দশদিক মহাদেশ

হোম প্রযুক্তি দরিদ্র ঘরের ‘সুন্দর পিচাই’ আজ গুগলের সিইও

দরিদ্র ঘরের ‘সুন্দর পিচাই’ আজ গুগলের সিইও

দুই কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাটে আলাদা ঘর পেত না ছেলেটা। রাতে ভাইকে নিয়ে শুয়ে পড়তেন বসার ঘরেই। ঘুমের মধ্যেও ঘুরে ঘুরে আসত স্বপ্ন। বড় হওয়ার স্বপ্ন। প্রযুক্তি নিয়ে পড়ার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন বাবা। বলেছিলেন‚ মন দিয়ে পড়াশোনার কোনও বিকল্প নেই| তাতে অবশ্য ছেদ পড়ত না ক্রিকেট খেলায়। চেন্নাইয়ে নিজের স্কুলকে জেলা স্তরে চ্যাম্পিয়নও করেছিলেন তিনি। ছিলেন অধিনায়ক। সেই ছাত্র এখন ৪৩’র যুবক। তার কাঁধে এখনও গুরু দায়িত্ব। স্কুল টিমের বদলে এখন চ্যাম্পিয়নের জায়গায় বসাতে হবে গুগলকে। নিজের সংস্থার সঙ্গে দেশকেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সারথি পিচাই সুন্দররাজন। বিশ্ব যাকে চেনে সুন্দর পিচাই নামে।

ভারতের চেন্নাইয়ের স্কুল থেকে পাশের পরে খড়গপুর আইআইটি (IIT) থেকে মেটালার্জিক্যাল শাখায় ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন সুন্দর। সুযোগ আসে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করার। করেননি তিনি। একই প্রতিষ্ঠানে এমএস করেন। এরপর এমবিএ সম্পূর্ণ করেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যেখানে তিনি ছিলেন সিয়েবেল এবং পামার স্কলার।

দুটি সংস্থায় চাকরির পরে ২০০৪-এ গুগল-এ যোগ দেন সুন্দর। প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে। এগার বছরে উল্কাবেগে উত্থানের পরে আজ সুন্দর গুগলের সিইও।

ছোটবেলায় ছেলের ফোন নম্বর মনে রাখার স্মৃতিশক্তি দেখে মুগ্ধ হতেন সুন্দরের বাবা রঘুনাথ পিচাই। এখনও সুন্দরের বিনম্র স্বভাব‚ ডাউন টু আর্থ মানসিকতা দেখে অবাক হয় তার আশপাশের মানুষেরা। আসলে সুন্দর ভুলতে পারেন না তার অতীত ‚ যেখানে গ্রথিত আছে তার শিকড়। গুগলের সিইও ভুলে যাননি ছোটবেলায় তার বাড়িতে টেলিভিশন সেট ছিল না। গাড়ি তো দূর অস্ত। সুন্দরের প্রথমবার বিদেশযাত্রার টিকিটের যা দাম ছিল‚ তার বাবার বার্ষিক আয় ছিল তার থেকেও কম। সেই জমিনের উপর পা রেখেই মাথা তুলেছেন সুন্দর।


বাবা, মা আর দুই ভাই— এক স্কুটারে চার জন। জায়গার হয়তো টানাটানি ছিল, কিন্তু ইচ্ছে আর সঙ্কল্পের জ্বালানি একটু বেশিই ছিল দু’চাকার ওই বাহনে। তাই চেন্নাইয়ের অতি সাধারণ দু’কামরার ফ্ল্যাট থেকে যাত্রা শুরু করলেও, সিলিকন ভ্যালির আগে তা থামেনি। আর গুগ্‌লের মতো এক ডাকে চেনা সংস্থার সিইও হয়েও তাকে রূপকথা মনে হতে দেননি বাড়ির বড় ছেলে পিচাই সুন্দররাজন। তথ্যপ্রযুক্তির তামাম দুনিয়া যাঁকে সুন্দর পিচাই নামে চেনে। মঙ্গলবারই আইআইটি খড়্গপুরের এই প্রাক্তনীর হাতে গুগ্‌লের রাজ্যপাট তুলে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ।

