দশদিক মাসিক

হোম সাক্ষাতকারআমি নিজেই আমার লেখার প্রথম পাঠক

আমি নিজেই আমার লেখার প্রথম পাঠক

আমি নিজেই আমার লেখার প্রথম পাঠক

হাসান আবাবিল

এ সময়ের উদিয়মান একজন লেখক হাসান আবাবিল বিচরণ করছেন সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায়। শিশুদের জন্য মজাদার ছড়া, কিশোর কবিতা, ছোট গল্পের পাশা-পাশি বেতার ও মঞ্চ নাটক, গান, কবিতা ছাড়া ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীতে একাধিক নাটক ও গান প্রচারের পাশা-পাশি মঞ্চ নাটক লিখে চলেছেন নিয়মিত। স্কুল জীবন থেকেই ছড়া লেখায় হাতে খড়ি এবং স্থানীয় ও জাতীয় পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশ পায়। বাংলাদেশ ও কলকাতার বিভিন্ন লেখকের সাথে তার একাধিক বই প্রকাশ পেয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয় পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখে আসছেন। প্রকাশিত বই-‘কদম কেয়া’ (গল্প/যৌথ), ‘বর্ষায় চাঁদনী রাতে’ (গল্প/যৌথ), ‘অনন্যা’ (কাব্য/যৌথ), ‘মুক্তি যুদ্ধের ছড়া’ (যৌথ), ‘দশ তরুণের গল্প’ (সম্পাদিত), ‘নষ্ট সময়ের ঘ্রাণ’ (সম্পাদিত), ‘নীড়হারা পাখিরা’ (সম্পাদিত), একক ছড়া গ্রন্থ- ‘ছড়িয়ে দিলাম ছড়া’, ‘ফুলপরিদের দেশে’ এবং ‘টুকরো প্রেমের ছড়া’। ছোট গল্প গ্রন্থ- ‘লেন নম্বর তের’, কাব্য গ্রন্থ,‘মানুষ মানুষ পাখি’। সাহিত্য কর্মে অবদানের জন্য রাজশাহী কলেজ ব্যবস্থাপনা বিভাগ কতৃক বিশেষ সন্মানা পপদক-২০১১ ‘প্রত্যাশা সাহিত্য পদক-২০১২’ কেন্দ্রীয় কিশোর পাঠাগার কতৃক ‘মধুসুদন স্মৃতি পদক-২০১৩’ সহ বিভিন্ন পদক ও পুরস্কারে ভূষীত হন। বর্তমান ঠিকানা-গ্রাম- ১১৩৪ ফাল্গুনী লেন, কামাল খাঁ রোড়, লক্ষীপুর ভাটাপাড়া, থানা- রাজপাড়া, জেলা- রাজশাহী।সব্যসাচী লেখক, কথা সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব হাসান আবাবিল এর স্বাক্ষাৎকার গ্রহন করেছেন ফিলিয়াপস হোসেন।
ফিলুঃ- আপনার লেখালেখি কেমন চলছে?
হাসান আবাবিলঃ- ভালো। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও কিছু না কিছু লিখছি।
ফিলুঃ- কিভাবে লেখা লিখিতে আসলেন?
হাসান আবাবিলঃ- লেখা-লেখিতে আসা মূলত শখের কারনে। তখন ক্লাস সিক্স-এ পড়তাম। তারপর কখন জড়িয়ে গেছি বুঝতেই পারিনি।
ফিলুঃ- যে উৎসাহ প্রথম পেয়েছেন? যার প্রেরণা এখনও আছে?
হাসান আবাবিলঃ- আমার উৎসাহটা মূলত আমার বাবা থেকে, প্রেরণা বলতে আমার পরিবার আর বন্ধুরা, যারা আমার সাথে সব সময় আছে।
ফিলুঃ- এবারের বই মেলাতে আপনার কোন বই বাজারে আসছে?
