|
মেলা/ আওয়া-ওদোরি/ উৎসব আর মেলার দেশ জাপান। কত রকমের মেলা আর উৎসব এদেশে অনুষ্ঠিত হয় সারা বছরব্যাপী বলা মুশকিল। তুলনামূলকভাবে গ্রীষ্মকাল হচ্ছে জাপানে উৎসবের ঋতু। এই সময় একাধিক বড় বড় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবগুলো যেমন ব্যয়বহুল তেমনি বর্ণাঢ্য। এদেশের উৎসবগুলো অনেক আগেই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে। বিদেশিরাও এতে অংশগ্রহণ করতে পারে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় জাপানি আওয়া নৃত্যোৎসব পৃথিবীর সেরা উৎসবগুলোর একটি মূলত তার ব্যতিক্রমধর্মী নৃত্যশৈলীর জন্য। এই গ্রীষ্মে জাপানের বিভিন্ন স্থানে আওয়া নৃত্য তথা আওয়া-ওদোরি অনুষ্ঠিত হবে। নারীপুরুষ একসঙ্গে এই নৃত্য করে থাকেন একাধিক ঢাক, কাঁসর, ঘন্ঠি, বাঁশি, শামিছেন ইত্যাদির ছন্দোবদ্ধ শব্দ ও তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। শিশুদের আওয়া-ওদোরিও উপভোগ করার মতো। বিশেষ করে পাতলা মাথায় নৃত্যপটিয়সীরা যেভাবে সমতালে ঠমক তোলেন পায়ের শব্দে তার তুলনা মেরা ভার! এই নাচ যারা দেখেন এমন অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ অনুভব করেন দেহমনে যে, নাচের প্যারেডে নেমে যেতে ইচ্ছে জাগে। এই নাচের আকর্ষণীয় দিকটি হচ্ছে বিশেষ আকৃতির পাতলা ও ছেনসু বা হাতপাখা এমনটি এশিয়ার আর কোন জনগোষ্ঠীর নৃত্যে খুব বেশি ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না। আওয়া-ওদোরির পোশাকও বলে দেয় এই উৎসবটি কতখানি গতিশীল এবং বৈচিত্র্যময়। বৈচিত্র্যময় এই কারণে যে একেক অঞ্চলে একেক রকম রঙের কিমোনো পোশাক পরিধান করেন নৃত্যে অংশগ্রহণকারীরা। কোন কোন অঞ্চলে হাতে বহনযোগ্য ঐতিহ্যবাহী হালকা ওয়াশি-কাগজের তৈরি লন্ঠনও দেখা যায় নর্তক-নর্তকীদের হাতে। সাধারণত দুটি ভাগে এই নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়: অপরাহ্নে অনুষ্ঠিত নাচকে বলে ‘নাগাশি’ আর সন্ধ্যারাতের নাচকে বলা হয় ‘জোমেকি।’ এই নৃত্যেৎসব প্রধানত অনুষ্ঠিত হয় বড় বড় উদ্যান এবং বড় বড় রাস্তার উপর ‘রেন’ বা ‘সারিবদ্ধ প্যারেড’ আকারে। আর এই নৃত্যকে কেন্দ্র করে শহর হয়ে উঠে রমরমা ঐতিহ্যবাহী খাবার-দাবার, পানীয় ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর সারিবদ্ধ অস্থায়ী দোকানপাটের কারণে। এই উৎসবের উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায় যে, মূলত এটি প্রাচীন জাপানি বৌদ্ধভিুদের নেমবুৎসু-নৃত্যের পরিবর্তিত রূপ। জাপানি বৌদ্ধ ধর্মীয় এবং জাতীয় উৎসব বোন-উৎসবের সময় (১২ থেকে ১৫ আগস্ট) এই নৃত্যেৎসবটি প্রথম অনুষ্ঠিত হয় তোকুমিমা-দ্বীপে বলে কথিত আছে। তোকুমিমা-জেলার সামুরাই শাসক হাচিসুকা ইয়েমাসা (১৫৫৮-১৬৩৮) ১৫৮৭ সালে এই নৃত্যেৎসবটি প্রবর্তন করেন বলেও জানা যায়। অবশ্য পরবর্তীকালে সারা জাপানব্যাপী এই উৎসব ছড়িয়ে পড়ে, রূপ ধারণ করে অনন্য সংস্কৃতির। এই নৃত্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর গান: ‘ওদোরু আহো নি/মিরু আহো/ওনাজি আহো নারা/ওদোরানা সোন সোন অর্থাৎ বোকা নাচিয়েকে/যে দেখে সেও বোকা/উভয়ই বোকা যদি/না নাচলে আপে তি।’ যে কারণে তাল মেলাতে পারলে যে কেউ এই নৃত্যে অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সাধারণত এটা কমই ঘটে। নৃত্যের তালে তালে ‘হায়াশি কোতোবা’ বলে সমকন্ঠে কিছু পুনরাবৃত্ত স্তব বা সুরধ্বনি তোলা হয় যেমন ‘ইয়াত্তোসা, ইয়াত্তোসা’, ‘হায়াচ্চা, ইয়াচ্চা’, ‘এরাই ইয়াচ্চা, এরাই ইয়াচ্চা’, ‘ইয়োই, ইয়োই, ইয়োই, ইয়োই’ প্রভৃতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই আওয়া-ওদোরি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস কাঁপিয়েছিল বলে জানা যায়। অন্যান্য দেশেও এই নৃত্যের রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তাই জাপান ট্রাভেল ব্যুরো এই নৃত্য উপভোগ করার জন্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রতি বছর বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। জাপানের উৎসবগুলো গত কয়েক দশকে অভ্যন্তরীণ পর্যটনশিল্পকে প্রভূত লাভবান করেছে।
|