top
logo


feed-image Feed Entries

খোলা চোখে
আসুন নতুন ভোর সৃষ্টি করি | Print |  E-mail

মিলন আহমেদ

প্রতিদিন খবরের কাগজ দেখার আগে ভাবি আজ বুঝি কোন ধর্ষণের খবর পাব না, একটু ভাল লাগবে। কিন্তু হটাৎ দু’একদিন ছাড়া প্রত্যহ ধর্ষণের খবর পড়তেই হয়। কোনদিন দুইটি বা তিনটি ধর্ষণের খবরও দেখতে হয়। এমনই একটি খবর পড়লাম গত ৯ই মে। ঘটনাটি ঘটেছে কদমতলি থানা এলাকায় পূর্ব দনিয়া পলাশপুরের জিয়া সরণিতে। গৃহবধূ ইয়াসমিন আক্তার ও তার তিন বছরের শিশু কন্যা ইরিণ আলম তালহার লাশ পাওয়া গেছে। হত্যার পুর্বে ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করা হয়েছিল তা লাশের অবস্থা প্রমাণ করেছে। পুরুষতন্ত্রের নির্মম বলি হয়ে মৃত্যুবরণ করা হাজার হাজার নারীর সাথে যুক্ত হয়েছে ইয়াসমিন। গত ৮ই মে পড়েছিলাম মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ হাউশি বেগম ও তার দুই বছরের মেয়ে লতা আক্তারের বিষপানে আত্মহত্যার খবর। সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) নূরে আলম বলেছেন স্বামীর নির্যাতনের কারণে হাউশি বেগম বাচ্চাকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পুরুষতন্ত্র কত যে নিষ্ঠুর এবং কত যে নির্মম তারই একটি উদাহরণ মা তার শিশু সন্তানকে বিষপান করিয়ে নিজে বিষপান করতে পারে! অল্প কিছুদিন আগে রাজধানীর উত্তরখান থানার আব্দুল্লাহপুরের বড়বাগে ২ বছর ৯ মাসের শিশু ধর্ষণের খবর আমরা সবাই জানি। ধর্ষিত ওই শিশুটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় থাকাকালে যে কোন মানুষ দেখলে চমকে উঠত সে খবরও আমরা পেয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ধর্ষক গ্রেফতার হয়েছে কিনা সে খবর আমরা পাইনি। শিশুটি সম্ভবত এখনও মায়ের দুধ খায়। রাষ্ট্র ওই দুধের শিশুকে কি জবাব দেবে তা জানি না তবে শিশুটি বুঝে গেল দুনিয়াটা ধর্ষকদের স্বর্গরাজ্য। সত্যিকথা বলতে বাংলাদেশের কোন নারীই ধর্ষণের ভয় থেকে মুক্ত নয়। এখানে প্রত্যেক মেয়ে প্রতিমুহুর্তে ধর্ষণের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্থ থাকে। রাস্তায় চলতে হয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, অপরিচিত কোন পুরুষ কথা বলতে গেলেই নারীর মনের কোণে ধর্ষণভীতি কাজ করে। যতগুলি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তার খুব সামান্যই কিন্তু খবর আকারে প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ ধর্ষিতা এবং তার পরিবার বিষয়টি চেপে যান। লোকলজ্জার ভয়ে কাউকে জানতে দেন না। বিষয়টি জানাজানি হলে এবং মামলা পর্যন্ত গড়ালে ওই ধর্ষিতাকে আরও কয়েকবার সামাজিকভাবে ধর্ষিত হতে হয়।

