দশদিক মহাদেশ

হোম অর্থনীতিপুরোনো পথেই নতুন বাজেট

পুরোনো পথেই নতুন বাজেট

রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিলেন। আমাদের শিল্পানুরাগী অর্থমন্ত্রী ব্যর্থতার আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলেননি ঠিকই, তবে সম্ভবত এই প্রথম ব্যর্থতার একটি বড় তালিকা দিলেন। ২০০৯ সাল থেকে অনেক ধরনের পরিকল্পনা নিলেও যা যা করতে পারলেন না, তা অকপটেই বললেন তিনি।
কবিগুরুর ওই গানেই এর পরে লিখেছিলেন, ‘একলা রাতের অন্ধকারে আমি চাই পথের আলো।’ অর্থমন্ত্রী এ কথাটি আর মনে রাখলেন না। ব্যর্থতা নিয়েও বাজেটে অনেক আশার কথা শুনিয়েছেন তিনি, কিন্তু কোন পথে যাবেন সেটি জানাতে পারলেন না। নতুন অর্থবছরে তিনি ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চক্র ভেঙে ৭ শতাংশে নিয়ে যেতে চেয়েছেন, বাড়াতে চেয়েছেন বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরেছেন ৩০ শতাংশের বেশি। কিন্তু কীভাবে তা করবেন তা বলেননি। রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেছেন, ‘দেখতে তোমায় না যদি পাই নাই-বা দেখি’।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পুরোনো পথে হেঁটেই দেশকে ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধির সোপানে আরোহণ’ করার স্বপ্ন দেখালেন। তবে এ জন্য চাইলেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে। আর আড়ালে রাখলেন সংস্কার করতে না পারাকে। অর্থাৎ অর্থনীতির সব ধরনের কাঠামোগত সমস্যার কোনো সমাধান না দিয়েই সমৃদ্ধিশালী দেশের কাতারে শামিল হওয়ার স্বপ্ন দেখালেন।
আপনার জন্য কী আছে: আপনারা যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের ওপর বোঝা বাড়তে পারে। কারণ, রাজস্ব আয়ের যে পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রী নিয়েছেন, তা আগের তুলনায় ৩০ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘সত্যিই উচ্চাভিলাষী।’ অর্থমন্ত্রীর আশা, এই রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। কারণ, কর কর্মকর্তার সংখ্যা বেড়েছে, দক্ষতাও বেড়েছে। চিহ্নিত করা হচ্ছে নতুন নতুন করদাতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা না হলে পুরোনো করদাতাদের ওপরেই চাপবে রাজস্ব আদায়ের চাপ। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এই হারে রাজস্ব আদায় কখনোই করতে পারেনি এনবিআর।
তবে নানা ধরনের করছাড়ও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। করমুক্ত আয়ের সীমা ৩০ হাজার টাকা বাড়িয়ে আড়াই লাখ টাকা করা হয়েছে। তবে ধনীদের খানিকটা ছাড় দিয়েছেন, এখন সারচার্জ দিতে হবে সোয়া দুই কোটি টাকার সম্পদ থাকলে, দুই কোটি টাকা নয়। তবে অর্থমন্ত্রী সম্ভবত বাধার মুখে পড়বেন পোশাকমালিকদের পক্ষ থেকে। পোশাক খাতে ১ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপ করার কথা বলেছেন। এর আগেও অর্থমন্ত্রী এই চেষ্টা করেও পিছিয়ে এসেছিলেন। এবার কি পারবেন?
অর্থমন্ত্রী রাজস্ব আদায়ে এবার করের আওতা বাড়িয়েছেন। ছোট ছোট অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে অর্থমন্ত্রীর বড় ভরসা এখনো উৎসে কর। আগে থেকে কেটে রাখা হয় বলে এই কর আদায় করা সহজ। অর্থমন্ত্রী এই পথটি আরও সহজ করার জন্য উৎসে আয়কর কাটার জন্য একটি স্বতন্ত্র কর অঞ্চল গঠনের প্রস্তাবও করেছেন। আরেকটি সহজ কর আদায় পদ্ধতি হলো সিগারেটের ওপর কর বৃদ্ধি। এতে প্রশংসা পাওয়া যায়, রাজস্বও মেলে। অর্থমন্ত্রী তাও করেছেন। তবে মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ ডেটা ব্যবহারের ওপর ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ নিঃসন্দেহে জনপ্রিয় হবে না।
পোশাক লবি সফল না হলেও দেশীয় শিল্পের কোনো কোনো উদ্যোক্তা সফল হয়েছেন। রাজশাহীর একজন সাংসদ ব্যাটারিচালিত গাড়ি সংযোজন শিল্প প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন মাত্রই। একজন ব্যবসায়ী নেতার আছে গাড়ি সংযোজন শিল্প। এঁরা সবাই পেলেন বিশেষ করছাড়।
প্রত্যাশা সীমাহীন: ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শেষ করে সপ্তম পরিকল্পনায় ঢুকছে অর্থনীতি। স্বভাবতই অর্থমন্ত্রী বিগত পাঁচ বছরের একটি মূল্যায়ন করেছেন। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের উচ্চ প্রবৃদ্ধির একটি পথ রচনার কথাও বলেছেন। অবশ্যই গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন দেশের ইতিহাসে বিরল। তারপরও অর্থমন্ত্রীকে মানতে হয়েছে যে ‘আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বিশ্ব অর্থনীতির শ্লথগতি, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততার কারণে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে লক্ষ্য অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়নি।’ তবে অর্থমন্ত্রীর আশা, সপ্তম পরিকল্পনার মেয়াদে (২০১৬-২০) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮ শতাংশ।
