দশদিক মাসিক

হোম অন্য জগৎ

অন্য জগৎ

কাজী সাদ্দাম হোসেন
“আমি জরিনা।” পদ্মার পাড়ে ছিল আমাগো বাড়ি। দুই বোন ছিলাম আমরা। আমি ছিলাম বড়। বাজানে ক্ষেতে কাম করত। মায়ে বাইতে-ই থাকত। আমি তহন কেলাস ফাইবে পড়ি। খাইয়া না খাইয়া ভালই দিন যাইতা ছিল আমাগো। বাজানে আমারে অনেক আদর করত। কইতো তুই পড়ালেহা কইরা অনেক বড় হবি। তহন আমাগো আর দুঃখ থাকবো না। আমার পড়ালেহা করার অনেক ইচ্ছা ছিল পড়ালেহায় আমি ভালই আছিলাম। চোহে অনেক স্বপ্ন ছিল পড়ালেহা কইরা অনেক বড় হইব। কিন্তু আমার স্বপ্নডা আর বেশি দিন রইল না। সর্বনাশা পদ্মায় আমাগো বাড়িডা বিলীন হইয়া গেল। পদ্মা নদী আমাগো বাড়িডারে খাইয়া ফালাইল। আমরা আশ্রয়হীন হইয়া পড়লাম। আমার পড়ালেহা বন্ধ হইয়া গেল আমার এক চাচার বাসায় আশ্রয় নিলাম। দুঃখ-শোকে বাবাজান অসুস্থ হইয়া গেল। মায়ে অন্যের বাইতে কাম ধরল। আমি বাইতেই থাকতাম। রান্নাবাড়া করতাম আর ছোট বইনডারে দেখতাম। আমাগো কষ্ঠ আরো বাড়তে লাগল। হঠাৎ বাজানে মারা গেলে। আমরা আরো নিঃস্ব হইয়া গেলাম। মাঝে মাঝে না খাইয়া থাকতাম। ক্ষুধার জ্বালায় পেঠটা জ্বলত। ছোড বইনডা খালি কাঁনত। এই ভাবে কয়েক বছর চইলা গেল। আমি ও বড় হইয়া গেলাম। মায়ে অন্যের বাইতে কাজ করতে করতে অসুস্থ হইয়া গেল। আমি ভাবলাম আমার অহন কিছু করতে হইব। পাশের বাড়ির খালায় কইল ঢাকা যাবি এক বাইতে কাম করবি খাবি ওই খানে থাকবি মাস শেষে টাহা দিব। আমি রাজি হইয়া গেলাম। ভাবলাম এহন আমাগো কষ্ট কিছুডা কমবো। মায়ে কিছুতেই রাজি হইতা ছিল না। মায়েরে বুঝাইয়া খালার লগে ঢাকা গেলাম। খালায় এক বাইতে দিয়া আইল। কইল জরিনা ভাল মত থাহিস আপার কথা শুনিস। আমি কইলাম আচ্ছা। যে বাইতে আমারে দিয়া গেল হেই বাইতে যে মাহিলা আমি তারে খালাম্মা কইতাম আর হের জামাইরে খালুজান কইয়া ডাকতাম। হেগ একটা পোলা ছিল কেলাস থ্রিতে পড়ত। আমি হেড়ে ভাইজান কইয়া ডাকতাম। হেগ বিশাল বাড়ি। খালাম্মায় আমাড়ে দিয়া সারাদিন অনেক কাম করাইত। কামে ভুল হইলে খালি মারত। হেগ পোলাডায় আমারে কারণে-অকারণে মারত। এত কাম করতে আমার অনেক কষ্ঠ হইত। তবুও মা-বইনডার দিকে তাকাইয়া সব সহ্য করতে লাগলাম।
