দশদিক মাসিক

হোম কিশোর দশদিকতৃতীয় শ্রেণীতে উঠেছে পরী

তৃতীয় শ্রেণীতে উঠেছে পরী

তাসমিয়া ফয়েজ

দ্বিতীয় শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। ফলও প্রকাশ হয়ে গেছে। প্রথম স্থান অধিকার করে ৩য় শ্রেণীতে উত্তীর্ণও হয়েছে পরী। মেয়ের ভাল ফলাফলে বাবা খুশি হয়ে স্কুল খোলার আগে-ভাগেই নতুন স্কুল ড্রেস আর সাদা ফিতে কিনে এনেছেন। এখন শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। প্রায় ২০ দিন পার হয়ে যাচ্ছে। দিন যেন আর শেষ হতে চায় না পরশের। কবে আসবে নতুন বছর! আকাশি রঙের ফ্রক পরে সাদা ফিতে দিয়ে দুই বেণী করে নতুন বছরে নতুন বই হাতে স্কুলের পথে হেঁটে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকে পরী। সাথে থাকবে সব বন্ধুরা। সবাই মিলে স্কুলে যাওয়ার সময় কত মজা হবে প্রথম দিন, কল্পনা করতে থাকে। কিন্তু ক্ষণটি আসতে এখনও বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।
ভাবতে ভাবতে রাতে মায়ের গলা ধরে ঘুমিয়ে পড়ল পরী। ভাবনাগুলো ঘুমের মাঝে রঙীন স্বপ্ন হয়ে ধরা দিলো। স্বপ্নের জগতে নেই কোনো অপেক্ষা। শুধুই রয়েছে উল্লাস আর আনন্দ। উল্লাস করতে করতে হঠাৎ চোখের ওপর আলোর ঝলকানি। চারদিকে আভা ছড়িয়ে পশ্চিমের সূর্য জানান দিয়েছে যে আরো একটি দিন শুরু হয়েছে। কখন যে পার হয়েছে বিশাল একটি রাত টেরই পায়নি, চোখ মুছতে মুছতে ঘুম থেকে উঠে ভাবতে থাকে পরী । কিছুক্ষণ পর বোধদয় হয় যে রাতে ঘুমানোর আগে যে কল্পনা করছিল তা-ই রঙিন তুলির আচঁড়ে স্বপ্নিল জগতে রূপ পেয়েছিল। খানিকটা মন খারাপ হলেও মুহূর্তেই ভাল হয়ে গেল আবার। কারণ, পরী ওদের ঘরের দেয়ালের ক্যালেন্ডারে চোখ বুলিয়ে দেখে সেই ক্ষণটি আসতে আর মাত্র দু’দিন বাকি। অথচ গতকালও মনে হচ্ছিল, অনেক দূরের পথ।
পরশের তো আর খুশি ধরে না। কীভাবে যে পার হবে এ দু’টি রাত! অবশেষে সেই চির প্রতীক্ষার দিনটি এলো। সাথে সাথে এলো নতুন একটি বছর। বছরের প্রথম দিনে নতুন ক্লাসে যাওয়ার অনুভূতিই যেন অন্যরকম। কাক ডাকা ভোরে ঘুম ভাঙলো পরশের। সবার আগে সে ঘুম থেকে জেগেছে। স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে মা’কে ডেকে তুলল পরী।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি শেষ। এবার সব বন্ধুরা একত্রিত হওয়া বাকি। প্রথমে শেফালী, কাবেরী আর জুঁই এলো পরশের বাড়িতে। এরপর ওরা সবাই মিলে আশে-পাশের বাড়ির বন্ধুদের সাথে নিয়ে নতুন বই হাতে যাত্রা করলো প্রতীক্ষিত সেই পথটির দিকে। যে পথে রয়েছে শুধুই আলোর উৎস আর সম্ভাবনার দ্বার।
পথে সবাই মিলে গান গাইতে গাইতে আর হাসতে হাসতে স্কুলের গেইটে প্রবেশ করলো। নতুন ক্লাসে ঢুকতেই বাঁধ ভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়লো ওরা সবাই, সাথে ক্লাসে থাকা অন্য সহপাঠীরাও। এরই মধ্যে অ্যাসেম্বলির জন্য ঘন্টা বাজল। সবাই দৌড়ে গেলো স্কুলের মাঠে। ৩য় শ্রেণীর সব ছাত্র-ছাত্রীরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালো একসাথে। সামনে দাঁড়িয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ সকল শিক্ষক মহোদয় প্রথমে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন। পতাকা উত্তোলনের পর জাতীয় সঙ্গীত গাইলো সবাই। এরপর অ্যাসেম্বলি শেষে প্রধান শিক্ষক মাঠে উপস্থিত সকল ছাত্র-ছাত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন যেন সবাই ভালো করে পড়াশোনা করে। আর নতুন বছরের প্রথম দিনের মতো সারা বছরকেই যেন নতুনত্ব দিয়ে ভরিয়ে তোলে সবাই। শীতের সকালে লম্বা ছুটির পর এমন আমেজ পরীকে দারুণভাবে নাড়া দিচ্ছিল। সাথে প্রধান শিক্ষকের এই বাণী পরীকে তার ভাল ফলাফল ধরে রাখার জন্য আরো উৎসাহিত করল।