এ রকম এক প্রত্যাশা নিয়ে জাতীয় সংসদে আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব দিলেন, আকারে তা বিশাল, ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। যদিও বিশাল বাজেট দেওয়ার এই সাফল্যের পেছনের গল্পটা কিন্তু অন্য রকম। এই বাজেট হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, যা ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে জিডিপি যতটা বেড়েছে, বাজেট সেই তুলনায় বাড়েনি, বরং কমেছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
ব্যয় করতে না পারায় অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের সংশোধন করেছেন। এতে বাজেট হচ্ছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার, যা জিডিপির ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। সংশোধন করায় আগের বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেট খানিকটা মোটাতাজা দেখালেও তা বাস্তবায়ন না করতে পারার সুফল। কেননা, মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় সবগুলো সূচকই নিম্নগামী। যেমন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির আকার ছিল জিডিপির ৬ শতাংশ, হয়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। আবার রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আর নতুন বাজেট প্রস্তাব হচ্ছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রীর সমস্যা বাজেট পরিকল্পনায় নয়, বাজেট বাস্তবায়নে। অর্থনীতির আকার ও জিডিপির বিবেচনায় বাজেট ব্যয়ের পরিকল্পনাকে বাস্তবসম্মতই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা, কিন্তু আয়ের দিক থেকে বাজেট উচ্চাভিলাষী। আয় কম বলে ব্যয়ও করতে পারছেন না অর্থমন্ত্রী। আরেকটি ব্যর্থতা হচ্ছে প্রকল্প সাহায্য কম পাওয়া। এসব কারণে বড় বাজেট দিয়ে বারবার সংশোধন করতে হয়েছে অর্থমন্ত্রীকে।
ঘাটতি অর্থায়নের দুশ্চিন্তা: ৮০ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা ঘাটতি মেটাতে অর্থমন্ত্রীর ভরসা অভ্যন্তরীণ। কারণ, ২৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটানোর পরিকল্পনার কথা তিনি জানালেন। আর বাকি ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা আসবে অভ্যন্তরীণ ঋণ নিয়ে। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে আসবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
আগের অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করার পরিকল্পনা ছিল নয় হাজার কোটি টাকার। কিন্তু হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকার। এর ফলে সুদ পরিশোধের দায় বেড়েছে অনেক। এ কারণে কমানো হয়েছে সঞ্চয়পত্রের সুদ হার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি বিক্রি কম হয়, কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক ঋণ না পাওয়া যায় তাহলে ভরসা ব্যাংক ব্যবস্থার ঋণ। এতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। আর বেসরকারি খাত তো বঞ্চিত হবেই।
দুশ্চিন্তা আরও আছে: এক বছর আগেও বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় হতো মোট অনুন্নত বাজেটের ১৭ শতাংশ। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর কারণে সেটি এখন ২৩ শতাংশ হয়ে গেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ হলে এর প্রভাব কতটা পড়বে অর্থনীতিতে? অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম কমার কারণে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা অগ্রাধিকার খাতে সঞ্চালন করা হবে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য সুখবর নেই। ফলে বাড়তি করের বোঝা নিয়ে এই বাজেট কতটা স্বস্তি দেবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আশা, চলতি মেয়াদ শেষেই বাংলাদেশের কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ও শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে, যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে, রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলো যানজটমুক্ত হবে, কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ব্যাপকভাবে প্রসারিত হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।
দুই বছর আগে অর্থমন্ত্রী যাকে ‘অশোভনীয় আশাবাদ’ বলেছিলেন, তাকে এবার সংশোধন করে বলেছেন, ‘অশোধনীয় আশাবাদ।’ এই বাজেট কতটা পূরণ করবে তা?


পাতাটি ৪৬১১ বার প্রদর্শিত হয়েছে।