দশদিক মাসিক

হোম বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস: হৃদয়ের গহীনে ব্যাকুলতা

-এস জে রতন

মত্ত তব আপাদমস্তক সৃষ্টে অবিশ্বাসের বীজ;
বিশ্বাসে তবে কি মেলাবে তত্ত্ব, সফল হবে কি পড়া এই তাবিজ?
নব্য যারা বুঝবে কি লক্ষ্য, নেয় যদি বাহ্যিক শক্ত পক্ষ?
রবে কালহীন কালান্তরের সভ্যতা, সতত যা পর-মর্তে পবিত্র বক্ষ!
এফএম রেডিও’র ধারণা তখনো কেউ মাথায়ই আনতে পারেনি। ঝন্টু নামের এক স্কুল বন্ধু কথা বলাতে বেশ পারদর্শী ছিল। কত কথা যে কোন মুহূর্তেই সাজিয়ে গুছিয়ে, কোন সময় ক্ষেপণ না করে ঝটপট মজা করতে করতে চালিয়ে যেতে পারতো ঘন্টার পর ঘন্টা। প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন রেডিও বাংলাদেশ ঢাকা ছাড়া আর কোন রেডিও’র প্রচার ছিল না। ঘোষক ঘোষিকাগণ কত স্পষ্ট করে শুদ্ধ উচ্চারণে ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান ঘোষণা করতেন। এই ঝন্টুর কথা এখন মনে পড়ছে। এখন এফএম রেডিও’র যে দাপট আর আরজেদের যে অবস্থা, তাতে করে ঝন্টুর কথা খুব মনে পড়া স্বাভাবিক। একদিন তমালসহ তার আন্যান্য বন্ধুরা ঝন্টুর চটপটে কৌতুকভরা কথামালায় এমনভাবে বুঁদ হয়ে গেল, যে কখন ক্লাস শুরু হয়ে প্রায় শেষ হতে চলেছিল কেউই বুঝতেই পারেনি। সাপের মতো পেঁচানো কালো ডোরাওয়ালা বেত হাতে শিক্ষক মহোদয় রাগে গজগজ করে, স্কুলের আঙ্গিনায় গাছের ছায়ার নিচে বসে ঝন্টুকে শোনার আড্ডায় হাজির। সময় বেশি নেননি স্যার। ঝপাৎ ঝপাৎ করে তমালদের পাঁচ-ছয়জনের পিঠে প্রচন্ড বেতের বাড়ি। বাড়ির আঘাতে একেকজন বাইম মাছের মতো বাঁকা হয়ে চিৎকার করে উঠছিল। কোন রকমে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখা গেল শিক্ষক মহোদয় দৌড়াচ্ছেন। কোন দিকে? ঝন্টুর পিছু নিয়েছেন উনি। মানে, ঝন্টু মুহূর্তেই টের পেয়ে বাঘের মুখে তার বাকি শ্রোতা-বন্ধুদের রেখে, বেতের বাড়ি থেকে দূরে থাকতে ভোঁ দৌড় দিয়েছে। কত চটপটে আর প্রত্যুৎপন্নমতি ছিল সে! শেষ পর্যন্ত শিক্ষক সাহেব ঝন্টুকে আর ধরতে পারেনি। শিক্ষক রাগে ক্ষোভে চটে গিয়ে বলছিলেন- কালকে আসবি না ক্লাসে? সেদিন দেখাবো। তমালরা ক্লাসে গিয়ে কান ধরে নীল ডাউন হয়ে থাকলো। মনে মনে ভাবতে থাকলো কত বোকা তারা। ঝন্টু তো তাদেরই বন্ধু, একই বয়েসি, অথচ কতো বুদ্ধি তার! সে-ই আমাদের চটকদার গল্প শুনিয়ে ক্লাস মিস করালো আবার স্যারের বেতের বাড়ি থেকেও নিজেকে নিরাপদে রাখলো।