খালি মা বইনডার কথা মনে পড়ত। মনে পড়লে অনেক কাঁনতাম। একদিন একটা গেলাস ভাইঙ্গা গেছিল। খালাম্মায় আমারে অনেক মারছিল। মাইর খাইয়া আমি অসুস্থ হইয়া গেছিলাম। খালাম্মায় আমারে একটা ট্যাবলেড খাওইয়া আবারো কাম করাইতে লাগল। অনেক কষ্ট হইতো ছিল। তবুও উপায় নাই। গরীব মাইনসের যত জ্বালা। তয় খালুজান কিছু কইতো না। হে সরাদিন অফিসে থাকত রাইতে আইতো। হের মুখে দাড়ি আছিল কেমন কইরা যেন আমার দিকে তাকাইত। আমার খুব ডর ডর লাগত। হুনছি হে নাহি আবার সামাজ সেবা ও করে।
একদিন খালাম্মায় কই জানি বেড়াইতে গেল হের পোলাডারে লইয়া। কইল আইতে একদিন দেড়ি অইব। খালুজানরে ঠিক মত খাইতে দিতে কইল। আমি কইলাম আইচ্ছা। আমি সারাদিন বাসায় একা থাকলাম। রাইতে খালুজান আইল। আমি হেরে খাইতে দিলাম। খালুজান খাইয়া হের রুমে গেল। কিছুক্ষণ পর আমারে ডাকতে লাগল। জরিনা, জরিনা ........... কইরে। আমি কইলাম আইতাছি খালুজান। হের রুমে ডুইকা দেখলাম হে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পইরা খাটের উপর বইসা আছে আর কলম দিয়া খাতায় যেন কি লিখতাছে। আমার দিকে কেমন কইরা যেন তাকেইতাছে। আমার খুব ভয় ভয় লাগতাছিল। আমারে কইল এক কাপ চা দিতে। আমি হের লিগা চা করতে গেলাম। আমার আতœাডা দুক দুক করতাছিল। আমি চাঁ কইরা লইয়া আইলাম। খালুজান খাট থেইকা নাইমা আইল। চাঁ’র কাপটা টেবিলে রাখল রাইখা আমার দিকে আইল। ভয়ে আমার হাত-পা কাপতে লাগল। আইয়া আমার হাত ধরল। কইল চুপ কোন কথা কবি না তাইলে খবর আছে। আমারে টাইনা খাটে লইয়া গেল। আমি কইলাম খালুজান কি করতাছেন। হে কইল চুপ খবরদার বেশি কথা কবি না একদম জানে মাইরা ফেলামু। আমি চিৎকার করতে লাগলাম কিন্তু আমার চিৎকার চার দেওয়ালের মাঝেই আইটকা রইল। আমি কাঁনতে লাগলাম। খালুজানের পায়ে ধরলাম কইলাম আপনে না আমার বাবার লাহান। আমার সর্বনাশ কইরেন না। অনেক কাকুতি-মিনতি করলাম কিন্তু লাভ হইল না। কুত্তার মত আমার উপর ঝাপাইয়া পড়ল। আমি শত চেষ্ঠা কইরা-ও নিজেরে ছাড়াইতে পাড়লাম না ওই কুত্তাডার কাছ থেইকা। মানুষ রূপী ঐ কুত্তাডা আমারে কামড়াইতে লাগল। ওই কুত্তাডার কামরে রক্তে আমার দেহ ভিজা গেল। ততখনে আমার সব শেষ হইয়া গেল। অবাক দৃষ্ঠিতে ওই কুত্তাডার দিকে তাকিয়ে রইলাম। যারে আমি বাপের মত মনে করতাম। আমার শরীলডা নিথর হইয়া গেল। সারা রাত ওই কুত্তাডা আমারে কামড়াইতে লাগল। আমি জ্ঞান হারাইয়া ফেললাম। যখন জ্ঞান ফিরল তখন সকাল। জানালার ফাঁক দিয়া সূর্য উকি মারছে। আমার শরীলে এতটুকু শক্তি নাই। তবুও বহু কষ্টে উঠে বসলাম। চিন্তা করলাম আমার’ত সব শেষ হইয়া গেছে বাইচা থাইকা কি লাভ। কষ্টে যন্ত্রনায় আতœহত্যা করতে গেলাম। মা-আর বইনডার কথা মনে পড়ল। আমি মইরা গেলে ওরা