দশদিক মাসিক

হোম উপলব্ধি

উপলব্ধি

-মুহাম্মদ সাজিদুল হক

শোনা গেল এক আধ্যাতিক পুরুষের আবির্ভাব হয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনের অনেক জটিলতার অনেক সহজ-সরল বিশ্লেষণ ও পরিচ্ছন্ন সমাধান পাওয়া যাচ্ছে তার কাছে। বেশ কিছু লোক এরইমধ্যে তাকে খুব ভালভাবে মেনে নিয়েছে। মানুষজনের সাথে তাঁর সম্পর্ক কোন বস্তুগত আদান প্রদানের উপর গড়ে উঠেনি। শুধুমাত্র মনের ভেতরকার কিছু গুঢ়ূরহস্যের অদ্ভুত সুন্দর বাস্তবিক ব্যাখ্যা লাভই সাধারনের প্রাপ্য। সচারাচর চোখে পড়া জন মানুষের জামায়েতে তাঁর দেখা মেলেনা। হঠাৎ করেই সাধারণের মাঝে থেকেই অসাধারণের মত অস্তিত্ত্বের জানান দেন। লম্বা চৌরা গঢ়নের শ্যাম বর্ণের পেটানো দেহের সাথে মানানসই লম্বাটে মাথার মানুষটির নিরহংকার বিনয়ী চলাফেরা অনেকের দৃষ্টি প্রায় এড়িয়ে যায়। সর্বদাই যেন কোন ভাবনায় ডুবে রয়েছেন তিনি। অপ্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ যটতা পারেন এড়িয়ে চলেন তবে চোখাচোখি হলে স্বভাবসুলভ সরল চাহনির, মার্জিত হাসির শান্তিপূর্ণ অভিনন্দন বিনিময় করতে ভুলেননা কখনোই।
অফিসপাড়ার মসজিদটিতে তার নিয়মিত যাতায়াত। নামাজের বিরতিতে দৈনন্দিন রুটিনের একটি হচ্ছে বন্ধু-কলীগদের ইসলামের দাওয়াত দেয়া। শুধু নামাজ নয় বরং পরিপূর্ণ ইসলামকে অন্তরে ধারণ করতে উৎসাহ দেন। তাদের উপলদ্ধিতে এই বোধকে শাণিত করতে ইসলামের সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাশাপাশি নিজের জীবনের অতীত বাস্তবতার উদাহরণ তুলে ধরে তার বর্তমান অবস্থানের ব্যাখ্যা করেন। তবে সবাইকে তাদের ইচ্ছার বিপরীতে দাড় করিয়ে নয় বরং উক্ত ব্যক্তিটি যটতুকু সানন্দে গ্রহণ করতে পারেন ঠিক ততটুকুই ব্যক্ত করেন। কেউ আগ্রহ না দেখালে তার বিরক্তির উদ্রেক করেননা। কিন্তু উনার বলার মাঝে এমন কিছু থাকে যা লোকগুলোর মনে একটি বাড়তি উন্মাদনা তৈরী করে তাদের কৌতহলী করে তুলে।
যেমন পুরনো কথাতেই নতুনত্ব এনে সে বলে প্রত্যেক মানুষের দুনিয়ার জীবনে শয়তান নামক একটি ভাইরাস ইনস্টল করা থাকে। আর মানুষের ইহজীবন আর পরজীবনের সফলতার জন্য অবশ্যই কোরআন নামক সফট্ওয়ারটি সর্বোপরি দেহ ও মনে ধারণ করতে হবে। এবার যতক্ষণ শয়তান থাকবে ততক্ষণ কোরআন ধারণ করার উপযোগী কনফিগারেশন শরীর ও মন পাবেনা। তাই শয়তানকে দূর করতে হবে। কিন্তু কিভাবে?
তার ব্যখ্যা হলো- আমরা যদি নিজের লাভের জন্য অন্যায়ভাবে কাউকে ঠকাই বা কাউকে মিথ্যা বলি তবে অবশ্যই আমরা অপরাধী। এবার এই অন্যায়কারী যদি প্রকৃত ইসলাম তথা কোরআন আর সুন্নাহকে পরিপূর্ণভাবে মনে ধারণ করতে চায় তবে তার নিজেকে সর্বাগ্রে প্রস্তুত করতে হবে। প্রস্তুতিপর্বে তার পূর্বাপর অপরাধসমূহ স্বীকার করতে হবে এবং যতটা পারা যায় ক্ষতিগ্রস্থ ব্যাক্তির নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। আর আমি যখন অপরের কাছে ভুলের জন্য ক্ষমা চাইব তখন একটি বড় বাঁধার সম্মুখীন হব। সেটি হচ্ছে আমার অন্তরের লালিত অহংবোধ। আমি ভাবব-
আমি কি তার কাছে ছোট হব? সে তো আমার সব অপকর্ম জেনে যাবেÑ সে যদি আমাকে শাস্তি দেয়Ñ সবাই জানলে তো সমাজের কাছেও আমি অপদস্ত হবÑ
