে গেল। কারণ বরফের উপরে সাইকেল চালানোর সময় চাকা পিছলে পড়ে গিয়ে সে তার পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। আর্ধেক রাস্তা সে তার সাইকেলে ভড় করে আস্তে আস্তে হেঁটে ঘরে ফিরেছে।
ইয়ুকি তার ফিরে আসার পথ অধীর আগ্রহের সাথে দেখছে। আকিহিরো পায়ে ব্যথা নিয়ে ঘরে ফেরার কারণে সে এখন কি করবে ভাবছিল। ইয়ুকি আকিহিরোর পায়ের কাছে বসে বলল, পা ব্যথা করছে তোমার, ডাক্তার ডাকব?
তার পিছে আকিহিরোর মা দাঁড়িয়ে সব ল করছিলেন। আকিহিরো ইয়ুকির প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলল না, এখন তেমন ব্যথা নেই। গরম পানি দিয়ে গোসল করলে আশা করি ভাল হয়ে যাবে।
ইয়ুকি দৌড়ে বাথরুমের পানি গরম করার জন্য যাবার উদ্যোগ নিচ্ছিল। কিন্তু আকিহিরোর মাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই অবস্থা দেখে হাসলেন আকিহিরোর মা। তারপর বললেন, ইয়ুকি ঘরে ফিরতে তোমার দেরি হয়ে যাবে না?
-তাইতো, নিজের অজান্তেই বলল ইয়ুকি । কিন্তু এখন আমি কি করব বলুন। এখন চারদিক অন্ধকার। এদিকে আকিহিরো পায়ে ব্যথা পেয়েছে।
-আমি তোমোহিরোকে বলছি তোমার সাথে যেতে।
আকিহিরো বাধা দিয়ে বলল, মা, ইয়ুকিকে আজ আমাদের ঘরে রেখে দাও। তুমি বরং তার বাজারের থলেটি তোমোহিরোকে দিয়ে ফুরুকাওয়াসানের বাড়িতে পাঠিয়ে দাও।  সেইসঙ্গে ফুরুকাওয়াসানকে একটা চিঠিও লিখে দাও। তাহলে তিনি চিন্তামুক্ত থাকবেন।
-কি লিখব চিঠিতে?
-লিখে দাও ইয়ুকি আজ রাতে আমাদের ঘরে থাকবে এবং কাল সকালে সে ঘরে ফিরে যাবে। আশা করি তিনি কিছু মনে করবেন না।
আকিহিরোর মা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি কি করবেন কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছিলেন না।
আকিহিরো বলল, মা, কিছু মনে করো না। আজ আমরা রাত জেগে ইয়ুকির জীবন কাহিনি শুনব। আশা করি তুমি জান যে তার অতীত জীবন বড় দুঃখজনক।
আকিহিরোর মা কোন কথা না বলে নিচে নেমে একটি চিঠি লিখে  তোমোহিরোর হাতে দিয়ে বললেন, এই চিঠি এবং বাজারের থলেটি নিয়ে ফুরুকাওয়াসানের ঘরে দিয়ে এসো।
-তোমোহিরো কোন কথা না বলে থলে ও চিঠিটি হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
ইয়ুকি বলল, খালা আমি কি গোসলের পানি গরম করব?