না খাইয়া থাকব। আতœহত্যা করতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর ওই কুত্তাডা আইল কইল এই ঘটনা যদি কাওরে কছ তাইলে খবর আছে। মা-বইনডার কথা চিন্তা কইরা সব সহ্য করলাম। এরপর শুরু হইল আরো নির্যাতন। প্রায় সুযোগ পাইলে ওই কুত্তাডা আমারে কামড়াইতে লাগল। শত আকুতি মিনতি করেও কোন লাভ হইত না। মা-বইনডার অসহার চেহারাডা আমার সামনে ভাইসা উঠত। নিরবে সব সহ্য করতে লাগলাম।
কিছুদিন পর অনুভব করলাম আমার পেটের ভিতরে একটা মাংস পিন্ডি বড় হচ্ছে। বুঝলাম আমার আরো সর্বনাশ হইয়া গেছে। এহন আর চুপ থাকা যাইবোনা। খালাম্মারে সব ঘটনা খুইলা কইলাম। খালাম্মায় আমারে প্রচন্ড মারল কইল সবদোষ তোর। আমার ঘাড়ে সবদোষ চাপাইয়া আমারে গ্রামে পাঠায়া দিল। গ্রামে আইয়া মায়ের সব খুইলা কইলাম। মা কইল এত কষ্ঠকেন আমাগো। গরিব হইয়া জন্ম নিয়া পাপ করছি। হে আল্লাহ আরত কষ্ট সহ্য হয় না। কষ্ট্য সহ্য করতে না পাইরা মায় আত্নহত্যা করল। গ্রামের সবাই আমাকে নষ্টা বইলা ডাকতে লাগল। যে চাচার বাসায় আশ্রয় নিছিলাম হে বাইত থেকা বাইর কইরা দিল। গ্রামের কেও আশ্রয় দিল না। সবাই কইল তুই একটা নষ্টা তোরে আশ্রয় দিলে আমাগো পাপ হইব। যারা আশ্রয় দিতে চাইল তারা আমার সাথে খারাপ কাম করতে চাইল। সকল জ্বালা যন্ত্রনা সহ্য কইরা ছোট বইনডারে লইয়া ঢাকা চইলা আইলাম। এক বস্তিতে উঠলাম। বস্তির এক আপার সাহায্যে পেটের ভিতর মাংস পিন্ডিডা ফালাই দিলাম। পা রাখলাম অন্য এক জগতে। এই জগতে নেই কোন ভালবাসা নেই কোন স্বপ্ন আছে শুধু মৃত্যু। মৃত্যু ডারে হাতের মুঠোয় লইয়া শুরু হইল আমার জন্য এক জগৎ। অহন আমি রাতের বেলা ঢাকার শহরের অলিতে গলিতে হাটি খদ্দারের আশায়। আজকা একজনের সাথে ত কালকা অন্যজনের সাথে রাত কাটাই। কেউ বলে নিশিকন্যা আবার সমাজের ভদ্রলোক গুলান কয় পতিতা। আমি ইচ্ছা কইরা এই পথে আসি নাই। পরিস্থিতি আমারে এই পথে আনতে বাধ্য করছে। আমার মত অনেক জরিনা আছে হয়ত একই ঘটনার শিকার হইয়া এই পথে আসছে। কেও ইচ্ছা কইরা এই পথে আসেনা সবাই চায় সুন্দর ভাবে বাচঁতে। সামাজে আমরা নষ্টা বইলা পরিচিত। কিন্তু যারা আমাগো এই পথে আনতে বাধ্য করছে তারাত ঠিকই সুন্দর ভাবে জীবন যাপন করছে। তাদের সংসার আছে সবই আছে আর আমাগো কিছু নাই। সমাজের ওই মানুষ রূপী জানোযার গুলি হয়তো আরো জরিনার জন্ম দিব। তারাতো ঠিকই ভাল থাকব।
আর আমরা?

পাতাটি ৩৯০৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।