নতুন বছরে পরশের সবথেকে বড় পাওয়া ক্লাসে তার প্রথম স্থান অধিকার করা। এই খুশিকে ধরে রাখতে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে তা নিয়ে প্রথমদিন থেকেই ভাবছে পরী। ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই পরী ঠিক করে রাখলো যে ক্লাসে শিক্ষকগণ যা কাজ দেবেন তা গুরুত্ব দিয়ে শেষ করবে।
এরই মধ্যে পরী লক্ষ্য করল যে এবার তাদের ক্লাসে বেশকিছু নতুন মুখ এসেছে। তাদের সবার সাথে পরিচিত হয়ে নিল। নতুন বন্ধুদের সাথে পরিচিত হতে পেরে আনন্দিত হয়ে পরী ভাবল যে বাড়ি ফিরে মা-বাবাকে বছরের প্রথমদিনে ক্লাস করার সব অভিজ্ঞতার কথা বলবে।
হঠাৎ প্রথম ক্লাস শুরু হওয়ার ঘন্টা বাজল। সবাই চুপ করে বেশ আগ্রহ আর উত্তেজনার সাথে যার যার আসনে বসে পড়ল। শুরু হলো আরো একটি বছর আরো কিছু নতুন ভাবনা আর পরিকল্পনাকে সাথে নিয়ে।
স্কুল শেষে বাসায় ফিরে পরী তার মায়ের কোলে বসে নতুন অভিজ্ঞতার কথাগুলো বলল। নতুন বন্ধুদের পেয়ে বেশ খুশি হয়ে পরী তার মা’কে বলল যে ওদের সবাইকে সে একদিন বাসায় নিয়ে আসবে খেলা করতে। এ শুনে পরশের মা সবাইকে নিয়ে আসতে বলল। প্রধান শিক্ষক অ্যাসেম্বলিতে সবাইকে যে উপদেশটি দিয়েছেন তা মা আর বাবাকে বলল পরী। মা-বাবা পরীকে প্রধান শিক্ষক ও ক্লাসের সব শিক্ষকগণের উপদেশ ঠিক মতো মেনে চলতে বলল।
মা-বাবাকে সব মজার অনুভূতিগুলো প্রকাশ করে পরী উদগ্রীব হয়ে উঠল নতুন বইগুলো পড়তে। তাই দ্রুত হাত-মুখ ধুয়ে মায়ের হাতে নাস্তা করে পড়তে বসে গেল। বইয়ের প্রথম পাতা খুলতেই নতুন বইয়ের সুগন্ধ পরীকে আরো উৎসাহিত করলো। একে একে ক্লাসে শিক্ষকের দেয়া সব বাড়ির কাজগুলো শেষ করতে লাগলো।
পরী পড়তে বসে ওর শিক্ষকদের কথা ভাবতে লাগল। কত সুন্দর করেই না ওনারা সবাইকে কঠিন পড়া সহজে আদর করে বুঝিয়ে দেন। এতো আন্তরিকতা আর ভালবাসা শুধু ঘরে মা-বাবার কাছেই পাওয়া যায় না। শিক্ষকগনও অনেক আদর করেন, স্নেহ করেন। মা-বাবা যেমনটা ভালো হয়ে চলার উপদেশ দেন তেমনি শিক্ষকগণও ন্যায়ের পথে থেকে সবসময় সত্য বলতে শেখান তাঁদের সব ছাত্র-ছাত্রীকে। ভালো ফলাফলের জন্য সবসময় নিয়ম মেনে পড়া-শোনা করতে বলেন মা-বাবার মতো।
এসব বিষয় ভাবতে ভাবতে পরী ওর মা’কে ডাকল। আর এসব অনুভূতিগুলো প্রকাশ করল। তখন মা পরীকে বলল যে শিক্ষক হচ্ছেন শ্রদ্ধেয় ও গুরুজন। সবসময় উনাদেরকে সম্মান করতে হয় আর তাঁদের কথা মেনে চলতে হয়। তাহলে মানুষের মতো মানুষ হওয়া যায়। তখন পরী ওর মায়ের কথা মতো চলার আর শিক্ষকদের মান্য করবে বলে কথা দিল।
পরশের মা ও বাবা দু’জনেই তাদের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে গর্বিত। কোনো কিছু বলার আগেই পরশের পড়া-শোনার প্রতি এই আগ্রহ আর উৎসাহ সত্যি প্রশংসনীয়। পরী বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়। এমনটা শুনে মা-বাবা বেশ খুশিও হয়েছেন এই ভেবে যে তাদের সন্তান ভবিষ্যতে মানুষ বানানোর কারিগর হতে চায়।
অচিনপুরের কোনো এক মফস্বলের প্রাথমিক স্কুলের একজন পরশের গল্প বললাম এতক্ষণ। পরশের মতো যদি প্রত্যেকটি ছাত্র-ছাত্রীই স্কুলে যেতে এতো আগ্রহী হয় আর প্র্রথম ক্লাস থেকেই ভালো ফলাফলের জন্য ভাবতে শুরু করে তাহলে এরাই হবে সত্যিকার অর্থে যোগ্য ভবিষ্যৎ কর্ণধার।


পাতাটি ৩৫৩৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।