-করে দাও।
ইয়ুকি মৃদু হেসে গোসলখানায় গেল।
সেদিনটি এই কোজিমা পরিবারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য এক ব্যতিক্রম দিন ছিল। গোসলের পানি গরম করে ইয়ুকি দৌড়ে মহিলার পাশে গিয়ে তাঁর রান্নার কাজেও সাহায্য করল।
বিগত কষ্টকর জীবনে এই প্রথম আকিহিরোর মা বুঝতে পারলেন যে ইয়ুকি যদি আকিহিরোর বৌ হয়ে এ বাড়িতে আসে তাহলে সে একাই সংসারের সব কাজ সমলাতে পারবে। কিন্তু সে কথা তিনি সেদিন মুখে প্রকাশ করলেন না।  তোমোহিরো ফিরে আসার পরে সবাই যখন এক সাথে রাতের খাবার খাচ্ছিল।
তখন তোমোহিরো বলল, রিউতারো কুবোকে সে বাড়িতে দেখে এলাম।
তার কথা শুনে চমকে উঠল ইয়ুকি। কিন্তু কিছু মন্তব্য না করে খেতে লাগল।
খাবার শেষে আকিহিরো বলল, ইয়ুকি তুমি তোমার মা-বাবার কথা আমাদের শোনাও। তাঁদের সম্পর্কে জানার বড় ইচ্ছে। ইয়ুকি বলল, খালার কাছে ইতিমধ্যে আমার জীবনের সব কথা বলেছি। তবুও যখন তোমরা শুনতে চাচ্ছো আমি আবার বলব। তারপর ইয়ুকি সংেেপ তার জীবনকাহিনি বলল। নতুন কথা যা বলল, তা হল: সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা, যে াতে আমেরিকার সৈন্যটি ঘরে ঢুকে সাইয়োরি ও তার মাকে হত্যা করেছিল, সেই হত্যাকান্ডের কথা। তারপর না খেয়ে থাকার কথা ও ফ্যাক্টরিতে তার মায়ের লাশ সনাক্ত করতে না পারার সেই বীভৎস ও ভয়াবহ কাহিনি। এক পর্যায়ে ইয়ুকি বলল, এসব কথা আমি কাউকে বলিনি। কারণ সেদিনের এই ঘটনার কথা স্মরণ করলে সারাটা দিন আমি অস্থির অবস্থায় থাকি, খাওয়া-দাওয়ার রুচি থাকে না। তাছাড়া রাতে ভয়ের স্বপ্ন দেখি। যথা সম্ভব ঐ সব কথা আমি ভুলে থাকার চেষ্টা করি।
মা চেয়ে আকিহিরো বলল, আজ তোমাকে সে সব কথা শোনাবার কথা না বললেই ভাল হত, তাই না ইয়ুকি? আমি তোমার মনে কষ্ট দেওয়ার জন্য দুঃখিত।
-দুঃখ প্রকাশ করার কোন মানে হয় না আকিহিরো। আমি বরং আজ সেই দুর্দিনের কথাগুলো তোমাদের বলে এখন কিছুটা হালকা বোধ করছি।
ইয়ুকি আরো বলল, দিনের পর দিন রাতের পর রাত সেখানে আমরা বিভীষিকার মধ্যে কাটিয়েছি। বাবা ও মাকে হারিয়ে মনে হয়েছিল পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই। তখন আমি কিছুই বুঝতাম না, সে জন্যই হয়তো আমি আত্মহত্যা করিনি। তোমরা যারা জাপানের উত্তর অঞ্চলে আছ, দণি অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা তোমরা কিছুই জান না। তোমরা তোমাদের বাবাকে হারিয়েছ, তা দুঃখজনক বটে, কিন্তু তোমাদের মা বেঁচে আছেন। কোনকিছুর জন্য আব্দার করার জন্য তোমাদের এই মা তো রয়েছেন। আমি কার কাছে আব্দার করব? আমার মনের দুঃখের কথা বলার এতদিন কেউ ছিল না। এতটুকু বলে ইয়ুকি হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
আকিহিরোর মা তাকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আর কখনো আমরা তোমাকে সেই সব দ্ঃুখের কথা বলার জন্য বলব না ইয়ুকি। এখন তুমি কান্না বন্ধ করো। তোমরা এখন অন্য প্রসঙ্গে কথা বল।
ইয়ুকি বলল, না, খালা। আপনাদের উপর আমি অসন্তুষ্ট নই। আমি বরং আজ আনন্দিত। কারণ বহুদিন পরে আমার দুঃখের কথা বলার লোক আজ আমি পেয়েছি। আজ আমি নিজেকে বড় ভাগ্যবতী মনে করছি।
ইয়ুকি বলছিল, এই নাকাজাতো গ্রামটিতে আমি নয় বৎসর যাবৎ আছি। কিন্তু কেউ কোনদিন আমার মনের জমাট বাঁধা দুঃখের কথা জানার আগ্রহ করেনি। এখানে সবাই জানে আমি একজন অনাথ এতিম, পৃথিবীতে আমার আপন বলতে কেউ নেই। ইয়ুকি কিছুণ চুপ করে কি যেন চিন্তা করছিল। তারপর বলল, হ্যাঁ, কিউশুর সেই হিয়োশি গ্রামে আমার মা মৃত্যুবরণ করার পরেও আমি দেখেছি আমার জন্য অনেক দয়াবান লোক ছিলেন। যাদের কাছে বাকি দিনগুলো আমি অতিবাহিত করেছি, সেখানে তাঁরা কেউ আমাকে ঠেলে ঘর থেকে বের করে দেননি। যদিও তাঁদের দিনগুলো ভাল যাচ্ছিল না। আমার সমবয়সী সাইয়োরি, তাকে ও তার মাকে আমার সামনে শত্রুসৈন্য গুলি করে হত্যা করেছে। তাঁদের হত্যার বিচার করার কেউ সেখানে ছিল না। আমার বাবা ও মা মৃত্যুবরণ করেছেন। আমাকে দেখাশোনা করার কেউ রইল না। এরপর আমাকে কেউ স্কুলে পাঠাল না। এখানে আমার কাজের জন্য কোন পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়নি। তবুও আমি খুশি এই জন্য যে আমি এখানে কাজ করে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম, এবং এখনো বেঁচে আছি। অন্তত এই আশাটুকু তো আমার পূর্ণ হয়েছে, তাই না খালা?