ঝন্টু পরেরদিন ক্লাসে ঠিকই আসলো। সেদিন তাকে পড়ায় খুব মনোযোগী মনে হলো। সেই শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন। হাতে যথারীতি সাপের মতো পেঁচানো কালো দাগওয়ালা বেত। ভয়ে ঝন্টু ছাড়া অন্যান্যদের গা শিউরে উঠছিল। কি জানি কতো মার মারবে আজ ঝন্টুকে! ঝন্টুর দিকে বন্ধুদের কেউ কেউ তাকিয়ে ভয়ে কেঁদেও ফেললো। কিন্তু ঝন্টু নির্বিকার। যেন কিছুই সে জানে না। স্যার জিজ্ঞেস করলেন- ঝন্টু, কাল কি অপরাধ করেছো তুমি জানো? ঝন্টুর কোন উত্তর নেই। স্বাভাবিক। ঝন্টু, আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছ না? স্যার বেত নিয়ে অগ্নিমূর্তি হয়ে ঝন্টুর কাছে এসে চড়াও হওয়া মাত্র বেঞ্চ থেকে ধপাস করে পড়ে গেল ঝন্টু। কাঁপতে থাকল। মৃগীরুগীর মতো। স্যার প্রায় বেআক্কেল হয়ে গেলেন। কি ব্যাপার না মারতেই এমন হলো? সবার চোখ চড়কগাছ। শিক্ষক- বিষয়টার সাথে উনি যুক্ত নন, এমন একটা ভাব করে বেতটা ক্লাসের এক কোনায় লুকিয়ে রেখে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন। একটু পর ঝন্টু নিজে নিজেই ঠিক হয়ে গেল। এরপর অন্য ক্লাসগুলো ঠিকভাবেই সম্পন্ন করল ঝন্টু। এই বিষয় নিয়ে বেশি খোঁচাখুঁচি করতে গেলে আবার কি থেকে কি হয়, তাই ঐ শিক্ষক আর এ ব্যাপারে সারাদিন কোন উচ্চবাচ্য করেননি। ক্লাস শেষে একসাথে বাড়ি ফেরার পথে ঝন্টু হাসতে হাসতে কথার ফুলঝুরিতে বন্ধুদের সাথে বলছিল- দেখলি তো কেমন করে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে হয়? ঝন্টুর চটকদার কথামালায় ক্লাস মিস করিয়ে দেয়া, কথার মারপ্যাঁচে কারো পেন্সিল নেয়া, খাতার পাতা ছিঁড়ে নেয়া, পরীক্ষার হলে উঁকি দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেখা আবার যে দেখালো তাকেই বেতের মার খাওয়ানো, এই রকম বহু ঘটনার ওস্তাদ এই ঝন্টু। এটা একটা সিম্বলিক প্যাসেজ। সমাজেও এই ধরনের লোক বসবাস করছে। যাদের লক্ষ্যই যেন অন্যের সরল বিশ্বাসকে পূঁজি করে বোকা বানিয়ে ঠকিয়ে নিজে জিতে যাওয়া। কিন্তু এটা কি সত্যিই জিৎ?
ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই?
খোকা খুকু নেচে গেয়ে করে হই চই।
চোখ দু’টো তোর ডাগর ডাগর যেন গেঁয়ো ভূত,
এতো আলো কোথায় পাস, তুই কি স্বর্গের দূত?
