Untitled Document
Make Doshdik your homepage
Untitled Document
 
 
 
You are visitor number 84732You are visitor number 84732You are visitor number 84732You are visitor number 84732You are visitor number 84732
 
     
 
2010-01-19
যুদ্ধ ও একটি মেয়ে
 
  ইমদাদুল হক মিলন  
  হায়দার নামে রেজার এক দূরসম্পর্কের ভাই কয়েকদিন ধরে এই বাড়িতে এসে বসে আছে। আজ শেষ বিকেলে হায়দারকে নিয়ে কথা শুরু হলো রেজা এবং রুবার। রেজার মনের ভেতর অন্যপ্রসঙ্গ ঘোরাফেরা করছে। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে সহজে যেতে চাইলো না সে। খুব সূক্ষ্ম একটা চালাকি স্ত্রীর সঙ্গে সে করতে চাইছে। নানারকম কায়দায় তার সন্দেহের উৎসটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তবে খুবই ঠান্ডা মাথায়। রেজা বলল, চল বারান্দায় বসে চা খাই। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা অাঁচড়াচ্ছে রুবা। দাঁতে কামড়ে ধরা একটা ক্লিপ। চুলে ক্লিপ লাগিয়ে বলল, চল। তারপর জুলেখাকে ডাকল। বুয়া, আমাদের চা নাশতা বারান্দায় দাও। বেডরুমের সঙ্গে ছোট্ট সুন্দর বারান্দা। দুটো হালকা ধরনের চেয়ার পাতা আছে বারান্দায়। সুন্দর একটা টিপয় আছে। বিকেলের চা নাশতা কখনও কখনও এখানে বসে খায় রেজা এবং রুবা। আজ বিকেলে তারা দুজন বারান্দায় আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ট্রেতে করে চায়ের মগ এবং প্লেটে করে সলটেড বিস্কুট এনে টিপয়ের ওপর নামিয়ে রাখল জুলেখা। রুবা বলল, হায়দারকে চা নাশতা দিয়েছ? জ্বি। নাশতা খেয়েই বেরুল। জুলেখা চলে যাওয়ার পর প্রায় একসঙ্গে চায়ের মগ হাতে নিল দুজনে। বিস্কুট নিল। রুবা বলল, হায়দারকে বাড়িতে বসিয়ে রেখেছ কেন? এক কামড়ে বিস্কুট খেয়ে চায়ে চুমুক দিল রেজা। চাকরির জন্য এসে বসে আছে। থাকার জায়গা নেই। আমাদের বাড়ি ফাঁকা, ভাবলাম এখানেই থাক। চাকরি বাকরি হওয়ার পরও কি এখানেই থাকবে? আরে না। মেস টেসে উঠে যাবে। নয়তো কোনও কলিগের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট। রুবা চায়ে চুমুক দিল। চাকরি কি শীঘ্র হবে? মনে হয় হয়ে যাবে। বেশ কয়েকটি জায়গায় বলে রেখেছি। তাড়াতাড়ি চাকরি দিয়ে যন্ত্রণা বিদেয় কর। যন্ত্রণা বলছ কেন? হায়দার আমার খালাতো ভাই। মার চাচাতো বোনের ছেলে। অসুবিধায় পড়েই মানুষ মানুষের কাছে আসে। তা আমি বুঝি। তাহলে? এই বয়সী একটি ছেলে, ছেলে না বলে পুরুষমানুষ বলাই ভালো, সারাক্ষণ বাড়িতে বসে থাকছে এটাই এক যন্ত্রণা। কিন্তু আমি যতদূর জানি হায়দার খুবই নিরীহ ধরনের ছেলে। নিরীহ অনিরীহর কথা নয়। মানুষজন আমার আসলে এখন আর ভালো লাগে না। বিয়ের পর থেকে, বাইশ তেইশটা বছর ধরে এত মানুষজন সামলেছি আমি, এখন আমার খুব ক্লান্ত লাগে। তুমি কি আমার মা বাবা ভাইবোনের কথা বলছ? রুবা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। শুধু তাদের কথা কেন? এর বাইরেও কি কম লোক? যেমন? তুমিই ভেবে দেখ। তোমাদের আত্মীয় স্বজন, তোমার বিজনেসের লোক। যখন তখন দুচারজন লোক নিয়ে বাড়ি এসে উঠেছ তুমি। সঙ্গে