দশদিক মাসিক

হোম বিশেষ রচনা জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

এমাজউদ্দিন আহমেদ::
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশন বা জেসিসির তৃতীয় বৈঠকে যোগ দিতে। গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের প্রতিনিধিদলের নেৃতত্ব দেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। তিনি গত জুনে ঢাকা সফর করে গেছেন। অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে এই সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সভার দুই পক্ষই বারবার উচ্চারণ করে যে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন হয়ে চলেছে। কিন্তু যে দুটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত আশা করা গিয়েছিল- তিস্তা নদীর পানি বণ্টন এবং সীমান্ত সম্পর্কিত বিষয়- সে ক্ষেত্রে আবারও মিলেছে প্রতিশ্রুতি। অনেক ভালো ভালো কথা এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনায় অগ্রসর হলেও যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফলে তৈরি হয়, সেই দূরত্ব মস্ত বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো বাধা সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নেতৃত্বের সামনে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময়ও তা অনুভূত হয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশনের বিবৃতিতে রয়েছে ৩৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে ৭ নম্বরে রয়েছে সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়টি এবং তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি রয়েছে ২৪ নম্বরে। এ সম্পর্কে শুধু একটি বাক্য উচ্চারিত হয়েছে। দুই মন্ত্রী তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টনের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে তাঁদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দুই দেশের মূল সীমান্ত সম্পর্কেও একটি বাক্যে দুই মন্ত্রী তাঁদের বক্তব্য শেষ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির বিষয়ে প্রটোকল স্বাক্ষরের পর এর র্যাটিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কাজ চলছে। অন্য কথায়, ড. মনমোহন সিংয়ের সময়ে এ দুটি বিষয় যে অবস্থায় ছিল, এখনো সে অবস্থায় রয়েছে। যৌথ বিবৃতির ১৩ নম্বরে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টি। এতে অবশ্য ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যের কথা বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগের কথা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য আগ বাড়িয়ে বলেছেন, বিনিয়োগের সুবিধার জন্য, বিশেষ করে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠার জন্য, জমিও দেবে ভারতকে বাংলাদেশ। এ সম্পর্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো হোমওয়ার্ক আছে কি না তা জানি না। অন্য কথায়, আমাদের প্রতিনিধিদের অন্যকে দেওয়ার প্রবণতাটা উল্লেখযোগ্য। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাপানের পক্ষে। এতে জাপানের খুশি হওয়ারই কথা, কেননা জাপানের জয়লাভের পথ প্রশস্ত হলো। কিন্তু জাপান থেকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ কি বাংলাদেশ পাবে? যৌথ বিবৃতির ৯ নম্বরে রয়েছে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্তে প্রাণহানি কমিয়ে আনতে ভারতের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। তাঁরা দুই 'বন্ধু' রাষ্ট্রের সীমান্তজুড়ে তারকাঁটার বেড়া প্রদানের কাজটিও সমাপ্ত করার কথা বলেছেন; কিন্তু সীমান্তে বাংলাদেশের জনগণকে আর হত্যা করা যেন না হয়, তা বলেননি। কর্তৃত্বব্যঞ্জক বক্তব্যের জন্য জাতীয় ঐক্যের আশীর্বাদপুষ্ট হতে হয়।



জাপান একটি গণতান্ত্রিক দেশ। নিয়মিত সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে। প্রতিবেশী ভারতেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নিয়মিত, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ৫ জানুয়ারিতে বাংলাদেশে যা হয়েছে তা জাপানও জানে। জানে ভারতও। ভারতের তখনকার কংগ্রেস সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ওই নির্বাচনে ক্যানভাস করতেও এসেছিলেন, যেন ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থেকেই যান। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : 'একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত ৩০০ সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে লইয়া সংসদ গঠিত হইবে।' তবে সংবিধানে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিধান থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাবে একক প্রার্থীর নির্বাচনও স্বীকৃত টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে। কিন্তু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা যদি এমন হয় যে প্রত্যক্ষ নির্বাচন ছাড়াই তারা সরকার গঠন করতে পারবে, তাহলে সংবিধানে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার যে বিধান রয়েছে তাকে অকার্যকর করে দেয় এবং ফলে তা অসাংবিধানিক হয়ে পড়ে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছেন ১৫৩ জন। টেকনিক্যালি হয়তো তাঁরা সদস্য হওয়ার যোগ্য। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে, বিশেষ করে নৈতিক দিক থেকে ভেবে দেখুন তো জাতীয় সংসদে তাঁদের বসা উচিত কি না? অন্য ১৪৭ জনের ক্ষেত্রেও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। অন্য কথায়, এই সংসদ কি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে? পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে সৃষ্ট জটিলতার কারণে বাংলাদেশে যে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধান তো আমাদের জাতীয় নেতৃত্বকেই করতে হবে। আমার বিশ্বাস, তাঁদের সেই প্রজ্ঞা রয়েছে। নেই শুধু আগ্রহ। নেই কোনো সদিচ্ছা। এর সুষ্ঠু সমাধান ছাড়া আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিদেশে ভালো ভালো কথা বলছেন। কিন্তু নিজের দেশের সমস্যা অনুধাবন করে একটা ভালো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না কেন?

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কার্যত সীমাহীন। তিনি দলের নেতা। তিনি মন্ত্রিসভার প্রধান। তিনি জাতীয় সংসদের নেতা। কয়েক দিন আগে শুনলাম, বিরোধী দলের এক নেতার বাণী : তিনি বিরোধী দলেরও নেতা। ষোড়শ সংশোধনীর পরে তিনি বিচারালয়ের, বিশেষ করে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের দায়িত্ব পেলেন। দায়িত্ব পেলেন দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন, কর্ম কমিশন, নির্বাচন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অপসারণেরও। সংবিধানের ৫৫ ও ৭০ অনুচ্ছেদ বলে তিনি এমন সব কিছু করতে পারেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও কল্পনা করতে পারেন না। মোগল সম্রাট, এমনকি রাশিয়ার জারদের (Czar) থেকেও পরম পরাক্রমশালী আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তার পরও বাংলাদেশে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন অনুষ্ঠানে এত অক্ষম!

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


পাতাটি ২৯২৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।