লক্ষ্মী ছেলে আয় না কাছে কোলে তুলে লই,
খোকা খুকু নেচে গেয়ে করে হই চই।
এই গানের কথাগুলো প্রায়ই মনে পড়ে, যখন ট্রেনে করে গ্রামের বাড়ি যায় তমাল। মনে পড়ে কিছু স্মৃতিও। একবার ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা দিতে দশ বার জন বন্ধু মিলে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। জার্নি বাই ট্রেন। এখনকার মতো ট্রেনে তখন যাত্রীদের অতো হুড়োহুড়ি ধাক্কাধাক্কি ছিল না। সীটের পর সীট ফাঁকা পড়ে থাকতো। রাতের ট্রেন, সারারাত ভ্রমণের পর সিলেট পৌঁছাতে হবে। একবন্ধু বলে উঠলো- দোস্ত, দিনে গেলে কি হতো? রাত্রে কি ট্রেনে কোন হুর-পরী থাকে? জার্নিতে পাশের সীটে বা চোখাচোখি সীটে দু’একজন চোখ ধাঁধাঁনো রাজকন্যা না থাকলে জমেই না। কেমন একটা প্রেম প্রেম ব্যাপার থাকে। একেক বন্ধুর একেক বাতিক যেন, কেউ হয়তো কালকের ভর্তি পরীক্ষায় কি কি প্রশ্ন আসতে পারে, তা নিয়ে ভাবনা আবার কারো বা তর্ক বা গল্প বা রাজনীতি নিয়ে বাতচিৎ। একটু প্রেম পিয়াসী টাইপের বন্ধুটি অস্থির যেন বেশি। খুব বেশি সময় ধরে সীটে বসে থাকতে পারে না। এই আসছি, পা-দু’টো ধরে আসছে, একটু হেঁটে আসি বলে কোথায় যে যায়? আবার হঠাৎ কোত্থেকে যেন উড়ে এসে বিভিন্ন বিষয়ে গল্প জমায়। দোস্ত, পরের কম্পার্টমেন্টে একটা পরী আছে। চল্ কথা বলার চেষ্টা করি। জার্নিটা মধুর লাগবে। সম্ভবত সে-ও ভর্তি পরীক্ষা দিতেই যাচ্ছে। রাকিব এই বন্ধুর সাথে উঠে চলে গেল পরের কম্পার্টমেন্টে। বাইরে চাঁদের আলো। পূর্ণিমার চাঁদ হবে সম্ভবত। কম্পার্টমেন্টের ভেতরে নন-এনার্জি বাল্বের সয়াবিন তেল রঙের আলো। কপোলের একপাশে চাঁদের রূপালী আলো আরেক পাশে বাল্বের আলোর প্রক্ষেপণ। হাল্কা বাঁকা হয়ে বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ। জানালা খোলা। ঝিরঝির পবন বইছে। প্রেম পিয়াসী বন্ধুটি কবিতার পাশাপাশি মাঝে মাঝে ছবিও আঁকে। তার এই বর্ণনা স্বাভাবিক প্রেমিক মনের। সামনের দু’টি সীটই ফাঁকা। ইচ্ছের সাথে কপালের প্রেম যাকে বলে! দুই বন্ধু বসে পড়ল। ভাবখানা এমন যে ওদের নিজেদের টিকেটের সীটেই বসলো ওরা। মেয়েটি সুন্দরী মায়াবী তবে একটা গম্ভীর ভাবও আছে চোখে মুখে। পাশে তার গার্ডিয়ান মনে হলো। তবে উনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বার বার মেয়েটির কাঁধে ঝুঁকে পড়ছিলেন। মেয়েটি কখনো আলতো পরশে তাঁর মাথাটিকে কাঁধে জায়গা দিচ্ছিল আবার কখনো যতœ করে সোজা করে দিচ্ছিল। মজা করে অস্ফূট স্বরে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কানে কানে বলল- পিরিতের কলসী হলে হায় গো/আদরে কাঙ্খে নিতাম/ভালবাসার জল ভরিয়া/আদরে ধরে রাখিতাম।
