দশদিক মাসিক

হোম প্রবাস সংবাদ জাপানে বৈশাখী মেলা

জাপানে বৈশাখী মেলা

জাপানে বাংলা নববর্ষ বরণ উপলক্ষে পহেলা বৈশাখ উদযাপন স্বাধীনতার পর থেকেই ঘরোয়াভাবে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ সোসাইটি জাপানের উদ্যোগে। টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা, কর্মচারীরাও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে য়োয়োগি কোওয়েন উদ্যানে সমবেত হতেন শীত শীত ছুটির দিন রবিবারে। অনেকটা বনভোজনের আদলে ঘরে তৈরি খাবারদাবার নিয়ে এসে উদ্যানে বসে ‘এসো হে বৈশাখ/এসো এসো/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে...’ গান গেয়ে বর্ষবরণের স্মৃতি আমার মনে এখনো উজ্জ্বল—এটা আশি দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। জাপানে এপ্রিল মাস পর্যন্ত শীত থাকে, তার মধ্যেও প্রাণের টানে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈশাখ উদযাপন করতে ভোলেন না।

২০০০ সাল থেকে ‘টোকিও বৈশাখী মেলা এবং কারি ফেস্টিভ্যালে’র সূচনা। এটা প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে টোকিওর অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ইকেবুকুরো শহরের নিশিগুচি কোওয়েন বা নিশিগুচি প্রাঙ্গণে। এখন অবশ্য প্রাঙ্গণটি ‘শহীদ মিনার পার্ক’ নামে পরিচিতি লাভ করছে। কেননা প্রাঙ্গণে ২০০৫ সালে স্থাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের প্রতীক শহীদ মিনার। শহীদ মিনারের পাশেই বৈশাখী মেলা আজ একসূত্রে বাঁধা পড়ে গেছে। ওসাকা, ফুকুওকা প্রভৃতি শহরেও বৈশাখী মেলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এ বছর ১৬তম টোকিও বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ ১৯ এপ্রিল রবিবার। বস্তুত মেলার প্রস্তুতি তিন মাস পূর্ব থেকেই শুরু হয়ে যায়। মেলার আয়োজক কমিটির মূল সমন্বয়ক হচ্ছেন প্রবাসীদের প্রিয়মুখ ডা. শেখ আলীমুজ্জামান। কার্যকরী সদস্যরা হচ্ছেন সুখেন ব্রহ্ম, ছালেহ মোহামাম্মদ আরিফ, আসলাম হীরা, জাকির হোসেন জোয়ারদার, কাজী ইনসান, জুয়েল এম কিউ, মো. জসিম উদ্দিন, মাসুদুর রহমান, বিমান পোদ্দার, আসগর আহমেদ, বহ্নি আহমেদ প্রমুখ। শিশুদের অনুষ্ঠানের প্রধান পরিচালক কণ্ঠশিল্পী ববিতা পোদ্দার। স্থানীয় দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠন—উত্তরণ কালচারাল গ্রুপ এবং স্বরলিপি কালচারাল একাডেমি মেলার অনুষ্ঠানে প্রভূত সহযোগিতা করে থাকে। প্রতিবছরই বাংলাদেশ থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং একাধিক কণ্ঠশিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারা এসে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরকে মাতিয়ে দিয়ে যান একদিনের অনুষ্ঠানে। বাঙালি শিল্পীদের পাশাপাশি জাপানি সংস্কৃতিকর্মী এবং শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করে থাকেন। মঞ্চে উঠে আসেন অন্যান্য দেশের দর্শকও, যারা বাঙালি সংস্কৃতির কথা জানেন। কাজেই টোকিও বৈশাখী মেলাকে আন্তর্জাতিক ভাববিনিময়ের মেলাও বলা যায়।

সকাল দশটায় মেলার উদ্বোধন হয় ‘এসো হে বৈশাখ’ সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার মাধ্যমে কিন্তু মেলার নিজস্ব উদ্বোধনী সঙ্গীতও গাওয়া হয় ‘এক বৃন্তে শাপলা আমি তুমি সাকুরা’। দশটার আগেই দূরদূরান্ত থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় এসে হাজির হতে থাকেন। বেশ শীত থাকা সত্ত্বেও পুরুষরা পাঞ্জাবি এবং মেয়েরা বাহারি শাড়ি পরে মেলায় আসেন। সাম্প্রতিককালে শিশুরা বৈশাখের বিশেষ ডিজাইনের জামা পরে আসছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূতসহ বিশিষ্ট প্রবাসী এবং জাপানিরা উপস্থিত থাকেন। তারা বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্য এবং দুদেশের মৈত্রী সম্পর্ক নিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। এরপর শুরু হয় সারাদিনব্যাপী নাচ-গান-আবৃত্তি, শুভেচ্ছা বক্তব্য, শিশুদের অঙ্কন প্রতিযোগিতা, লটারি ইত্যাদি। মঞ্চে শিশুদের নাচ-গানের অনুষ্ঠান অত্যন্ত আনন্দদায়ক। স্থানীয় শিল্পীদের গানের পর বাংলাদেশ থেকে শিল্পীরা বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমনভাবে মাতিয়ে তোলেন মঞ্চ যে মেলাটি ছোটখাটো একটি বাংলাদেশে পরিণত হয়ে যায়!

মেলায় প্রায় ৪০টির কাছাকাছি স্টল থাকে, যার অধিকাংশই হচ্ছে ভারতীয় ও বাংলাদেশি খাবারের। এছাড়া গ্রন্থ, ভ্রমণ, টেলিযোগাযোগ, কম্পিউটার, পোশাক ইত্যাদিও বিদ্যমান। বাংলাদেশ-জাপান সোসাইটির উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিত্সাসেবারও ব্যবস্থা থাকে।

বর্ণাঢ্য বাঙালি সংস্কৃতি ক্রমশই জাপানিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সেইসঙ্গে সুস্বাদু কারির সুগন্ধে বিমোহিত জাপানিদের আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশের প্রতি। তারা উত্সুক হয়ে থাকেন কখন এপ্রিল মাস আসবে আর বৈচিত্র্যময় বৈশাখী মেলায় একদিনের জন্য বাঙালির সঙ্গে নাচেগানে মেতে উঠবেন!


টোকিও বৈশাখী মেলা এখন প্রবাসীদের কাছে এককথায় প্রাণের মেলা। ব্যস্ততম নিরানন্দ জীবনে এই উত্সব এখন একটি বার্ষিক মিলনমেলাও বটে! বৈশাখী মেলা নেই এমনটি আমাদের কাছে এখন ভাবনারও অতীত! -সূত্র:প্রবীর বিকাশ সরকার, দৈনিক ইত্তেফাক।


পাতাটি ২৭৯২ বার প্রদর্শিত হয়েছে।