হাসান আবাবিলঃ- এবারের বই মেলাতে আমার দুইটি বই বাজারে আসছে। একটি কবিতার বই ও একটি ছোট গল্পের। কবিতার বইয়ের নাম, ‘মানুষ মানুষ পাখি’। ছোট গল্পের বইয়ের নাম- ‘লেন নং তের’।
ফিলুঃ- বই দু’টি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কেমন?
হাসান আবাবিলঃ- প্রত্যাশা তো অবশ্যই বুক ভরা, এক দশক ধরে লেখা কবিতার কিছু কবিতা নিয়ে কবিতার বইটি বেরোচ্ছে, যদিও আমি নিজেকে কবি হিসেকে তেমন পারদর্শী বলে মনে করি না
ফিলুঃ- আপনি কোন নতুন লেখা লিখলে তার প্রথম পাঠক কে?
হাসান আবাবিলঃ- মূলত আমি নিজেই আমার লেখার প্রথম পাঠক। আমার কাছে কোন লেখা ভালো না লাগলে তাকে আরো ভালো করার চেষ্টা করি। তার পরেই আমার বাবা এবং আমার পরিবার আমার লেখার প্রথম পাঠক হযে ওঠে।
ফিলুঃ- আপনার প্রকাশিত বই সংখ্যা কত?
হাসান আবাবিলঃ- যৌথ ভাবে বই সংখ্যা প্রায় ৩২টি, সম্পাদিত ৪টি, একক ছড়া ৩টি, একক গল্পের ১টি এবং কবিতা ১ টি, এছাড়া শীঘ্রই শিশুতোষ কিছু রম্য ছড়া ও ছোট গল্পের বই এর মুখ দেখা যাবে বলে আশা আছে।
ফিলুঃ- আপনার জীবনে বিশেষ কোন স্মৃতি?
হাসান আবাবিলঃ- মানুষের জীবন স্মৃতি নির্ভর। আমার জীবনেও অনেক স্মৃতি আছে, স্কুল জীবনে স্মৃতিগুলো বেশির ভাগই আমাকে এখনও হাসায়। এছাড়াও কিছু কিছু স্মৃতি আমাকে কাঁদায় বা ভাবায়। কবিরা সাধারনত স্মৃতিকে বিষেভাবে সংরক্ষণ করে রাখতে সাচ্ছন্দ বোধ করে।
ফিলুঃ- আমারা জানি আপনি একজন থিয়েটার কর্মী ও নির্দেশকও বটে। কখন, কিভাবে থিয়েটারে জড়িত হলেন?
হাসান আবাবিলঃ- আমি স্কুলে পড়া কালিন সময়ে প্রথম নাটক করি। তার পরে মহল্লার একটি সংগঠনের হয়ে একবার নাটক করেছিলাম, তখন দর্শকের উৎসাহ ও চাহিদা আমাকে এ পথে ধাবিত করতে ভূমিকা রেখেছে। এর পর থেকে মহল্লা ও স্থানীয় ভাবে বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে নিয়মিত অভিনয় শুরু করলাম, একপর ৯৮ সালে সিয়াম, দিপন, রাজিব, গাজি সহ কতিপয় বন্ধু মিলে আমার নিজের রচনায় ছোট ছোট কমেডি নাটিকা মঞ্চায়ন করতে লাগলাম, সে সময় মুখাভিনয় আর নাটিকা গুলো দর্শক বেশ সানন্দে গ্রহণ করতো, তাতে করে আমাদের আগ্রহ আর উৎসাহটাও বহুগুনে বেড়ে যেত। পরে ২০০৪-৫ সলের দিকে রাজশাহীর স্বনামধন্য মঞ্চকথা থিয়েটারের সদস্য হলাম। বর্তমানে আমি এর সাংগঠনিক সম্পাদক। টুক-টাক নাটক লিখি, মাঝে-মাঝে নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত অভিনয় চালিয়ে যাবার চেষ্টা করছি।
ফিলুঃ- আপনার লেখা মঞ্চ নাটক ‘আয়না’ ও বেতার নাটক ‘শরতের ফুল’ বেশ দর্শক প্রিয়তা পায়। এ সম্পর্কে জানতে চায়?