মেয়েটির সাথে কয়েকবার চোখাচোখি হলো রাজনের। মায়াবী চোখ। মনে হলো কিছু বলা যায়। -সিলেটে যাচ্ছেন? আমাদের ভর্তি পরীক্ষা, আপনার...? -জি, হ্যাঁ আমারও একটা পরীক্ষা আছে। -কি পরীক্ষা? -চাকরীর। -পড়াশোনা? -আমি এই বছরেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করেছি। আমার হাজব্যান্ড সিলেট মেডিকেলের অধ্যাপক, আমিও সেখানেই জয়েন করার চেষ্টা করছি। পাশের লোকটিকে দেখিয়ে -আমার হাজব্যান্ড গতরাতে জার্নি করে আমাকে সাথে নিয়ে যাবার জন্য ঢাকায় এসেছিল, তাই বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে বেশ ঘুমুচ্ছে সে। রাজন- দোস্ত আমি একটু আসছি। -আরে কোথায় যাচ্ছিস? চল আমিও যাচ্ছি। -আরে আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? বলে জানালা গলিয়ে বাইরে তাকালো মেয়েটি। এই দুই বন্ধু সেই আগের সীটে এসে বসল। অন্যবন্ধুরা জিজ্ঞেস করল- কি রে পরী কি উড়াল দিল। নাকি ছ্যাঁকা দিল? রাজন- আর বলিস না, কে জানে অমন কিউট আর কচি একটা মেয়ে বুড়ো ডাক্তারকে বিয়ে করেছে! আর মুখটাকে অতো অল্পবয়েসি করে না রাখলেই বা কি দোষ হয় মেয়েদের। আমাদের বাড়া ভাতে লাল ব্রিটিশদের দখলদারী আর কি! দুই বন্ধুর ধারণা থেকে প্রাপ্ত বিশ্বাস ভেঙ্গে খানখান হলো প্রেমের অনুভূতির। মেয়েটির অবয়বেও এমন কিছু ছিল যা সাধারণকে বোকা করে দিতে পারে। সমাজে এমন উদাহরণও বেশ। তাই অন্যকে মূল্যায়ন করার পূর্বে আরো ভাবার, বিশ্লেষণ করার ব্যাপারগুলোকে নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের ভাবিত বিশ্বাস যেন যথাযথের কাছিকাছি হয়, না হলে, বিশ্বাস ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে একসময় আত্মবিশ্বাসও ভেঙ্গে যেতে পারে। হঠাৎ মাঝরাতে ট্রেনের টিটির উদয়। একটা টিকেট কম আছে। রাজন বলল- ভাবিস না, টিকেট করতে হবে না। আমি দেখ কি করি? তমাল অনুরোধ করল- আরে আমরা টিটির কাছ থেকে রশিদের মাধ্যমে টিকেট কেটে নেব। তুই কোন ওস্তাদি করার চেষ্টা করবি না। রাজন- দেখ, এটা আমারটাই মিস্। আমি দেখছি কি করা যায়, বলে চলে গেল। অন্য আরেকটা সীটে গিয়ে বসলো রাজন। টিটি টিকেট চাইলে বলল- আমরা তের জন বন্ধু একসাথে ভর্তি পরীক্ষা দিতে সিলেটে যাচ্ছি। এগারজনের টিকেট পেছনে বাম পাশে বসা বন্ধুদের কাছে আছে, আর দুইজনের সীট সামনের বগিতে পড়েছে। ওখানে আমি আর আমার এক মেয়ে বান্ধবি বসেছি। তার কাছে আপনি দু’টো টিকেট পাবেন। টিটি পরবর্তী যাত্রীদের টিকেট দেখার জন্য সামনে চলে গেল। রাজন উঠে যেয়ে টিটিকে পেছনে ফেলে সেই মেয়েটির কাছে গেল। বলল- ভাইয়া এখনো ঘুমুচ্ছে? একটু চোখে মুখে পানি দিলে ঘুমটা ভাঙ্গতো আর ফ্রেশ লাগতো। আমরা তো প্রায় এসেই পড়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তো নামতে হবে। হঠাৎ এমন কথায় মেয়েটি বেশ বিশ্বাস করলো যে ট্রেন হয়তো