দশদিক মাসিক

হোম ইতিহাসমসনবীর কবি রুমী

মসনবীর কবি রুমী

মসনবীর কবি রুমী

রাজু রফিক

সাহিত্য মানুষের জীবনের নানা কথার বিচিত্র কথক। আর এক কথায় জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। তাইতো পার্থিব জীবনের শত কোলাহলের মাঝেও মানুষের মন জীবনের স্বাদ পেতে বড্ড বেশী তৃষ্ণার্ত। আর সে তৃষ্ণা নিবারনের জন্য যাদের ধ্যান ও জ্ঞান, চিন্তা ও চেতনা নিরন্তর, সেই কবি-সাহিত্যিকদের অবদান যুগে যুগে দেশে দেশে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং সম্মানিত। বিশ্ব সাহিত্যে ঠিক তেমনি উজ্জ্বেল নক্ষত্র এক আলোকিত নাম হচ্ছে ইরানের মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি। ফরাসী সাহিত্যের এ বিষ্ময়কর প্রতিভা গোটা বিশ্বে এক মহান আধ্যাত্যিক কবি হিসেবে সুপরিচিত। রুমীর আসল নাম ছিল জালাল উদ্দিন বলখী, যিনি পরবর্তীতে জালালউদ্দীন রুমী এবং পাশ্চাত্যে জগতে রুমী হিসেবেই খ্যাত।
ইংরেজী ১২০৭ সালের ৩০ শে সেপ্টেম্বরে বর্তমান তাজিকিস্তানের খোরাসান অঞ্চলের বলখ প্রদেশে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবার নাম ছিল বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ, যিনি একাধারে ধর্মতাত্বিক বিচারক ও সূফী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন এবং মার নাম মুমীনা খাতুন যাদের পরিবার কয়েক পুরুষ ধরে ইসলাম প্রচার কাজের জন্যে ছিল সামরিক পরিচিত।
পৃথিবীর অন্যতম বাস্তবতা যুদ্ধ ও অশান্তি। আর এ অশান্ত পৃথিবীতে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেবার লক্ষ্যে ইসলামের শান্তি ও মানবতাবাদী দর্শনকে তিনি গভীরভাবে আত্নস্ত করেছিলেন এবং মানুষে মানুষে প্রেম ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই সত্যের বাণীকে বিশ্বময় ছাড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। আর তার সেই প্রচেষ্টার অন্যতম ফসল হচ্ছে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মসনভী। মসনভী সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে এটা হচ্ছে আল কোরআনের সারমর্ম। মূলত আল কোরআনের সারবক্তব্যকে কবি তাঁর গল্প ও নীতিবাক্যের মাধ্যমে সাবলীলভাবে প্রকাশ করেছেন। এ কথার প্রচালিত আছে যে, ভারতীয় উপমহাদেশে নীতিশাস্ত্র রচিত হয়েছিল “দীওয়ানে হাফিজ” এবং রুমীর মসনভী শরীদে ছায়া অবলম্বনে। সাম্প্রতিক কালে পশ্চাত্যে বিশ্ব মাওলানা। রুমীকে গভীরভাবে আত্নস্হ করেছে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর লেখার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটি। আর এ প্রেক্ষাপটে UNESCO গত ২০০৭ সালকে মাওলানা রুমী বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এ থেকে বোঝা স্পষ্ট যে যুগের জীর্নতাকে পেছন ফেলে রুমীর কবিতা আজ বড্ড প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।