হাসান আবাবিলঃ- ‘আয়না’ আমার লেখা প্রথম নাটক। মূলত সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এ নাটকটি লেখা। এতে সমাজস্থ দূর্নীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। মঞ্চকথা থিয়েটারের ৪২তম প্রজজনা এটি। সে সময় থিয়েটারের সাধানর সম্পাদক আর সভাপতি রনি ভাই আর রানা ভাই এর দশ মন ওজনের তাগাদায় নাটকটি লেখা।
তেমনি ‘শরতের ফুল’ নাটকটিও অনেকটা দায়বদ্ধতা আর আগ্রহের মধ্যদিয়ে লেখা। আমি এই নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলম। বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীতে এটি গোষ্ঠিভিত্তিক নাটক হিসাবে প্রচারিত হয় ১১-১২ সালে। এর আগে ও পরে আমার আরো কয়েকটি নাটক বেতারে প্রচারিত হয়েছে।
ফিলুঃ- একজন সফল নাট্যকার হিসাবে নতুনদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
হাসান আবাবিলঃ- নতুনদের জন্য আমার পরামর্শ। বেশি নাটক দেখতে, পড়তে ও বুঝতে হবে, মনে রাখতে হবে চর্চাও কোন বিকল্প নেই। নিজের মধ্যে সমাজের প্রতি একটি দায়দ্ধতা সৃষ্টি করতে হবে।
ফিলুঃ- আমরা জানি আপনি একজন সংগঠক। ‘রাজশাহী ছড়া সংসদ’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বর্তমান কর্মকান্ড সম্পর্কে জানাবেন কী?
হাসান আবাবিলঃ- ‘রাজশাহী ছড়া সংসদ’ মূলত ছড়াকারদের একত্রীত করার প্রয়াসে বা উদ্দেশ্যে কিছু তরুণ ছড়াকারদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠন। এর প্রতিষ্ঠা প্রায় অর্ধযুগ আগে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা ‘খড়কুটো’, ‘হলদি ডাঙ্গা’, ‘বাঁশপাতা’ নামে বেশ কয়েকটি নিয়মিত ও অনিয়মিত ছোট পত্রিকা প্রকাশ করে আসছি। পাশাপাশি নিয়মিত সাহিত্য আড্ডা, সাহিত্য বিষয়ক কর্মশালা, শিক্ষা-সফর, দিবস পালন সহ বিভন্ন সমাজ উন্নয়ন মূলক কাজ করে থাকি আমরা। প্রতি বছর গুণীজনদের ‘শহীদ কামালখাঁ স্মৃতি পদক’ প্রদানের পাশাপাশি ‘শহীদ কামালখাঁ স্মৃতি পাঠাগার’ নামে একটি পাঠাগার ও প্রতিষ্ঠা করেছি আমরা।
ফিলুঃ- মানুষের বিশ্বাস, জীবন চেতনা ও সমাজ সংস্কারে একজন সাহিত্যিকের ভূমিকা কী?
হাসান আবাবিলঃ- একজন লেখক অবশ্যই বিশ্বাস ও জীবন চেতনা উপর পভাব ফেলে। সেটা লেপটে থাকে জীবনের সঙ্গে। জীবনকে পাল্টিয়ে তা নেতি বাচক থেকে ইতিবাচক দিয়ে নিয়ে যায়। মানুষের ভিতর আরেকটা মানুষ তৈরি করে। তৈরি করে আর একটি স্বত্ত্বা। তার মাধ্যমেই সমাজ সংস্কার সম্ভব।
ফিলুঃ- লেখা-লেখির বাস্তব অভিজ্ঞতাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
হাসান আবাবিলঃ- বাস্তবতা থেকে কল্পনার আর কল্পনা থেকে বাস্তবতা এই বিষয় দু’টি বিপরিত মূখী হলেও সম্পর্ক যুক্ত, তাই লেখা- লেখিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক দরকার। তবে কল্পনা শক্তিও প্রখর হওয়া চায়।
ফিলুঃ- আপনি সাহিত্য চর্চা করেন কেন?