অনেকে বলছেন, রূপকথা না হোক, এক হিসেবে ইতিহাসই তো তৈরি হল এ দিন। মাইক্রোসফট আর গুগ্‌লের মতো দুই চির যুযুধান দৈত্যের মাথাতেই বসে পড়লেন দুই ভারতীয়। হয়তো সিলমোহরও পড়ল তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় ভারতীয়দের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণের উপরে।

সকলকে চমকে দিয়ে এ দিন পেজ জানান, চোখ ধাঁধানো সাফল্য সত্ত্বেও গুগ্‌লের ব্যবসা ঢেলে সাজছেন তাঁরা। এ বার থেকে মূল সংস্থার নাম হবে অ্যালফাবেট। তার নেতৃত্ব দেবেন তিনি এবং অন্য প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন। আর সেই অ্যালফাবেটের প্রধান শাখা হবে গুগ্‌ল। যার আওতায় থাকবে অ্যান্ড্রয়েড, সার্চ, অ্যাড (বিজ্ঞাপন), ইউটিউব, ম্যাপের মতো ব্যবসা। এই ছিপছিপে, মেদহীন গুগ্‌ল সামলানোর দায়িত্ব বর্তাবে সুন্দরের উপর। যাঁকে ওই কাজে পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন তিনি! পেজের কথায়, ‘‘আমি ভাগ্যবান যে, সুন্দরের মতো মেধাবী, পরিশ্রমী আর গুগ্‌লের প্রতি দায়বদ্ধ লোক সংস্থা চালাবেন।’’

মেদহীন, কারণ এই নতুন গুগ্‌লই আসলে অ্যালফাবেটের রাজকোষ। বছরে প্রায় ৬,৬০০ কোটি ডলারের ব্যবসা করে মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি বহুজাতিকটি। মুনাফা ১,৬০০ কোটি। আর এর প্রায় পুরোটাই আসে সেই সমস্ত ব্যবসা থেকে, যার দায়িত্ব যাচ্ছে সুন্দরের হাতে। যেমন, অ্যান্ড্রয়েড। পৃথিবীর ৭৮% স্মার্টফোনের পেটেই সেঁধিয়ে রয়েছে এই প্রযুক্তি (সফটওয়্যার)। গুগ্‌লের ‘সার্চ’ (নেটে তথ্য খোঁজা) আর তার
সঙ্গে মিলিয়ে বিজ্ঞাপনই পেজের সংসারের মূল রোজগার। একই রকম জনপ্রিয় ইউটিউব, গুগ্‌ল ম্যাপ, আর অ্যাপ (মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন)। পেজের দাবি, গত কয়েক মাসে সুন্দর যে ভাবে সব সামলাচ্ছিলেন, তাতে এই ঘোষণা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা ছিল। কোনও রূপকথা নয়।

মাত্র ৪৩ বছরে গুগ্‌লের রাশ হাতে এল। অথচ ১২ বছর বয়স হওয়ার আগে টেলিফোনেও হাত দেননি সুন্দর। বাড়িতে ছিলই না। ছিল না টিভি। চেন্নাইয়ে চরকি পাক খেতেন বাদুড়ঝোলা বাস বা স্কুটারে।

সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। বাবা কারখানার ইঞ্জিনিয়ার। সুন্দর হওয়ার আগে মা কাজ করেছেন স্টেনোগ্রাফারের। সুন্দরকে বিদেশে পড়তে পাঠানোর জন্য ঋণ জোগাড় করতে পারেননি বাবা। তবু হাল ছাড়েননি। নিজের অ্যাকাউন্ট প্রায় খালি করে তুলে দিয়েছেন থোক
টাকা। যা তখন তাঁর এক বছরের বেতনের থেকেও বেশি। এত ভাল লগ্নি গুগ্‌লও করেছে কি?

স্কুলে বরাবর ভাল রেজাল্ট করা সুন্দর ছিলেন ক্রিকেট ক্যাপ্টেন। ফুটবলের আদ্যন্ত ভক্ত। এর পর আইআইটি খড়্গপুর। যেখানে প্রায়ই তাঁকে দেখা গিয়েছে ক্ষয়ে আসা হাওয়াই চপ্পল পায়ে। স্নাতকোত্তর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। যা গুগ্‌লের আঁতুড়ও। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল, সেখান থেকেই পিএইচডি শেষ করে অধ্যাপক হবেন। তার বদলে এমবিএ করলেন হোয়ার্টন বিজনেস স্কুল থেকে। ২০০৪ সালে গুগ্‌লের সদর দফতরে প্রথম পা। চাকরির ইন্টারভিউ চলাকালীন তাঁকে বলা হয়েছিল সে দিনই নাকি জি-মেল বাজারে আনছে সংস্থা। সুন্দর ভেবেছিলেন, নেহাতই এপ্রিল ফুলের মস্করা। বাকিটা ইতিহাস।

