|
গৌতম রায়
শৃংখলিত আমাদের প্রবাস জীবন। মূলত অর্থোপার্জন আর কাজই ছেয়ে আছে এ জীবন। বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ ভাগ্যান্বেষণে প্রবাসী। আমাদের পেছনে পড়ে থাকে ফেলে আসা দিনগুলোর অম্ল-মধুর সোনালী স্মৃতি। বর্তমান সর্বদাই ব্যস্ত যান্ত্রিক নিয়মে। ভবিষ্যৎ শুধু আলো-আঁধারের খেলা। তার উপর ভাগ্য ও অধিকারবঞ্চিত শ্রমজীবী প্রবাসীর কাছে দুঃসহ সময় এই প্রবাস। বিশ্বসংসারে গৃহবন্দী প্রবাসীরা। বিদেশ বিভূঁইয়ে থেকেও জগতের রূপ-রস-গন্ধ শুঁকে দেখার ফুসরৎ নেই অনেকের। কৃচ্ছ্রসাধন করে প্রিয়জনদের পাঠানো অর্থে উপকৃত হয় প্রিয় বাংলাদেশ। অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেও প্রবাসীরা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে সব সময়। অথচ বাংলাদেশের এই বীর সৈনিকদের অবদান সবাই স্বীকার করলেও দৃশ্যত প্রবাসীদের প্রবঞ্চনার যবনিকা ঘটে না। ইমেজ সংকট সত্ত্বেও নির্ভেজাল নির্লোভ দেশপ্রেম প্রবাসীদেরই রয়েছে। যুগে যুগে দেশের বৃহৎ অর্জনে প্রবাসীরাই ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। দেশের দুর্যোগ মোকাবেলায় সহায়তা প্রদান, রুগ্ন অর্থনীতির প্রাণসঞ্চার সৃষ্টি, মহান মুক্তিযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠা, স্বৈরাচারবিরোধী জনমত গড়ে তোলা, দেশের অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপসৃষ্টিসহ সবকিছুতেই প্রবাসীদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু কে কবে মনে রেখেছে সেসব? মতা হারিয়ে দেশের যেসব রাজা বাদশারা প্রবাসীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান, বিপদে পরে প্রবাসীদের কাতারে শামিল হন তারাই। আবার মতায় গিয়ে বেমালুম ভুলে যান প্রবাসজীবনের কষ্ট, প্রবাসীদের বেদনা। অথচ এই দেশপ্রেমিক প্রবাসীরা কখনোই রাষ্ট্রমতা লাভের স্বপ্ন দেখেন না, দুর্নীতিবাজদের মতো দেশের সম্পদ লুটপাটের কথা ভাবেন না। একজন দেশপ্রেমিক প্রবাসীর শুধু স্বপ্নÑÑআমার বাংলাদেশ ভালো থাকুক। যাঁকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। আজ এই সভ্যযুগে বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এই প্রবাসীদের একটা অংশ গিনিপিগের মতো মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেেত্র নির্যাতন, হয়রানি ও অবর্নণীয় কষ্ট তাদের দৈনন্দিন ভাগ্যলিখন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে আত্মহত্যা করে বাঁচতে চাইছে। দিনাতিপাত করছে অন্নকষ্টে-অর্থকষ্টে। ন্যূনতম মানবাধিকারও নেই অনেকের। অথচ এই সভ্য দুনিয়া নীরব, নির্বাক! এরই নাম কি প্রবাস? এভাবেই কি সোনার হরিণ পাওয়া যায়? এর অবসান হওয়া দরকার। বহু প্রবাসী মুখ ফুটে নিজের অধিকারের কথাটিও বলতে পারেন না বা জানেনও না কি তার অধিকার। জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণবৈষম্যে তারা দেশে দেশে নিষ্পেষিত, সংকুচিত। বিশেষ করে শ্রমজীবী প্রবাসীরা সভ্য দেশে অসভ্য আচরণে ক্রীতদাসত্ব বরণে বাধ্য হচ্ছে দুটো পয়সার জন্য। শ্বাপদ সংকুল গহীন অরণ্যে বা নির্জন তপ্ত মরু অঞ্চলে পড়ে আছে আমার দেশের মানুষ। ওরা একা, ওদের মুখে ভাষা নেই। প্রতিবাদের সাহস পাবে কোথায়? কদাচিৎ প্রতিবাদী হলেও সভ্যতার দন্ডাদেশ যাবে তাদেরই বিপ।ে কুয়েতসহ দনি-পূর্ব এশিয়াতে রয়েছে এসব একাধিক ঘটনার দৃষ্টান্ত। অথচ বাংলাদেশী শ্রমিকের রক্ত ঘামেই এসব দেশে উন্নয়নের ইতিহাস রচিত হয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে কি পেয়েছে বাংলাদেশীরা? অপমান-লাঞ্চনা-গঞ্জনা আর স্বস্তাশ্রমের বিনিময়ে কিছু রিয়াল, দিনার, রিঙ্গিট, ডলার ছাড়া আর কি? বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় কেন মাইগ্রেন্ট শ্রমিকের এ অবমূল্যায়ন, এত বৈষম্য? কে বলবে সে কথা? সবাই কি শোষক শ্রেণীর কাছে সলাজ আত্মসমর্পন করবো? তাহলে শোষিতের পাশে দাঁড়াবে কে? সময় এসেছে আজ তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্র“ জলে।’ তাদের অশ্র“ মুছে দিতে হবে, ভাষা দিতে হবে রুদ্ধ মুখে। বলতে হবে তাদের ন্যায্য অধিকারের কথা। আসুন আমরা সবাই ভাগ্যবিড়ম্বিত প্রবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে ওদের কথা বলি। ওরা আমাদেরই দুঃখী বাংলা মায়ের সন্তান। ওরাই জাতির জনকের সেই ‘আমার বাংলার মানুষ’।
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়াসম্পাদক/প্রকাশক সাপ্তাহিক প্রবাসীকন্ঠ এবং শ্রমবাজার ও প্রবাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ
|