দশদিক মহাদেশ

হোম গণমাধ্যমবাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ

বাংলাদেশের গণমাধ্যম ক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু সাংবাদিকতা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবেই রয়ে গেছে। গণমাধ্যম স্বাধীনতার অবনতি হয়েছে। আর সাংবাদিকতা জড়িয়ে যাচ্ছে ব্যবসা স্বার্থের সঙ্গে। এশিয়াবিষয়ক শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক পত্রিকা দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। প্রতিবেদনের শুরুতে নিউ ইয়র্কভিত্তিক সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটি, সিপিজের সমপ্রতি প্রকাশিত রিপোর্টের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, সিপিজে তাদের পর্যবেক্ষণে দেখেছে, বাংলাদেশে রাজনীতি ও সাংবাদিকতার মধ্যে যে পৃথকীকরণ রেখা রয়েছে তা অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অস্পষ্ট। গণমাধ্যম স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে এ রকম ৯টি দেশকে চিহ্নিত করেছে সিপিজে। বাংলাদেশ দেশগুলোর মধ্যে একটি। পর্যবেক্ষণমূলক ওই রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ সালের রাজনৈতিক গোলযোগের সময় বাংলাদেশের সাংবাদিকদের ওপর সব দিক থেকে আঘাত এসেছে। গণমাধ্যম স্বাধীনতা নিয়ে সিপিজে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এটা সত্যি যে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাত দ্রুত বিকশিত হয়েছে। উঁচুমাত্রায় লাভজনক বহু সংবাদপত্র এবং স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল আত্মপ্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো থেকেও উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা পেয়েছে বাংলাদেশ। এদিকে, কিছু আইনি পরিবর্তনও আনা হয়েছে। যেমন ২০০৯ সালে রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট প্রণয়নের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম স্বাধীনতা বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নিষ্ঠার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের গণমাধ্যম বাজার দ্রুত বিকশিত হওয়ার জন্য বর্তমান সময়টি ভাল। ক্রমবর্ধমান বাজারে লাভ আর প্রভাব দুটিই উপভোগ করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। গত দশকে বাংলাদেশের বড়মাপের বেসরকারি করপোরেশনগুলো মিডিয়া বাজারে প্রবেশ করেছে এবং বর্তমানে জাতীয় গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ দেশের শীর্ষ সব করপোরেট গ্রুপের হাতে। আফসান চৌধুরীর লেখা ‘মিডিয়া ইন টাইমস অব ক্রাইসিস’ বইয়ের উদ্ধৃতি করে প্রতিবেদনে বলা হয়, লেখকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রিন্ট মিডিয়া অনেকখানি অংশ বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো হস্তগত করে নিয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নানা আর্থিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় জড়িয়ে গেছে বলে বইটিতে লেখক গুরুত্বারোপ করেছেন। অন্য সমালোচকরা বলছেন, মিডিয়া ক্রমেই করপোরাটাইজড হয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ ব্যবসা ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নানা মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। উদাহরণস্বরূপ প্রতিবেদনে ট্রান্সকম গ্রুপের কথা বলা হয়। ইলেকট্রনিক, মোবাইল ফোন, ফার্মাসিউটিক্যাল, খাদ্য ও পানীয়- এ রকম বিস্তৃত খাতে ট্রান্সকমের পদচারণার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি সব থেকে বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক প্রথম আলো এবং সর্ববৃহৎ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার প্রকাশ করে। এ ছাড়াও তাদের রয়েছে এফএম চ্যানেল এবিসি রেডিওর মালিকানা। চলমান এ ধারা সুস্থ গণমাধ্যমের পরিপন্থি। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নানামুখী মিডিয়ার একত্রীকরণ এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে সৃষ্টিশীলতা এবং বহুমুখিতার বদলে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে সাধারণ একটি মানদ- এবং সমজাতীয় বা সমমাত্রিক এক সাংস্কৃতিক পরিবেশ। বাংলাদেশে এ ধারা লক্ষণীয়। বলতে গেলে প্রতিটি টিভি চ্যানেলেই একই ধরনের অনুষ্ঠানমালা দেখা যায়। নিম্নমানের ধারাবাহিক নাটক, অসার টক শো আর পক্ষপাতমূলক, অসম্যক সংবাদ প্রচার অনুষ্ঠানের সংমিশ্রণ। তার পরও বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলগুলোর সবটাই খারাপ তা বলা যাবে না। ২০০৫ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্টের সংলাপ টক শো’র প্রথম সমপ্রচার হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো টক শো ধারণাকে আপন করে নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু অনুষ্ঠান দুর্নীতি, নীতিমালা সংস্কার, শিল্প এবং কৃষির মতো ক্ষেত্রগুলোতে নানা ইস্যু খতিয়ে দেখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এফএম রেডিও চ্যানেলের দ্রুত বিকাশ তরুণ প্রজন্মের খোরাক মেটাচ্ছে; বিশেষ করে শহুরে এলাকাগুলোতে। এফএম স্টেশনগুলো বহুমাত্রিক অনুষ্ঠান সমপ্রচার করছে। এর মধ্যে রয়েছে টক শো, গান, সংবাদ ও চিত্তবিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠা কমিউনিটি রেডিও স্টেশনের সংখ্যা এখন ১৪। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদনসহ অনুপ্রেরণামূলক নানা অনুষ্ঠান এসব স্টেশনে প্রচারিত হয়ে থাকে। তথাপি বাংলাদেশে গণমাধ্যম স্বাধীনতায় রয়েছে নানা হুমকি। বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো বাংলা দৈনিক ইনকিলাব ১৬ই জানুয়ারি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। সাতক্ষীরা অভিযান সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে এটা করা হয়। তাদের অনলাইন সংস্করণ এখনও চালু রয়েছে। ইনকিলাব কার্যালয় থেকে প্রতিবেদনটির প্রধান প্রতিবেদক আহমেদ আতিকসহ চার সাংবাদিক গ্রেপ্তার হন। বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক মনে করছেন ইনকিলাবের ভাগ্য আমার দেশের মতো হতে পারে। বিরোধীপন্থি ওই পত্রিকাটির ছাপাখানা ২০১৩’র এপ্রিলে সিলগালা করে দেয়া হয়। এর আগে গ্রেপ্তার করা হয় সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। সমপ্রচার গণমাধ্যমও যে সরকারি চাপ থেকে মুক্ত তা নয়। ২০১৩’র ৬ই মে সংবেদনশীল ধর্মীয় সংবাদ প্রচারের অভিযোগে দিগন্ত টেলিভিশনের সমপ্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা, বিশেষত সমপ্রচার খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালার খসড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রস্তাবিত খসড়ায় সমপ্রচার লাইসেন্স, বিজ্ঞাপন এবং অনুষ্ঠানের ধরনসংক্রান্ত দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ৪০টি নিয়মকানুন বিধিমালার আওতায় রয়েছে অনুমোদনপ্রাপ্ত ৪৬টি সরকারি ও বেসরকারি চ্যানেল। নতুন এ নীতিমালায় সমপ্র্রচারযোগ্য অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সীমারেখা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার বাড়ানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সমপ্রচার লাইসেন্স অনুমোদন প্রদানের সিদ্ধান্ত। স্পষ্টত, বাংলাদেশী গণমাধ্যমে চলমান চ্যালেঞ্জগুলো অব্যাহত থাকছে।


পাতাটি ২৯৮৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।