হাসান আবাবিলঃ- আগেই বলেছি সাহিত্য করতে এসেছি শখের বশে। এখন করি দায়বদ্ধতা থেকে। মানুষকে কিছু দিতে, সমাজকে কিছু দিতে। নিজের আতিœক প্রশান্তি আর ভলরাগা তো আছেই। সবচে ভাল লাগে যখন কাছের মানুষ ও স্বজনদের এর মাধ্যমে আনন্দ ও নির্মল উৎসাহ দিতে পারি।
ফিলুঃ- লেখা প্রকাশ নিয়ে কিছু বিরুপ অভিজ্ঞতা আছে কি?
হাসান আবাবিলঃ- প্রথমদিকে এরকম অভিজ্ঞতা হয়নি তা কিন্তু নয়।
ফিলুঃ- ঢাকার সাহিত্যিকদের তুলনায় মফশলের সাহিত্যিকরা পিছিয়ে আছে, আপনার মতামত কি?
হাসান আবাবিলঃ- আমি তা মনে করি না। এখন ঢাকার বাইরেও দেশের আনাচে-কানাচে বহু কাজ হচ্ছে। যা আসলেই ঢাকার সাহিত্যিকদের কাছে কোন অংশেই কম নয়। তবে রাজধানিতে অবস্থানগত একটা সুবিধা রয়েছে, গনমাধ্যমের সাথে সহজেই সংযোগ তৌরি করা যায়। তবে প্রকৃত সমাজ কর্মী, সাহিত্যিক হতে অবস্থান নয় বরং ইচ্ছা শক্তি আর নিয়মিত চর্চার বিকল্প নেই।
ফিলুঃ- শিশুদের জন্য লেখার সময় কোন বিষয় মাথায় রাখেন?
হাসান আবাবিলঃ- শিশুদের জন্য লেখার সময় নিজেকেও শিশু হতে হয়। শিশুরা যেভাবে আকাশ দেখে, যেভাবে পুতুল খেলে আমিও ঠিক তাই করি। শৈশবে ফিরে যাবার মজাটাই আলাদা...
ফিলুঃ- সাহিত্যিক হাসান আবাবিল আর ব্যক্তি হাসান আবাবিল এর মধ্যে আপনার কাছে কে বেশি প্রিয়?
হাসান আবাবিলঃ- অবশ্যই সাহিত্যিক হাসান আবাবিল।
ফিলুঃ- প্রকাশক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার ইচ্ছে আছে কি?
হাসান আবাবিলঃ- উপন্যাসে হুমায়ুন আহমেদ সারের জুড়ি নেই.. অমন মানুষ হতে পারলে এক জীবনে একশো। হেলাল হাফিজ, সুনীল, তারাপদ, নির্মলেন্দু সহ অনেকের কবিতা পড়ি। কবিতা মন পবিত্র করে।
ফিলুঃ- শেষ প্রশ্ন- সবসময় সঙ্গে রাখেন কি কি?
হাসান আবাবিলঃ- একটি সবুজ মন, দুটি চোখ, আর ব্যাগে থাকে খাতা-কলম। মানুষকে খুজে পেতে মুঠ যন্ত্রীক ফোনটাকেও এখন সাথে রাখতে হয়।
ধন্যবাদ আপনাকে ও ‘দশদিক’ এর সকল পাঠককে।


পাতাটি ৩৬৯৭ বার প্রদর্শিত হয়েছে।