দশদিক মাসিক

হোম আমার নানা

আমার নানা

আবু সাইদ

গ্রীস্মের ছুটি হলেই নানা বাড়ি যাওয়ার একটা লক্ষ থাকে। কিন্তু আমার বিষয়টি ব্যতিক্রম। কারণ আমার নানা বাড়ী আমাদের বাড়ির পাশেই একই গ্রামে কাছাকাছি। একটা নিদিষ্ট সময় করে না গেলেও প্রায় সব সময় নানাবাড়িতেই সময় কাটতো। স্কুলের সময় স্কুলে যেতাম। বাকি সময়টা নানাবাড়ি কাটাতাম। আমার মা খালামনিরা চার জন। তার মধ্যে আমার মা বড়। যার কারণে মামা, খালামনি, নানা নানীর নিকট ছিলাম আমি সবার প্রিয় আদরের। ছোট কাল থেকেই মাতাব্বর টাইপের কথা বলার কারণে নানা আমাকে অনেক বেশি ভালবাসতেন। নানা আমাকে তার নিজের অন্যান্য নাতী নাতনীদের থেকে বেশী আদর করতেন।
আমি ছোট কাল থেকেই পড়াশোনায় বেশী যতœশীল ছিলাম, যার কারণে তিনি আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। যদিও আমার নানা ভাই শিক্ষিত ছিলেন না, তবুও বংশীয় মর্যাদায় তালুকদার হওয়ার কারনে এলাকার অনেক শিক্ষিত জ্ঞানীগুনী এবং প্রভাব শালী লোকদের সাথে উঠাবসা করতেন। আমার নানা অত্যান্ত সহজ, সরল, ছিলেন। কোন হিংসা বিদ্রেষ তাকে কোন সময় স্পর্শ করে নি। তার মনে যে হিংসা ছিলনা, একটি ঘটনায় তার প্রমান পাওয়া যায়। গ্রাম দেশে টুকটাক ঝগড়া বিবাদ আশেপাশের মানুষের সাথে অনেক সময় হয়। অনেক মানুষ এটাকে অনেক বড় করে দেখেন । কিন্তু আমার নানার ক্ষেত্রে ভিন্ন। একদিন একজনের সাথে ঝগড়া বা কথা কাটাকাটি হয়েছিল সকাল বেলা। অথচ বিকাল বেলা বাজারে থেকে একই নৌকায় আসার সময় যার সাথে ঝগড়া হয়েছিল সে কথা প্রসঙ্গে বললো, বাজার থেকে মরিচ আনতে মনে নেই । নানা সেই কথা শুনে বললেন আমি এক কেজি মরিচ এনেছি, আপনী আধা কেজি নিয়ে যান। এই কথা শুনে লোকটি খুশিতে নানা ভাইয়ের নিকট ক্ষমাচেয়ে কোলা কুলির মাধ্যমে সব দুঃখ ভুলে গেলো। নানা ভাই তার এই আচরন দিয়ে আমাদের শিখিয়ে গেছেন হিংসা করা ভাল কাজ নয়। যে হিংসা করে মহান আল্লাহ তাআলা তাকে পছন্দ করেন না। আমাকে নানা ভাই যে কি রকম ভালবাসতেন তা লিখে শেষ করার মত নয়।
আমাদের গ্রামে শুক্রবার এবং মঙ্গলবার দুইদিন হাঁটবার নানা হাটে যেতেন আমাদের বাড়ি হয়ে যাওয়ার সময় বলে যেতেন, নানা ভাই আজকে কাঁঠাল আনবে। নদটির পাড়ে নৌকা ঘাটে বসে থাকতাম কখন নানা ভাই আসে। মা তো আবার যেতে দিবে না। তাই মাকে ফাঁকি দিয়ে যেতে চেষ্টা করতাম নানা ভাইয়ের সাথে আমার ছোট খালামনি সেলিনা বয়সে কম হওয়ার কারণে অনেক সময় নৌকা থেকে নামিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতো। কিন্তু নানা ভাই আদর করে নিয়ে যেতো এবং খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবার বাড়িতে পৌছে দিতো মহান আল্লাহ আজ আমাকে এ,বি, এস পাশ করার সুযোগ দিয়েছেন। যে স্বপ্নটা নানা ভাই মনে মনে পোষণ করতেন যে আমার বড় মেয়ের বড় ছেলে এক সময় বাংলাদেশের একজন গ্রাজুয়েট নাগরিক হবে। আজ আমি গ্রাজুয়েট পাশ করেছি ছোট্র একটি চাকরীও করি । ঈদ আসলে মনে হয় নানা ভাইয়ের জন্য নতুন পাঞ্জাবী কিনে তাকে উপহার দিতে । কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই তিনি চলে গেছেন। এক অচীন দেশে । যে দেশ থেকে কেউ কোনদিন ফিরে আসবে না। তাই মহান প্রভুর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার নানা ভাইকে জান্নাতুল ফেরদাইস নাসির করেন (আমিন)।

পাতাটি ৩৫১৪ বার প্রদর্শিত হয়েছে।