|
মোঃ মাসুম সরকার আল-আয্হারী
অন্যদিকে জিহ্বার জঢ়তা, কন্ঠের সমস্যা, কিংবা অন্য কোন কারণে যে ব্যক্তি হৃদয়ের গহীনে লুকানো প্রকাশুন্মোখ আবেগটুকুও শতচেষ্ট করে সুস্পষ্ট ভাষায, সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে, আকর্ষণীয় ভঙ্গীতে, হৃদয়গ্রাহী করে, মনের আবেশ মিশিয়ে ব্যক্ত করতে পারেনা তার জবানীতে যত মহমূল্যবান কথাই ধ্বনীতে হোকনা কেন, তা আমাদের বিবেকে কাছে রীতিমত বিরক্তি উদ্রেককর বলে বিবেচিত হয়। তার বক্তব্য আমাদের কর্ণকুহরে বিন্দুমাত্র রেখাপাত কারার পরিবর্তে আমাদের হাসির খোরাক যোগাতে সাহায্য করে। কিন্তু তাকে নিয়ে এভাবে উপহাস করা কতটা সমীচীন তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করিনা। অথচ বিশ্বনবী (সাঃ) বলেনঃ “লজ্জা ও ভাব প্রকাশে অমতা ঈমানের দু’টি শাখা এবং অশ্লীলকথা ও বাচালতা কপটতার দু’টি শাখা” (সুনানুত্ তিরমিজী)। উপরোক্ত আলোচনা হতে কারো মনে এধারণাও জন্মাতে পারে যে, ইসলাম, বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে বিধায় সুন্দর পোষাক, দৈহিক শক্তি-সৌন্দর্য, এবঙ সম্পদের প্রাচুর্যের বিরোধী। প্রকৃতপে ইসলাম এ থেকে যোজন যোজন দূরে। সৌন্দর্য সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্যে হচ্ছেঃ “আপনি বলুনঃ আল্লাহর সাজ-সজ্জাকে যা তিনি বান্দার জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্যবস্তুসমূহকে হারাম করেছে? বলুন এসব নিয়ামত দুনিয়ার জীবনে মু’মিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্যে” (সূরা আল-আ”রাফ ঃ ৩২)। ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত এক হাদীসে বিশ্বনবীর (সাঃ) কাছে এক সাহাবী জানতে চানঃ কোন ব্যক্তি সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ, সুন্দর জুতা পরিধান করতে পচন্দ কররে তা গর্ব-অহংকারের অন্তর্ভূক্ত হবে কিনা। উত্তরে নবী করীম (সাঃ) বলেনঃ “আলাহ তা’য়ালা সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালবাসেন” (সহীহ মুসলিম)। অন্য এক হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেনঃ গর্ব ও অপব্যায় না করে তোমরা খাও, পান করো, সদ্কা করো এবং পোশাক পরিধান করো। কারণ আল্লাহ তায়ালা বান্দার উপর তাঁর নেয়ামতের চিহ্ন দেখতে ভালবাসেন” (মুসনাদঃ ইমাম আহমাদ)। আর বৈরাগ্যবাদ সেতো নাসারারেদ আবিস্কার। ইসলামে এর কোন স্থান নেই। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন ঃ “আর বৈরাগ্য, সে তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছেঃ আমি তা তাদরে উপর ফরজ করিনি” (সূরা হাদীদঃ ২৭)। আর সুস্বাস্থ্য ও সঠাম দেহের শক্তিশালী মানুষের ব্যপারে ইসলামের বক্তব্য হলোঃ হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর কাছে শক্তিশালী মু’মিন দুর্বল মু’মিনের চেয়ে অধিক উত্তম এবং প্রিয়পাত্র। তাবে উভয়ের মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে” (সহীহ মুসলিম)। সুস্বাস্থ্য রায় ইসলাম কার্যকরী পদপে গ্রহন করেছে। স্বাস্থ্যহানীকর সমস্ত উপায় ও উপকরণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশী স্বাস্থ্যসচেতন হওয়ার প্রতি ঊত্সাহ প্রদান করেছে। ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেন: “সুস্থতা এবং অবসর হলো এমন দুটি নেযামত যাতে অধিকাংশ মানুষই তিগ্রস্ত” (সহীহ বুখারী)। ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূল (সাঃ) এক লোককে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন ঃ “পাঁচটি বিষয় কে পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে গুরুত্ব দিবে ঃ যৌবনকে বার্ধক্যের পূর্বে, সুস্থতাকে অসুস্থতার পূর্বে, ধনাঢ্যতাকে দারিদ্রতার পূর্বে এবং অবসরকে ব্যস্ততার পূর্বে” (আল-মুস্তাদরিক ঃ হাকিব)। তাই নামাজ সমাপনান্তে সদম্পদ উপার্জের ব্রত নিয়ে জমিনে ছাড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে ঃ “অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছাড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) তালাশ কর ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও” (সূরা আল-জুমুআহ্-১০)। অতএব একথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট, ইসলাম মানুষের দৈহিক শক্তি ও সৌন্দর্য, সম্পদের প্রাচুর্য সহ অন্যান্য বাহ্যিক মানবীয় গুণাবলীর যথার্থ মূল্যায়ন করেছে এবং সেগুলো অনুশীলনের প্রতি উতসাহ ও অনুপ্রেরনা দিয়েছে। পাশাপাশি এসকল বাহ্যিক শোভা সৌন্দর্যকে মূল্যায়নের প্রকৃত মাপকাঠি স্থির না করে মানুষের নীতি-নৈতিকতা, আত্মার পরিশুদ্ধি, ঈমানের শক্তি কর্ম ও চরিত্রের সততা এবং তার অন্তনিহিত সুকুমারবৃত্তিগুলোকেই বিচার বিশ্লেষনের প্রকৃত মানদন্ড দাঁড় করানোর শিা দিয়েছে। আর এভাবেই ইসলাম বিশ্ব মানবতার বিবেক চুর সামনে এক ব্যতিক্রমধর্মী মানদন্ডের দ্বার উম্মিলীত করেছে। মুসলমানগন যুগ পরম্পরায় যার চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ইতিহাসের পাতায় পাতায় যার প্রমাণ আজও সোনালী অরে লিপিবদ্ধ আছে। প্রাত আলেম আতা ইবনু আবি রিবাহ যিনি ছিলেন একাধারে কৃষ্ণকায়, খোঁড়া, পঙ্গু, টেরা (যা পরবর্তীতে অন্ধত্বে রুপ নেয়।, চেপটা-মোটা-নাসা বিশিষ্ট, কপর্দকহীন, বিকৃত দেহের একজন কৃতদাস। এদসত্যেও তিনি সমগ্র মক্কার মুফতির আসন অলংকৃত করেছিলেন। ওনার বর্তমানে অন্য কেউ ফতোয়া দেয়ার আস্পর্ধা দেখাতোনা। দূরদূরান্ত হতে লোকজন ওনার জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনতে আসতো এমনকি স্বয়ং আমিরুল মু’মিন খলিফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক তার দুই সন্তান সহ ওনার মজলিসে উপস্থিত হয়ে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ের দরস নিতেন। (তারিখু দিমাশকঃ ইবনু আসাকির)।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি মালায়া, কুয়ালা লামপুর, মালয়েশিয়া
|