সঙ্গে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। একসময় ড্রয়িংরুমে ঢালাও বিছানা করে থাকতে দিতে হয়েছে কাউকে কাউকে। চায়ের কাপ নামিয়ে হাসল রেজা। আত্মীয় স্বজনের কথা যে বললে, তোমাদের আত্মীয় স্বজনরাওতো এসে এভাবে থেকেছে। আমার দিককার আত্মীয় স্বজনরা এসেছে কম। তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু এখন মানুষজনের ব্যাপারে বিরক্ত তুমি না হলেও পার। কেন? এখন লাইফ স্টাইলই বদলে গেছে আমাদের। বিজনেস নিয়ে আগের মতো খাটাখাটনি আমি করি না। বিজনেসের লোকজনকে বাড়িতে সাধারণত আসতে বলি না। যাদের দরকার তারা অফিসে আসে। বাড়িতে আসলে কোনও ঝামেলাই নেই তোমার। ছেলে দুটোও বাইরে। রুবা চুপ করে রইল। রেজা বলল, এখন যে রকম জীবনযাপন কর তুমি এরচে’ ঝামেলামুক্ত আরামের জীবন মানুষের আর হতে পারে না। এই জীবনটা কি আমার প্রাপ্য নয়? মানে? তেইশটা বছর তোমার সংসার নিয়ে যে পরিশ্রম আমি করেছি তারপর এইটুকু আরাম আমি অবশ্যই আশা করতে পারি। আশা করা কেন, তুমি পাচ্ছই। জুলেখা সংসার সামলাচ্ছে। তোমার যখন যেখানে ইচ্ছে চলে যাচ্ছ, যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়াচ্ছ! মুখ ঘুরিয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকাল রুবা। যেখানে ইচ্ছে ঘুরে বেড়াচ্ছি মানে? রেজা একটু ভড়কাল। না, মানে বাইরে টাইরে যাচ্ছ না? সে আমি আগেও যেতাম! সংসারের কোন কাজটা তুমি করেছ? সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে, ছেড়ে দেয়া না বলে চাপিয়ে দেয়া বলা ভালো, আমার ওপর সব চাপিয়ে দিয়ে তুমি থেকেছ শুধু তোমার বিজনেস নিয়ে। বাচ্চাদের স্কুল থেকে শুরু করে, ডাক্তার হাসপাতাল, শপিং করা, আত্মীয় স্বজনদের বিয়েশাদিতে এটেন্ড করা, এমনকি কাঁচাবাজার পর্যন্ত সব, সব আমাকে করতে হয়েছে। এসব কাজ তো ঘরে বসে করা যায় না। আমি জীবনে যা চেয়েছি, তুমি আমাকে একেবারেই তার উল্টো দিকে নিয়ে গেছ। কেমন? আমি আসলে ঘরপ্রিয় মেয়ে। ঘরে থাকতেই আমার ভালো লাগে। কিন্তু তুমি আমাকে, মানে তোমার সংসার করতে এসে ঘরের বাইরের যেতে আমি বাধ্য হয়েছি। কিন্তু এখন সেই অবস্থাটা আর নেই। এখন তুমি তাহলে বাইরে যাচ্ছ কেন? কোথায় যাচ্ছি? তা আমি জানি না। কিন্তু যাচ্ছ তো? প্রয়োজন হলে যাব না? আগেও প্রয়োজনেই যেতে? আগের প্রয়োজন আর এখনকার প্রয়োজন এক রকম নয়। রেজা হাসল। তা ঠিক। রুবা একটু বিরক্ত হলো। এতে হাসির কী হলো? হাসি পেল আর কী! কেন? এমনি। হাসি মানুষের পেতে পারে না! তোমার হাসিটা একটু রহস্যময় মনে হলো। না রহস্যের কিছু নেই। দুজনেই খানিক চুপ করে রইল। তারপর রুবা বলল, হায়দারকে তোমাদের ফার্মে লাগিয়ে দিতে পারছ না? পারব না কেন? তাহলে লাগিয়ে দাও। ভাবছি। ভাববার কিছু নেই। তোমার খালাতো ভাই মানে তোমার নিজের লোক। বিজনেসে নিজের দুয়েকজন লোক থাকা ভালো। ঠিকই বলেছ। ভাবছি কাল থেকে সঙ্গে করে অফিসে নিয়ে যাব। ঢাকায় অসুবিধা হলে মুন্সিগঞ্জে পাঠিয়ে দাও। ওখানকার কাজটা সে দেখবে। থাকবেও ওখানে। ওটা শেষ হলে অন্য যেখানে আবার কাজ হবে সেখানে পাঠাবে। মন্দ বলনি। তোমাদের এইসব কাজে যে যেখান দিয়ে পারে চুরি চামারি