সিলেটের কাছাকাছিই চলে এসেছে। তাই বলল- ট্রেনের ওয়াশরুমগুলো সুবিধার কি না? -না না, অসুবিধা হবে না। এই দেখেন সামনের ওয়াশরুমটা বেশ পরিষ্কার। আমি ব্যবহার করলাম মাত্র। মেয়েটি তার হাজব্যান্ডকে ডেকে ওয়াশরুমে যাবার জন্য বলতেই টিটি এই কম্পার্টমেন্টে ঢুকে গেল। রাজন লোকটিকে ইশারায় ওয়াশরুম দেখিয়ে দিয়ে বন্ধুদের কাছে চলে এলো। টিটি এসে মেয়েটির কাছে টিকেট চাইলে দু’টো টিকেট বের করে দিল। মেয়েটির বয়স আর অবয়ব দেখে টিটির কাছে রাজনদের বন্ধুদের মতোই মনে হলো। তাই এগার আর দুই এই মিলে তেরজনের টিকেটের হিসেব সে মেলালো। কিছু সাধারণ বিশ্বাস যা মানুষকে ধাঁধাঁয় ফেলে তা থেকে বের হবার একটাই উপায়, তা হচ্ছে গানের মতো করে বলতে হয়- মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন/মানুষ ধরো মানুষ ভজ/শোন বলিরে পাগল মন। যে বিশ্বাস দিয়ে নিজে ভুল করেছে সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অন্য ধাঁধাঁয় ফেলে নিজের অপরাধ আরো বাড়িয়েছে রাজন। মানুষের এই সরল বিশ্বাসগুলোকে আমরাই কেন অপপূঁজি করে, বোকা বানিয়ে মানুষকে ছোট করছি?
আমি তো দিব্য সরল, অমলিন চক্ষে দিব্য সকাল
করো না নষ্ট সব, ভেঙ্গো না ভাবনা হতে পরিপুষ্ট, বলো না মাকাল।
এ চোখে একটাই ছবি, যা অলোকময় পরিষ্কার,
বিভেদে, ধাঁধাঁয়, অস্পষ্টতায় ফেলবে না তোমায় বার বার!
একই অঙ্গে কত রূপ! নিশি তমালের এক গানের ছাত্রী, সাংস্কৃতিক বা অ্যাকাডেমিক এমন কোন অনুষ্ঠান বা কার্যক্রম নেই যেখানে তাকে দেখা যায় না। নিঃসন্দেহে এটা চমৎকার। মাল্টিটেলেন্টেড এরা। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো যখন চরিত্রে স্থায়ীভাবে বসে যায়, বা বিভিন্ন অঙ্গের এই বহুরূপী রঙ যখন আর শুধুমাত্র বাহ্যিক চরিত্রে না থেকে অভ্যন্তরটাকে পরবির্তিত করে তখন সমস্যাটা প্রকট হয়। যত রকমের মাল্টিটেলেন্টেডই হোন না কেন প্রতিটি মানুষেরই কিছু মৌলিক বিষয়ে একদম একমতেই থাকতে হবে। যা সার্বজনীন, শুদ্ধ। এর কোন বিকল্প কখনো সুস্থ, বিবেকবান মানুষের থাকবে না। বান্ধবি তপাও তেমনি টেলেন্টেটেড ছিল। ভেতরকার ভিতটা মনে হয় শক্ত ছিল না, তাই অল্প বয়সেই প্রেম, প্রত্যাখ্যান, বিচ্ছেদ-বিরহ, আবার স্বপ্ন দেখা আবার ভেঙ্গে পড়া। অবশেষে অনুধাবন, ততদিনে সবশেষ। সম্ভাবনাগুলো দুমড়ে মুচড়ে অস্থির সময়ের স্রোতে নিঃশেষ হলো।