গত এক দশকে দুনিয়ায় সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় সুন্দর এসেছিলেন নিছক প্রোজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে। গোড়ার দিকে তাঁকে শীর্ষ পদের দাবিদারও সে ভাবে মনে করেননি কেউ। শান্ত, মৃদুভাষী, সহকর্মীদের সঙ্গে ভাল ব্যবহারে অভ্যস্ত— এমন লোক যে আস্ত জাহাজের ক্যাপ্টেন হতে পারেন, এমনটা অনেকেই ভাবেননি।

সেই ভাবনায় বদলের শুরু বছর দুই আগে। ওয়েব দুনিয়ায় ঢুকতে মাইক্রোসফটের ব্রাউজার ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের জমি অনেকটাই সরিয়ে নিয়ে গেল গুগ্‌লের ক্রোম। তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়া চোখ কচলে দেখল, সেই সাফল্যের অন্যতম কারিগর মৃদুভাষী সুন্দরই। সাফল্য আরও বড় মাপে এল অ্যান্ড্রয়েড প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে স্মার্টফোনের বাজার ধরার মাধ্যমে। তাই অক্টোবরে পেজ যখন সুন্দরকে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে নিয়ে এলেন, তখনই কাউন্ট-ডাউন শুরু হয়ে গিয়েছিল চূড়ান্ত ঘোষণার।

গুগ্‌লে সহকর্মীরা বলেন, ক্রেতার চাহিদা অনুসারে প্রযুক্তিকে ব্যবহারে সুন্দর ওস্তাদ। পেজ বলেন, ‘‘সুন্দরের আসল গুণ হল খুব কঠিন প্রযুক্তির খুব সহজ প্রয়োগ।’’ সুন্দর নিজে বলেন, ‘‘আমি চাই প্রযুক্তি হবে ক্রেতার চাহিদার চাকর। যেমন, যদি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভুলতে বসি, তখনই যেন চিৎকার করে আমার ফোন। যাতে তা মিস না হয়।’’ প্রযুক্তির প্রতি এই সমর্পণের পাশাপাশি সুন্দরকে এই উচ্চতায় তুলে এনেছে তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি, বরফ শীতল স্নায়ু এবং সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় রেখেও চূড়ান্ত দর কষাকষির ক্ষমতা। এতটাই যে, স্যামসাংয়ের মতো সংস্থাকে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করার ‘হুমকি’ দিতে পিছপা হননি তিনি। সহকর্মীদের মতে, এই সব গুণ ছিল বলেই কিছু দিন আগেও তাঁকে সিইও হিসেবে পেতে কাড়াকাড়ি করেছে টুইটার, মাইক্রোসফট। ওই সব বিরল ক্ষমতা আছে বলেই মাইক্রোসফটের সত্য নাদেল্লা কিংবা পেপসির ইন্দ্রা নুয়ির মতো বিদেশে ভারতীয় সাফল্যের লোকগাথা হয়ে গেলেন সুন্দর। এ দিন তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী, নাদেল্লা, অ্যাপলের কর্ণধার টিম কুক। মোদীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সুন্দর টুইট করেছেন, ‘‘আশা করি শীঘ্রই আপনার সঙ্গে দেখা হবে।’’

বেশ কয়েক দশক ধরে সব চেয়ে বড় তথ্যপ্রযুক্তি বহুজাতিকগুলির শীর্ষে যাঁরা থাকতেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা হতেন নাটুকে, ‘লার্জার দ্যান লাইফ’। যেমন, অ্যাপলের স্টিভ জোবস। মাইক্রোসফটের স্টিভ বামার। গুগ্‌লেরই পেজ-ব্রিন জুটি। সেখানে এখন আই-ফোন তৈরির সংস্থার দায়িত্বে মিতভাষী কুক। বিল গেটসের সংস্থায় ভদ্র নাদেল্লা। আর গুগ্‌লে সুন্দর। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, সিলিকন ভ্যালি কি তবে বদলাচ্ছে?