হ্যাঁ সবই সত্যি কাথা। কিন্তু ক্ষমা আমি ব্যক্তির নিকট চাইলেও আমার উদ্দেশ্যতো আমার আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর এটা ভাবতে পারলেই কাজটি অনেক সহজ হয়। আল্লাহর কাছে আতœসমর্পণ করে ভবিষ্যতে আর অন্যায় না করার মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারলেই প্রাথমিক পর্ব শেষ। এবার আমি আমরা সকল প্রকার শয়তানি ভাইরাস মুক্ত হয়ে কোরআন নামক এন্টিভাইরাস ইন্সস্টলেশনের মাধ্যমে ইহকাল ও পরকালে সফলতা পেতে পারি।
বাহ্ খুব আধুনিক আর বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা। আমার খুব ভালো লাগলো শুনে। ভাবলাম উনার সাথে একদিন দেখা করব। যে ব্যাক্তি তার পূর্বাপর সকল অন্যায়ের তালিকা করে সেই তালিকা অনুযায়ী বান্দার নিকট ক্ষমা আদায়ের জন্য ঘুরে বেড়ায় শুধু আল্লহর সন্তুষ্টির জন্যÑ তার বাস্তব উপলব্ধিটা নিশ্চই আরও পাকাপোক্ত। তার কাছ থেকে হয়তো আরও কোন অনুকরণীয় পথের সন্ধান পাওয়া যাবে। অফিস যাইÑ অফিস শেষ করিÑ আবার বাসায় ফিরি কিন্তু সেই ব্যক্তিটির সাথে সাক্ষাত করা আর হয়না।
একদিন প্রচন্ড জ্যামে পড়ে নেমে গেলাম প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে। হাতে বেশ সময়ও ছিল তাই ভাবলাম হেটে হেটেই অফিস পৌছাব। হাটছিলাম আর আর ভাবছিলাম। অনেক ভাবনার ভিতর সেই ধর্মোপলব্ধির বাস্তব উদাহরণ ভদ্রলোকও চলে এসেছিলেন আমার মানসপটে। এমন সময়Ñ “আচ্ছলামু ওয়ালাইকুম, কোমল কণ্ঠের স্পষ্ট উচ্চারণে আমি থমকে তাকালাম। উত্তরে ওয়ালাইকুম আস্সালাম বলে আমি অপরিচিত ব্যক্তিটির সাথে দৃষ্টি বিনিময় করলাম। কিন্তু সামনের মুখখানি তখনো মুচকি হাসিতে প্রসারিত। হেসে বললÑ
কী দাড়ি রাখাতে চিনতে পারছনা? নাকি দেখা হওয়ার গ্যাপটা অনেক দিনের হয়েছে তাইÑ
আমি ততক্ষণে খুব পরিচিত কণ্ঠের উত্তাপ অনুভব করলাম। এতো আমাদের আহাম্মেদ। বন্ধু মহলে পরিচিত নাম “পাকু”।
আমি উত্তেজিত কণ্ঠেÑ আরে আহাম্মেদ তুই? হ্যাঁ আমি। কেমন আছিস? আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। কি দোস্ত ডিউটিতে আছিস?
না দোস্ত চাকরী থেকে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছি। বলে আমার হাত ধরে বলল চল সামনে যেতে যেতে কথা বলি।
চা খেতে খেতে জানালো অন্যায়ের সাথে অপোষ করতে পারবনা। তাতে যে ধরনের চাপই আসুক আমি মেনে নিতে প্রস্তুত। আমর উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, মানুষের নয়। এরপর আমার ধর্মীয় আমলের খবর নিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সাথে সাথে কুরআন বুঝার জন্য তাগিত দিল। এরপর বলল অতীতে আমার কিছু ভুল ছিল। আমার যতটুকু মনে পড়ে তার তালিকা অনুযায়ী ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ভুলগুলোর জন্য তাদের দ্বারে দ্বারে ক্ষমা প্রর্থনা করে বেড়াচ্ছি। আমার আরেকটি বড় ভুল ছিল। যার উপর আমার চাকরি হয়েছিল। আমি মিথ্যে বলে চাকরি নিয়েছি। আমি অনুতপ্ত তাই এটা স্বীকার করতেই এখানে এসেছি। যেকোন ধরনের পরিণতির জন্য আমি প্রস্তুত। আমার প্রয়োজন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি।
এমনসময় আমার হঠাৎ মনে হলো একসময়ের ডানপিটে স্বভাবের সেই আহম্মদ-ই তো আজকের সেই বাস্তব ধর্মোপলব্ধিসম্পন্ন আধ্যাতিক পুরুষ নয়।

লেখক -মুহাম্মদ সাজিদুল হক
ই-মেইল:msajidul.khan@yahoo.com

পাতাটি ৩২৪৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।