আকিহিরোর মা বললেন, এখন তুমি শান্ত হও ইয়ুকি। তোমার বাকি জীবন তোমার সামনে পড়ে রয়েছে। এখন থেকে নতুন করে তোমার জীবন গড়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও।
আকিহিরোর মা বলছিলেন, দুঃখ চিরদিন কারো সাথী হয় না ইয়ুকি। দুঃখের পরে সুখ আসে। পৃথিবীতে সব কিছুর পরিবর্তন হয়। যেমন ধরো এখন শীতকাল। শীতের পরে বসন্তকাল আসবে। গাছে গাছে আবার নতুন কচি পাতা আসবে, ফুলেফলে ছেয়ে যাবে সারা দেশ। মানুষের জীবনও ঠিক সে রকম। মানুষের জীবন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই উঠানামা করে। কাজেই আমিও আমার দু’টি সন্তান নিয়ে মরতে চাইনি। আমি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম বলেই আজ আমি বেঁচে আছি। তুমি কি তোমার খালার কষ্টের কথা চিন্তা করে দেখেছ। পৃথিবীর সব মানুষের জীবন নাটকের মতো। আমরা আমাদের অজান্তে পৃথিবীর বিভিন্ন অদৃশ্য নাট্যশালায় অভিনয় করে যাচ্ছি মাত্র। তাই তোমাকে আরো ধৈর্য ধরে তোমার জীবনের প্রকৃত সুদিন আসা পর্যন্ত প্রতীা করতে হবে।
আকিহিরোর মায়ের কথাগুলো শুনে ইয়ুকি মাথা নিচু করে কিছুণ বসে রইল। নীরবতা ভঙ্গ করল আকিহিরো। সে বলল, এখন ভোর দু’টো বেজে গেছে। আমাদের ঘুমাবার দরকার, তাই না ইয়ুকি?
ইয়ুকি সঙ্কোচ করে বলল, এই শীতের রাতে বিছনাপত্র  খোঁজাখুঁজি করে বের করার দরকার নেই। আমরা আরো কিছুণ গল্প করে রাত কাটিয়ে দেব। সকালে গিয়ে ফুরুকাওয়াদের নাস্তা তৈরি করে খাওয়াতে হবে।
তারপর সারারাত এরা তিনজন জেগে কাটাল। ইয়ুকি যাবার সময় আকিহিরো বলল, ভাল কথা, ঘরে ফেরার পর ফুরুকাওয়াসান জিজ্ঞেস করলে কি জবাব  দেবে?
-সে ভাবনা তোমাকে করতে হবে না। ইয়ুকি মৃদু হেসে বলল।
-না, তবু বল তাঁদের তুমি কি বলবে?
-সত্য কথা বলব। আমি মিথ্যেকথা বলি না।
-তা না হয় বললে, কিন্তু কি রকম সত্য কথাটি বলবে আমাকে বলতে কি তোমার আপত্তি আছে? আকিহিরো ইয়ুকিকে চাপ দিয়ে বলল।
-না, আপত্তি থাকবে কেন। আমি বলব, তোমার পায়ে ব্যথার কথা। তুমি অসুস্থ ছিলে, তাই তোমাদের ঘরে তোমার মাকে সাহায্য করতে রাতে ছিলাম। তারপর বলল, আমি যা ইচ্ছে তাই বলব, তুমি আমার জন্য কোন চিন্তা করবে না।
ইয়ুকি ঘর থেকে বের হয়ে আধা পথ যাওয়ার পরে রিউতারোর সাথে দেখা হয়ে গেল। সে তার মোটর সাইকেলে করে বাজারের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু ইয়ুকির সামনে এসে থেমে মোটর সাইকেলের উপরে বসেই জিজ্ঞেস করল, ইয়ুকি তুমি কি আকিহিরোকে ভালোবাসো?
এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের জন্য ইয়ুকি মোটেই প্রস্তুত ছিল না! তাছাড়া ভর সকালে গায়ে পড়ে তার সাথে ঘনিষ্ঠতা নেই এমন একজন লোকের সাথে কথা বলার ইচ্ছে তার মোটেই ছিল না। ইয়ুকি রিউতারোর প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে হাঁটতে লাগল। কিন্তু রিউতারো তাকে আবার বলল, আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে কি তোমার কোন অসুবিধা হবে, ইয়ুকি?
এবার ইয়ুকি দাঁড়াল, তারপর বলল, হ্যাঁ, আমি তাকে ভালোবাসি। তাতে আপনার কোন আপত্তি আছে কি?
-না, আপত্তি থাকবে কেন।
-তা হলে আমাকে যেতে দিন। ইয়ুকির মনে আরো একটি প্রশ্ন জেগেছিল। তা হলো গতকাল সন্ধ্যার পরে কেন সে ফুরুকাওয়ার বাড়িতে গিয়েছিল সে ব্যাপারে প্রশ্ন করবে ভাবছিল। কিন্তু নিজের ইচ্ছেকে দমন করে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল।
এবার রিউতারো তার  মোটর সাইকেল থেকে নেমে ইয়ুকির পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। ইয়ুকি বিরক্তিবোধ করছিল, কিন্তু কোন মন্তব্য না করে সে হাঁটছিল।
-ইয়ুকি। রিউতারো তার নাম ধরে এবার প্রথম ডাক দিল। কিন্তু ইয়ুকির তরফ থেকে কোন জবাব এলো না।
তাই পুনরায় রিউতারো বলল, ইয়ুকি আমি কি তোমার অপছন্দ?
ইয়ুকি বলল, না।
-তাহলে তুমি আমাকে পছন্দ করছ না কেন?
ইয়ুকি জবাব দিল, সে জবাব আমি দিতে পারব না।
-আমাকে ঘৃণা করো?
-না, আপনাকে আমি ঘৃণা করব কেন?
রিউতারো বলল, তাহলে তুমি আমাকে পছন্দ করছ না কেন?
-এর জবাব তো দেয়া হয়েছে। দয়া করে আমাকে যেতে দিন। আমি ঘরে ফরতে চাই।
গতকাল এই লোকটির ভয়ে ইয়ুকি সন্ধ্যায় একা ঘরে ফিরতে চায়নি। যদিও রিউতারো তাকে কোন ব্যাপারে ভয় দেখায়নি। তবু কেন জানি অপরিচিত ছেলেরা যখন তার দিকে তীর্যক ভাবে তাকায় তখন সে সত্যিই ভয় পায়।
ঘরে ফিরে প্রথমেই ইয়ুকি ফুরুকাওয়া দম্পতিকে দেখে যথারীতি ‘সুভ সকাল’ বলল। তারাও প্রতিত্তোরে ‘শুভ সকাল’ বললেন।
ফুরুকাওয়ার স্ত্রী বললেন, কোজিমাসানের ঘরে কেমন কাটল তোমার?
-খুব ভাল কেটেছে, সারারাত আমরা কথা বলে কাটিয়েছি।
-কি কথা বলেছ?
-তাঁরা আমার বাবা-মার ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলেন।
-ভাল। সংপ্তি মন্তব্য করলেন মহিলা।
(চলবে)

 


 


bottom

Designed & Developed by Doshdik Media Ltd.
House# 2, Road# 7, Sector# 3, Uttara Model Town, Dhaka-1230, Bangladesh
Phone: +880-2-8919351, +880-2-8919351, +880-2-8956608, +880-2-8956608, Fax: +880-2-8963402,
E-mail: info@doshdik.com
Doshdik Media Limited. All rights reserved.