|
চিরনিদ্রায় মান্নান ভূঁইয়া: এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের ইতি |
| Print | |
E-mail |
|
চির বিদায় নিলেন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন ২৭ জুলাই (ইন্না.....রাজিউন)। তাকে অশ্র“সিক্ত বিদায় জানালেন দেশের সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ। প্রবীণ এ নেতার মৃত্যুতে দেশ একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, গণতন্ত্রমনা, উদার অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হারালো। আমরা তার রুহের মাগফিরাত কামান করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা।
মরহুম আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ষাটের দশকে। সেই উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী যে ক’জন ছাত্রনেতা পরবর্তী সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পুরোভাগে চলে এসেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। মূলত সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তার যাত্রা শুরু। ’৬২-তে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য, পরে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে ইউনাইটেড পিপলস পার্টির (ইউপিপি) সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে মান্নান ভূঁইয়া বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমে দলের যুগ্ম মহাসচিব এবং পরে ১১ বছর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ বছর দলীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ১৯৯১ সাল থেকে চার দফায় এমপি নির্বাচিত হন এবং বিএনপির দুই সরকারে মন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেন। এই ক্রম উত্তরণের পেছনে ছিল তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আদর্শ, অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা, বিনয় ও বহুদর্শিতা। একপর্যায়ে দলীয় রাজনীতির কপথ থেকে ছিটকে পড়েন মান্নান ভূঁইয়া। ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। অভিযোগ ছিল, এক-এগারোর ঘটনার পর তিনি দলের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে পরামর্শ না করে নিজস্ব চিন্তাভাবনা প্রচার করেছিলেন। ফলে তাকে বহুল আলোচিত ‘সংস্কারবাদী’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু বহিষ্কারের পর তিনি কোনো ধরনের শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য দেননি। বিএনপিও কথিত সংস্কারবাদীদের অনেকের মতো তাকে দলে ফিরিয়ে নেয়নি। একটি রাজনৈতিক দল গঠনের কথা প্রকাশ করলেও অসুস্থতাজনিত কারণে সে কাজ শুরু করতে পারেননি তিনি। রাজনীতিবিদ মান্নান ভূঁইয়ার অন্যতম কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সেনানী। মুক্তিযুদ্ধের সময় হাতেগোনা যেসব রাজনীতিবিদ দেশের অভ্যন্তরে থেকে বীরত্বের সঙ্গে পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করেছিলেন তিনি তাদের অন্যতম। হানাদার বাহিনীর আক্রমণের মুখে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তিনি প্রতিরোধ গড়ে তুলে নরসিংদী, শিবপুরসহ বিশাল এলাকাকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তিনি ছিলেন ওই অঞ্চলের কমান্ডার। বিজয় অর্জন পর্যন্ত রণাঙ্গনে ছিলেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরে অন্য যারা যুদ্ধ পরিচালনা করেন তারা সবাই ছিলেন সামরিক বাহিনীর লোক। পরবর্তীকালে তাদের অনেকেই রাজনীতিতে প্রথম কাতারের নেতৃত্বে চলে আসেন। বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য থেকে এ কাতারে সাফল্যের সঙ্গে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন মান্নান ভূঁইয়া। এটা তার কীর্তিময় জীবনের উজ্জ্বলতম দিক। ব্যক্তিজীবনে মান্নান ভূঁইয়া ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, বিনয়ী, সদাচারী ও প্রশান্ত মেজাজের মানুষ। তীব্র বিরোধিতার মুখে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখার ব্যাপারে প্রতিপরে কাছেও তার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বিভিন্ন কারণে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা হামেশাই যেতেন তার বাড়ি ও কার্যালয়ে। প্রতিপকে মোকাবিলা করার েেত্র তিনি যুক্তিকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পপাতি হওয়ায় অনেক বিরূপ সমালোচনার মুখেও অনঢ় থাকতে পারতেন মান্নান ভূঁইয়া। অন্তিমশয্যা থেকে সমাধিস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের নেতাদের শোক প্রকাশ ও শোকবাণীতেও তার প্রকাশ ঘটেছে।
রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সাফল্যের যথার্থ মূল্যায়ন করবে সময়। তবে তাৎণিকভাবে বলতেই হয়, তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন কৃতী নেতার শূন্যতা তৈরি হলো। এখন তিনি সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে।
|