করে খায়। বাইরের লোকরা যেখানে খাচ্ছে সেখানে না হয় নিজেদের লোকরা খেল। রুবার কথা শুনতে শুনতে আনমনা হলো রেজা। জুলেখার কথা মনে হলো। জুলেখা বলেছিল রুবার ব্যাপারে তার যা সন্দেহ সেসব বিষয়ে সরাসরি রুবার সঙ্গে কথা বলতে। ওসব কথা কি রুবাকে এখন বলবে রেজা! তারপরই ভাবল, সরাসরি ওই ধরনের সন্দেহ টন্দেহের কথা তুললে কী রকম রিয়্যাক্ট করে রুবা কে জানে। বড় রকমের কোনও অশান্তি না লেগে যায় সংসারে! তারচে’ একেবারেই অন্যরকম ভাবে কথাটথা শুরু করে, অতি সূক্ষ্মভাবে যদি কোনও আভাস ইত্যাদি পাওয়া যায়, বা কথা কিছুটা বের করা যায় তাহলে সাপও মরে লাঠিও ভাঙে না। এই পদ্ধতিতেই এগুবার চেষ্টা করল রেজা। হাসি হাসিমুখ করে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, আমি যতক্ষণ অফিসে থাকি, তুমি সময় কাটাও কী করে? রুবা তীক্ষ্ণচোখে স্বামীর মুখের দিকে তাকাল। হঠাৎ এই প্রশ্ন? কোনও কারণ নেই। মনে এলো বলে করছি। আমার সময় কাটা না কাটা নিয়ে তোমার কি কোনও আগ্রহ আছে? থাকবে না কেন? না থাকলে প্রশ্নটাই বা করছি কেন? তেইশ বছরে কোনওদিন দেখিনি এসব নিয়ে তুমি মাথা ঘামাও। তখন মাথা ঘামাবার সময় ছিল না। তাহলে এই বয়সে আর ঘামিয়ে লাভ কী? সময় কাটাবার সঙ্গে বয়সের কী সম্পর্ক? সম্পর্ক আছে। কী রকম, বল। একেক বয়সে একেক রকমভাবে সময় কাটায় মানুষ। অল্প বয়সী একটি মেয়ে কিংবা সদ্য বিবাহিতা একটি মেয়ে যেভাবে সময় কাটাবে আমার বয়সী একজন মহিলা নিশ্চয় সেভাবে সময় কাটাবে না। মহিলা তোমাকে মনেই হয় না। এখনও অল্প বয়সী মেয়েদের মতোই তুমি। সদ্য বিবাহিতাই মনে হয় তোমাকে। এই কারণে কি আমার সময় কাটানো নিয়ে তুমি চিন্তিত? এজন্যই কি প্রশ্নটা করলে? আরে না। আমার কিন্তু অমনই মনে হচ্ছে। না না। কোনও কারণ নেই। এমনিতেই বলছি। শুনে আমার খুব দুঃখ হচ্ছে। কেন? যখন এসব নিয়ে কথা বলার ছিল তোমার তখন ভুলেও কখনও বলনি যে তুমি যখন থাক না তখন কীভাবে সময় কাটে আমার। কাজের জন্য দিনের পর দিন ঢাকার বাইরে থেকেছ তুমি, ঢাকায় থেকেও সকালে বেরিয়ে ফিরেছ অনেক রাতে, তোমার এবসেন্সে কেমন থেকেছি আমি কোনওদিন জানতে চাওনি। অথচ আমি তখন অল্প বয়সী একটি মেয়ে। দেখতেও খারাপ ছিলাম না। ওই বয়সী বিবাহিতা মেয়েদের জীবনেও কত কী ঘটে যায় কিংবা ঘটে যেতে পারে। সংসারের কাজে যেভাবে বাইরে ছুটে বেড়াতে হয়েছে আমাকে, কত জায়গায় কত রকমের সমস্যায় পড়তে পারতাম কিংবা তোমার উদাসীনতার কারণে নিজেই ঝুঁকে যেতে পারতাম অন্যকারও দিকে। তা তুমি করতে না। কী করে বলছ? তোমার ওপর বিশ্বাস ছিল আমার। ছিল, এখন নেই? এখনও আছে। তাহলে জানতে চাইছ কেন আমার সময় কীভাবে কাটে? বললাম না, কোনও কারণ নেই। কিন্তু আমি তোমাকে বলব না আমার সময় কীভাবে কাটে? কেন? যে বয়সে আমি আশা করতাম আমার জীবনের খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয় তুমি জানতে চাইবে, বাইরে থেকে ফিরে অনেকটা সময় ধরে আমার সঙ্গে কথা বলবে, তোমার সব কথা আমাকে বলবে, আমি বলব আমার সব কথা, সেই বয়সে এসবের কিছুই আমি পাইনি। ঢাকার বাইরে থেকে কিংবা ঢাকায় থেকেও সারাদিন পর, গভীর রাতে এতই ক্লান্ত