দেবরাজ ইন্দ্র মাঝেমাঝেই স্বর্গমর্ত্য জুড়ে ধর্ষণ করে বেড়াতো এবং পরাশর কর্তৃক সত্যবতীকে ধর্ষণের বিখ্যাত কাহিনী ভারতীয় পুরাণে আছে। প্রধান ধর্ষক দেবরাজ জিউসসহ বহু দেবতাদের ধর্ষণের বর্ণনা গ্রিক পুরাণেও রয়েছে। পৌরাণিককাল এখন আর নেই, দেবতারা এখন আর ধর্ষণ করে না। তবে পুরুষরা ঠিকই ধর্ষণ করে চলেছে পুরোদমে। পৌরাণিক দেবতারা বাংলাদেশে দলে দলে জন্ম নিচ্ছে কি না জানি না তবে এ দেশটা ধর্ষকদের জন্য খুবই অনুকূল একটি জায়গা, সেকথা নির্দ্বিধায় উল্লেখ করা  যেতে পারে। পৃথিবীর সব দেশেই যদিও ধর্ষণের ঘটনা কম-বেশি ঘটে তবে কিছু দেশ মোটামুটিভাবে ধর্ষণমুক্ত এবং কিছু দেশ ধর্ষণপ্রবণ। বাংলাদেশ প্রচন্ডভাবে ধর্ষণপ্রবণ, কারণ এখানে ধর্ষণকে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও মূলত সামাজিকভাবে ধর্ষিতাকেই অধিক শাস্তি ভোগ করতে হয়। এখানকার ধর্ষণকে এক  প্রকার শিল্প বলা যাবে কি না জানি না তবে বিভিন্ন রকমের ধর্ষণের ঘটনা এখানে ঘটে। অফিসার ধর্ষণ করে মহিলা কর্মচারীকে, গৃহশিক ধর্ষণ করে ছাত্রীকে, ইমাম ধর্ষণ করে আরবী শিখতে আসা বাচ্চা মেয়েকে, পুলিশ ধর্ষণ করে নিরাপত্তাপ্রার্থীনীকে, দুলাভাই ধর্ষণ করে শ্যালিকাকে, শ্বশুর ধর্ষণ করে পুত্রবধূকে, ভন্ডপ্রেমিক ধর্ষণ করে প্রেমিকাকে, দেবর ধর্ষণ করে ভাবীকে, বখাটেরা ধর্ষণ করে পথচারী মেয়েকে, মাস্তানরা দল বেঁধে ঘরে উঠে ধর্ষণ করে মা-মেয়ে উভয়কে, এছাড়া স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের (যখন অনিচ্ছায়) প্রতিনিয়ত ধর্ষণ করে।

কেহ কেহ ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে মেয়েদের দোষ দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেকে বলেন মেয়েদের সংপ্তি পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন মেয়েদের শর্ট পোশাক আসলে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকেও বিঘিœত করছে। কারণ অনেকেই মনে করছেন নারীরা স্বাধীন হলে মনে হয় উশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। কিন্তু নারী অধিকারের সাথে শর্ট পোশাকের কোন সম্পর্ক নেই। তবে ওই মেয়েগুলোকে দোষ দিয়ে লাভ নেই কারণ অধিকারহীন মানুষেরা কখনও সৃজনশীল চিন্তা করতে পারে না। তাই তারা নারী অধিকার সম্পর্কে কিছু জানেও না, বুঝেও না। নিজস্ব স্বকীয়তা না থাকার কারণে পুরুষের দৃষ্টি আর্কষিত করার চেষ্টা করে বিধায় শর্ট পোশাক পরে। যা পুরুষতান্ত্রিকতারই কুফল। তবে যারা এই ভোঁতা যুক্তি দেখান তাদেরকে বলব কতজন বোরখা পরা মেয়ে ধর্ষিতা হচ্ছে তা কি জানেন? তাদেরকে আর একটি কথা বলি বাংলাদেশে পুরুষের জৈবিক চাহিদা মেটানোর বহু বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। মেয়েদের কিন্তু কোথায়ও নেই। সেই হিসেবে মহিলাদেরই পুরুষদেরকে আক্রমণ করার কথা। আসলে এইসব কোন কথা নয়, দায়ী পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্রকে যারা দুধকলা দিয়ে পুষতে চান তারাই এ ধরনের যুক্তি প্রদর্শনের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। পুরুষতন্ত্র হচ্ছে কিছু নিয়ম-কানুনের সমষ্টির নাম। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় যে সকল বিধি নারীর মানবাধিকার লংঘন করে এবং পুরুষকে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেয় তাহাই পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি তন্ত্র। মৌলবাদ সর্বদাই পুরুষতন্ত্রকে আলো, বাতাস, পানি দিয়ে শক্তিশালী করে। একটি কথা মনে রাখতে হবে পুরুষ আর পুরুষতন্ত্র এক জিনিস নয়। অনেক মহিলা হতে পারেন পুরুষতান্ত্রিক, বলা যেতে পারে বাংলাদেশের অধিকাংশ মহিলা বুঝে হোক আর না বুঝেই হোক পুরুষতন্ত্রের স্বার্থরাকারী। আবার অনেক পুরুষ হতে পারেন পুরুষতন্ত্রবিরোধী যদি তিনি গণতান্ত্রিক এবং মানবতাবাদী হন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা পুরুষতান্ত্রিক। পিতার সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যার সমান অধিকার না দেওয়ার আইনটি সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক। কাজেই রাষ্ট্র নিজেই এখানে পুরুষতান্ত্রিক। তাই যত বড় মন্ত্রণালয়গুলোই মহিলারা পরিচালনা করুন না কেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পুরুষতন্ত্রের ধারক এবং বাহক। পাশাপাশি পুরুষদের অধিক সুবিধা দেওয়ার আইনগুলো বাতিল করে নারী-পুরুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা হলে সেেেত্র পুরুষ প্রধানমন্ত্রীও পুরুষতান্ত্রিক হবেন না। পুরুষতন্ত্র সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ নেই বলেই লিঙ্গ বৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িকতার মত বিশ্রী জিনিস যুগ যুগ ধরে বহাল তবিয়তে টিকে আছে।