এক বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল তমালের সাথে থাকা একবন্ধু। পরিচয় পর্ব ও কথার পর বন্ধুটি জানালো খুব সিরিয়াস লোক এই বড় ভাই। মানুষ খুন করে হাসপাতালে যেয়ে সেই খুনীর আত্মীয়-স্বজনদের কাছে নিজের সহমর্মিতা জানাতে অভিনয়ের জুড়ি নেই তার। এতো সূক্ষ্মভাবে সবকিছু ম্যানেজ করেন যে, কেউ তাকে কোনভাবেই কালপ্রিট প্রমাণ করতে পারবে না। কি নারী কেলেঙ্কারী, কি টেন্ডারবাজী, কি আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যবসা, কি চোরাকারবারী, কি পেশী শক্তির অপব্যবহার, কি সিন্ডিকেট করা, এমন কোন কাজ নেই যেখানে তার চলাচল নেই। বাহ্যিকভাবে তাকে দেখলে সুদর্শন, সুপুরুষ, সুকত্থ, সুকণ্ঠ, সুআলোচক, যৌক্তিক, মার্জিত মনে হবে। বেশ কিছুদিন তার সাথে তমালের যোগাযোগ ঘটে। তার চোখ দু’টো আর আচরণ কখনো এমন অবিশ্বাস দেখাতে পারেনি। তমালের কাছে মনে হয়েছে বন্ধুর কথা বুঝি মিথ্যে। রাজনীতি, সংগঠন আর ব্যবসার খাতিরে এই বড় ভাইয়ের সাথে সময়গুলো চলছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আসল রূপ প্রকাশ পেল তখন, যখন তার বলয়ের লোকদের স্বার্থ একটু স্খলিত হলো। বড়ভাইয়ের সাথে থাকা এই লোকেদের স্বার্থ এবং তার স্বার্থ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকলো তার কুৎসিত আচরণ। অতো সুন্দর একটি মানুষের মধ্যে এমন আচরণ বা কর্মকান্ড লুকিয়ে আছে যা ভাবাই যায় না।
একজন মানুষ যখন কাউকে বিশ্বাস করে তার আচরণ, বাহ্যিক কাজ-কর্ম দেখে তখন বিশ্বাসী মানুষটির দায়িত্ব বেড়ে যায়। অনেক অপরাধ ভেতরে লুকানো থাকলেও, এই বিশ্বাসী হয়ে ওঠার কারণেই অবিশ্বাসগুলোকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়া নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়ে। মানুষ হয়ে ওঠার জন্য, বিশ্বাসী হয়ে ওঠার জন্য আমাদের প্রতিযোগিতা করা উচিৎ। অবিশ্বাসী হবার ঘৃণিত রূপ এমন- যে মানুষটি বিশ্বাস করে আপনাকে বিশ্বাসী মনে করলো, সেই মানুষটির বিশ্বাসের মূল্য দেবার যোগ্যতাই আপনার নেই। আমাদের সমাজে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, লেখক, কবি, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, এমপি আরো কতশত নামীদামী পেশাদারী লোক আছেন, দরকার এর পাশাপাশি একেকজন ভাল মানুষের, সৎ মানুষের, বিশ্বাসী মানুষের। শত আদর, যতœ, সেবা আর ভালবাসা দিলেও যে কোন মুহূর্তে পশু যেমন তার পাশবিক আচরণ প্রকাশ করতে পারে মুনিবের প্রতি, হয়ে উঠতে পারে স্ববৈশিষ্ট্যে পশু, ঠিক তেমনি একজন অন্যায়কারী, অসৎ মানুষ সমাজের জন্য, বিশ্বের জন্য ভয়ংকর।
মনের গহীনে আজি স্বপ্ন আঁকি, তুলিতে আঁকবো স্বপ্ন বিশ্ব;
যা আছে নিজের ভাল, বিলাব সব, হবো দাতা, তুলে ধরবো রিক্তেরে, নিজে হবো নিঃস্ব!
আপন আলোয় আলোকিত হবে ধরা;
জরা, পঁচা, অস্পৃশ্য হবে জড়, ভংগুর, মরা!
সুচিন্তার এ আলো ছড়াবেই একদিন, হবে স্বর্গ এ মর্ত;
থাকবে না পাপ, সুলব্ধ হবে বেহেশ্ত, লাগবে না কোন শর্ত!

-এস জে রতন
সংগীতশিল্পী, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকমী
sjratan@gmail.com

পাতাটি ৩৫৫৫ বার প্রদর্শিত হয়েছে।