চমকে দেওয়া বদল অবশ্য এ দিন করেছে গুগ্‌ল। সংস্থার মূল ব্যবসা থেকে উদ্ভাবনী কিন্তু এখনও তেমন রিটার্ন না-দেওয়া ব্যবসাগুলিকে আলাদা করেছে। যেমন, চালকবিহীন গাড়ি কিংবা বেলুনে নেট সংযোগ দেওয়ার প্রকল্প। বেশ অদ্ভুত নতুন মূল সংস্থার নাম— অ্যালফাবেট। অনেকে বলছেন, শূন্য থেকে শুরু করে এই উচ্চতায় পৌঁছনো এবং সেখান থেকে ফের নতুন দৌড় শুরু করা। এটাই তো চিরকালের মার্কিন স্বপ্ন, ‘আমেরিকান ড্রিম’। আর সুন্দর সেই মার্কিন উড়ানের সঙ্গে ভারতীয় স্বপ্নের মোহনা। যে স্বপ্নে তিনি একা নন, পরিবারও একই রকম মশগুল।

আমেরিকায় এসে ৬০ ডলার দিয়ে ব্যাগ কিনতে পারেননি। আজ ৬,৬০০ কোটি ডলারের সংস্থা তাঁর কাঁধে। এই জয় শুধু সুন্দরের নয়। স্কুটারের চার সওয়ারিরই। জয় নিখাদ ভারতীয় স্বপ্নের।

শান্তশিষ্ট, লাজুক ছেলেটাকে উপর থেকে দেখে আলাদা করে খুব নজরকাড়া মনে হতো না। কিন্তু তাকে কোনো প্রশ্ন করলেই ঝটিতি বেরিয়ে আসত ভিতরের শাণিত চেহারাটা। চটপট নিখুঁত উত্তরে একেবারে তাজ্জব হয়ে যেতেন শিক্ষকরা।

মেধাবী ছাত্র আইআইটি-তে অনেকেই থাকেন। কিন্তু মেটালার্জি অ্যান্ড মেটিরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র পি সুন্দররাজনের বি টেক স্তরের ‘থিসিস’-এও ছিল উদ্ভাবনী চিন্তার ছোঁয়া। পড়ার সময় থেকেই ঝোঁক ছিল বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ব্যবহৃত ধাতু (সিলিকন, গ্যালিয়াম) নিয়ে কাজ করার। এ সব দেখে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় আইআইটি খড়কপুরের শিক্ষক-অধ্যাপকদের অনেকে বলতেন, ‘‘এ ছেলে লম্বা রেসের ঘোড়া।’’ কিন্তু পিচাই সুন্দররাজনের (দুনিয়া যাকে সুন্দর পিচাই নামে চেনে) দৌড়টা যে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে গুগলের সিইও পদে পৌঁছে যাবে, এতটা বোধ হয় আশা করেননি তারাও।

শান্ত ছেলেটা পড়াশোনার বাইরে ক্যাম্পাসে বেশি মেলামেশা করত না। তাই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনী গুগ্ল-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছেন শুনেও অনেকেই মনে করতে পারেননি তাকে। কর্পোরেট দুনিয়ায় পরিচিত সুন্দর পিচাইকে আইআইটি নথিপত্রেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। মেটালার্জি অ্যান্ড মেটিরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক সনৎ রায়ই মনে করিয়ে দেন, আইআইটি-র নথিপত্রে ওর নাম ছিল পি সুন্দররাজন। ১৯৯৩-এ মেটালার্জি অ্যান্ড মেটিরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি টেক পাশ পি সুন্দররাজনই এখন নাম বদলিয়ে সুন্দর পিচাই!