আন্দ্রিয়া ডরকিন বলেছেন, “ধর্ষণ কোন দুর্ঘটনা নয়, কোন ভুল নয়। পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে যৌনতার সংজ্ঞা হল ধর্ষণ। যতদিন পর্যন্ত এই সংজ্ঞা বহাল থাকবে, ততদিন পর্যন্ত যৌন আক্রমণকারী হিসেবে পুরুষ এবং তার শিকার হিসেবে চিহ্নিত হবে নারী। এই সংস্কৃতিকে যারা স্বাভাবিক মনে করে, তারা ঠান্ডা মাথায় প্রতিদিন ধর্ষণ চালিয়ে যায়।” ডরকিনের এই সংজ্ঞা থেকে আমরা আরও পরিষ্কার যে, ধর্ষণ সম্পূর্ণরূপে পুরুষতান্ত্রিকতার কুফল। ব্রাউন মিলার দেখিয়েছেন, ধর্ষণকারী কোন ব্যক্তি নয় প্রকৃত ধর্ষক হচ্ছে পুরুষতন্ত্র। ধর্ষণ নারীকে সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্থ করে রাখে, নারী স্বাধীনতা খর্ব করে এবং নারীর অভিভাবক হিসেবে পুরুষকে প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে ধর্ষণের কারণে অন্যান্য অনাচার-অনিয়মও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ধর্ষিতার পরিবারের সাথে ধর্ষকের পরিবারের সংঘর্ষ অনেক সময় খুনের পর্যায় পর্যন্ত গড়ায়।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, ধর্ষণ এমন একটি অপরাধ যেখানে ভিকটিমকেই সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ধর্ষণের বিভীষিকায় অনেক মেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। ধর্ষিতার উপর পড়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। পুরুষদের প্রতি তার সকল বিশ্বাস ও আস্থা নষ্ট হয়ে যায় এবং পুরুষকে সে আর সহ্য করতে পারে না। ডঃ হুমায়ন আজাদ ধর্ষিত হওয়াকে নারীর জন্য মৃত্যুর  থেকেও মারাত্মক বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, “ধর্ষিত নারী আনবিক বোমাগ্রস্থ নগরী, যার কিছুই আর আগের মত থাকে না।” কিন্তু ভাবতে কষ্ট হয়, দুঃখ হয়, আশ্চর্য লাগে যে, সমাজ ওই ধর্ষিতার প্রতি সৎব্যবহার করে না বরং তাকে ঘৃণা করে। মানুষ এত পশুত্ববরণ করতে পারে যে, ধর্ষিতার প্রতি মানবিকতার হাত না বাড়িয়ে তাকে বিভিন্ন ফতোয়া দিয়ে অপরাধী বানায়। তার প্রতি করুণা করে না বরং ছি ছি করে। এই হল পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র এভাবে আর কতকাল মানুষকে অন্ধকারে রাখবে তার হিসেব কে দেবে? একটা কথা মনে পড়ে রাত যত গভীর হয় ভোর তত নিকটবর্তী হয়। দুই বছর নয় মাসের শিশু যখন ধর্ষিত হচ্ছে তখনও কি রাত গভীর হচ্ছে না? নির্যাতনের মাত্রা সহ্য করতে না পেরে মা তার শিশুর মুখে বিষ তুলে দিচ্ছে তার পরও কি রাত গভীরই থাকছে?  তখনও কি ভোর নিকটবর্তী হচ্ছে না? আসুন, আমরা মিলেনিয়াম প্রোপোজাল পার্ট ওয়ান (এমপো) এর এগার দফার মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে নতুন ভোর সৃষ্টি করি।

লেখক : প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)
খিদিরপুর ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।


 


 


bottom

Designed & Developed by Doshdik Media Ltd.
House# 2, Road# 7, Sector# 3, Uttara Model Town, Dhaka-1230, Bangladesh
Phone: +880-2-8919351, +880-2-8919351, +880-2-8956608, +880-2-8956608, Fax: +880-2-8963402,
E-mail: info@doshdik.com
Doshdik Media Limited. All rights reserved.