রুমীর কবি মানস বুঝতে গেলে তার রচিত ছয় খন্ডে সমাপ্ত মসনভী শরীফ আমাদের বেশ সাহায্য করতে পারে। আসলে স্রষ্টা প্রেমের উপর এত বড় মহাকাব্য পৃথিবীর অন্য কোন ভাষায় ও সাহিত্যে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। কাব্যকলার যত রূপ ও আঙ্গিক আছে তার সমাহার রুমীর কবিতায় বর্তমান। Epic/Lyric/ode/elegy অর্থ্যা কাব্যের যত রূপ এবং বিভাগ আছে তার সবই পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। রুমীর ভাষা, ছন্দ, শব্দ-চয়ন, উপসা রূপকল্প, প্রতীক তথা অলংকার শাস্ত্র প্রয়োগ ও ছন্দ প্রকরনে যে নৈপুন্য দেখা যায় তা আর কোথাও দেখা যায় না। তাই সারা বিশ্ব রুমীর কাব্য শ্রেষ্ঠত্বে এবং সাহিত্য এত মুগ্ধ ও অভিভূত।
মানবাত্বার ইতিকথা বর্ণনার মধ্য দিয়ে রুমী আমাদের অনন্ত জীবনের সন্ধান দিয়েছেন। তার কাব্যের ছত্রে ছত্রে আমাদের আত্না জেগে ওঠে, অন্তরের অন্বেষায় আমাদের স্বত্ত্বা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। রুমীর কাব্যপ্রেরনা মূলত তাওহীদ ও রেসালাত ভিত্তিক। তিনি ইমানদার ও নেক আমলের কবি যিনি তাঁর অসাধারণ কাব্যপ্রতিভায় হেদায়েতের পথকে প্রশস্ত করেছেন।
কাব্যকলায় রুমী যে Art অবলম্বন করেছেন তা গভীরভাবে প্রানধানযোগ্য। সষ্ট্রার প্রতি আমাদের প্রেমকে প্রকাশ করার জন্যে তিনি যে পন্থা অবলম্বন করেছেন, তা হলো প্রেমস্পদের গোপন কথা লুকানো থাকা ভালো বিভিন্ন গল্পের মাধম্যে তা বলা যাবে। এবং গোপন কথা অন্যের কথা বর্তায় বলা যাবে। তুচ্ছ ঘাসের উপর পাহাড় রাখা যাবে না। সূর্যকে কাছে আনলে অস্তিত্ত্ব বিপন্ন হবে ইত্যাদি। তাই কবিতায় বিশেষত মসনভীতে অসংখ্য বাস্তব, কাল্পনিক কাহিনী, উপকথা নীতিগল্প রূপক কাহিনী, তার সাথে সংযোজিত করেছেন গভীর চিন্তা চেতনার স্রোত, যাতে স্রষ্টার প্রেমের ঝংকার মানুষ অনুভব করতে পারে Nicholson তাই রুমীকে The greatest mystical Post হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে রুমীর সেই প্রসিদ্ধ উক্তির কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে তিনি বলেছেন “আমি প্রস্তররূপে ছিলাম, সেখান থেকে উদ্ভিদ রূপে জন্ম নিলাম, উদ্ভিদরূপ থেকে প্রানীরূপে জন্ম নিলাম, মানুষ হিসেবে মৃত্যুর পর ফেরেশতা হব। তারপর আরো উর্ধ্বজগতের অস্তিত্ত্ব লাভ করবো, তারপর আমি অনন্তে বিলীন হয়ে যাবো। আমাদের Universal Existence বা বিশ্বজনীন অস্তিত্বের কথা বলতে গিয়ে রুমী বলেছেন “আমি সূর্য কিরণের কণা, আমি সূর্যের গোলক, আমি প্রভাতের আলো, আমি সন্ধ্যার বায়ু।” বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় রুমীর কবিতা, বিশেষত মসনভী অনুদিত হয়েছে নানাবিধ গবেষণা গ্রন্থ। যেমনটা কোলম্যান বার্কস লিখেছেন “The Soul of Rumi” ১২৭৩ সালের ১৭ই ডিসেম্বর কেনিয়াতে বিশ্ব কাব্যজগতের এ অসাধারন প্রতিভা ইন্তেকাল করেন এবং তাকে তার বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।
রুমী হয়তো শারিরীক ভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু একথা নিশ্চিত তাঁর কবিতা আজও বেশ জীবন্ত এবং ভাবময়। হৃদয়ের গভীর বোধ লোকে তাই বলতে দ্বিধা নেই রুমীর কাব্যপাঠের মাধ্যমে মানুষের মাঝে খোদা প্রেম, জীব প্রেম, মানব প্রেম যতই জাগ্রত হবে, হিংসায় উনুত্ত এই পৃথিবীর জন্য ততই হবে কল্যানকর ও মঙ্গলময়।


পাতাটি ৩৭৮৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।