মেধাবী সুন্দররাজনকে শিক্ষকেরা মনে রেখেছেন তার অমায়িক ব্যবহারের কারণেও। সনৎবাবু বলছেন, ‘‘ধাতুবিদ্যার কঠিনতম বিষয়েও সড়গড়, ঝরঝরে ইংরেজি বলতে পারা সুন্দরের মধ্যে কোনো দেখনদারি ভাব ছিল না।’’ ছাত্রের এই অনবদ্য কীর্তির পরে উচ্ছ্বসিত কানপুর আইআইটি-র ডিরেক্টর অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মান্না। তার অধীনেই (তিনি তখন খড়কপুরে মেটালার্জি বিভাগের শিক্ষক) স্নাতক স্তরের ‘থিসিস’ করেছিলেন সুন্দর। ইন্দ্রনীলবাবু বলছেন, ‘‘ল্যাবরেটরিতে যেকোনো সমস্যা লিখে ফেলতেও সুন্দরের জুড়ি মেলা ভার। এত ভালো লেখার হাত কম দেখা যায়।’’ তার সঙ্গে ছিল দুরন্ত স্মৃতিশক্তি। একসঙ্গে অনেক ফোন নম্বর মনে রাখতে পারতেন। সহপাঠীদের অনেকে বলছেন, ‘‘ও ছিল ছুপা রুস্তম।’’

কী রকম? ক্যাম্পাসেই সুন্দরের পরিচয় হয়েছিল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আসা অঞ্জলির সঙ্গে। পড়ার সময় দু’জনের প্রেম কিন্তু টেরই পাননি কেউ! পরে সেই অঞ্জলিই সুন্দরের ঘরণী। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু বন্ধু ছিল। তার মধ্যে স্বামীনাথন বলে আর এক যুবকের কথা মনে আছে ইন্দ্রনীলের। মেধাবী স্বামীনাথন পরে জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করার রাতেই গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান।

আইআইটি ক্যাম্পাসে সুন্দরকে পড়ার বাইরে সে ভাবে দেখা না গেলেও টুইটারে কিন্তু তিনি ফুটবল থেকে সমকামী বিয়ে, সবেতেই সপ্রতিভ। টুইটারেই সুন্দরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে সত্য নাদেল্লা, টিম কুক সকলেই। সুন্দর এ দিন টুইটে মোদীকে উত্তরও দিয়েছেন। বলেছেন, ‘‘আশা করছি শিগগিরি আমাদের দেখা হবে!’’

সেপ্টেম্বরে সিলিকন ভ্যালিতে যাওয়ার কথা রয়েছে মোদির। সেখানে তার সঙ্গে সুন্দরের কথা হয় কি না, সে দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন সবাই। গত বছরে সুন্দরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শাহরুখ খানের। গত বছর অক্টোবরে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ ছবির প্রচারে গুগ্ল-এর অফিসে গিয়েছিলেন শাহরুখ। বলেছিলেন, এক সময় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারই হতে চেয়েছিলেন তিনি। সুন্দরের পাল্টা প্রস্তাব ছিল শাহরুখের কাছে, ‘‘আপনি কি এখনও পেশা বদল করতে চান?’’

গুগ্ল অফিসেও সুন্দর জনপ্রিয় তার এমনই অমায়িক ব্যবহারের জন্য। গুগ্ল-এর জনসংযোগ বিভাগের প্রাক্তন কর্ত্রী পরমা রায়চৌধুরী (বর্তমানে সফটব্যাঙ্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট) বলছেন, ‘‘গুগ্ল ক্রোম নিয়ে সুন্দরের সাক্ষাৎকার প্রয়োজন ছিল। ওকে বলতেই অনুরোধ করল, ৩০ মিনিট পরে কথা বলতে। কারণ, সে সময় ও বাচ্চাদের ঘুম পাড়াচ্ছিল।’’ পরমা বলছেন, বড় কাজের মধ্যে ছোট ছোট ব্যাপারগুলোও কখনও সুন্দরের নজর এড়ায় না।

তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়ার শীর্ষে উঠে আসার পিছনে মেধার সঙ্গে অমায়িক ব্যবহারের রসায়ন তো রয়েইছে। আবার আইআইটি-র অন্দরে একটা অন্য রসিকতাও চলছে। ক্যাম্পাসের নেহরু হল-ও (বি টেক পড়ার সময় সুন্দরের ঠিকানা) নাকি এই চমকপ্রদ উত্থানের পিছনে অনেকটা দায়ী। বি টেক পড়ার সময় ওই বাড়িতে চার বছর থাকলে নাকি জীবনটা বদলে যেতে পারে! যার উদাহরণ হিসেবে উঠে আসছে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক ছাত্রের নাম!

রেভিনিউ সার্ভিসের উঁচু পদ ছেড়ে ৪৭ বছর বয়সে যিনি এখন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী! অরবিন্দ কেজরীওয়াল!


পাতাটি ১৭৪৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।