হয়ে ফিরতে তুমি, ফিরে কোনও রকমে ভাতটা খেতে তারপরই ঘুম। আমি খেয়েছি কি না সেই খবরটা পর্যন্ত নিতে না। প্রথম প্রথম তোমার সঙ্গে খাওয়ার আশায় বসে থাকতাম আমি। কোনও কোনওদিন রাত একটা দুটো বেজে যেত! এত খিদে লাগত আমার, সারাদিন সংসার সামলানো, এত ক্লান্ত লাগত! ঘুমে ঢলে পড়তাম, তবু ঘুমাতাম না। কিন্তু ফিরেই তুমি করতে কী হুমহাম করে নিজে খেতে শুরু করতে। বেশির ভাগ দিন আমাকে জিজ্ঞেসই করতে না আমি খেয়েছি কি না, খাব কি না! এত মন খারাপ হতো আমার। অভিমান করে খেতাম না। না খেয়ে তোমার পাশে শুয়ে থাকতাম। শুয়েই ঘুমিয়ে পড়তে তুমি কিন্তু খিদের কষ্টে আমার ঘুম হতো না। তোমার পাশে শুয়ে হাঁসফাঁস করতাম সারারাত। পরদিন সকালেও আমার মুখ দেখে তুমি কিছু বুঝতে না। ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো শুরু করতে। তোমার বেরুতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। নাশতা রেডি হলো কি না। নাশতা করতে বসেও কোনওদিকে তাকাতে না। কোনও রকমে নিজের খাওয়াটা শেষ করেই ছুটতে। আমার শরীর তখন বেশ ভাঙতে শুরু করেছিল। শাশুড়ি বুঝে গেলেন ব্যাপারটা। একদিন এসব নিয়ে আমাকে অনেক বোঝালেন। তারপর থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম আমি। তোমার জন্য আর অপেক্ষা করতাম না। তুমি কখন ফিরবে না ফিরবে ভাবতাম না। সময় মতো খেয়ে নিতাম। তোমার জন্য জেগে বসে থাকতাম না। এগারোটার দিকে ঘুমিয়ে পড়তাম। তুমি এলে অবশ্য উঠে তোমার খাবারটা দিতাম। গায়ে পড়ে নিজের কোনও কথাই তারপর থেকে তোমাকে আমি আর বলি না। অপু দিপু হওয়ার পর থেকে ছেলেদের নিয়ে আলাদা একটা জগৎ তৈরি হয়ে গেল আমার। ওদের নিয়ে নিজের মতো করে ভালোই ছিলাম আমি। ওরা চলে যাওয়ার পর এখন বেশ একাই লাগে আমার। রেজা বলল, তোমার অভিযোগগুলো ঠিক। কিন্তু আমার ওই সময়কার অবস্থাটাও তোমার বোঝা উচিত। কী বোঝা উচিত বল? যে পরিশ্রম আমি তখন করতাম, বিজনেস ছাড়া অন্যকোনও দিকে মনোযোগ দেয়ার সময় আমার ছিল না। বিজনেস পৃথিবীতে অনেক লোকই করে। তারা সংসারও করে। স্ত্রী সন্তানের দিকেও তাকায়। সব বাদ দিয়ে বিজনেস করতে তুমি ছাড়া আর কাউকে দেখিনি আমি। তোমার মতো স্বামীদের কারণে অনেক স্ত্রী বখে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। কেউ কেউ অন্যকারও সঙ্গে ইনভলবড হয়ে যায়। ডিভোর্স হয়ে যায়। তোমার সৌভাগ্য তেমন কিছু করিনি আমি। কিন্তু আমি তো এত পরিশ্রম করেছি তোমাদের কথা ভেবে। আমাদের কথা মানে? মা বাবা ভাই বোন, স্ত্রী সন্তান। হয়তো সবার কথাই ভেবেছ তুমি। শুধু আমার কথাই ভাবনি। ভাবিনি একথা বলছ কী করে? কোনও কিছুর কমতি তোমার আছে? শাড়ি, গহনা যখন যা লেগেছে, পেয়েছ। বাড়ি ফ্ল্যাট জমি গাড়ি সব হয়েছে। আর কী চাই? রুবা শ্লেষের হাসি হাসল। আর কী যে চাই সেকথা বোঝার ক্ষমতা থাকলে প্রশ্নটা তুমি করতে না। জীবন মানেই এসব নয়। আমার মনে হয় এসবই। না। এসব ছাড়াও জীবনের অনেক চাওয়া পাওয়া আছে। খুব ছোট চাকরি করেও স্ত্রী সন্তান নিয়ে অনেক সুখে আনন্দে থাকে কোনও কোনও মানুষ। টাকায় অনেক কিছু হয়, সব হয় না। যা হয় না, আমি আসলে সেসব বিষয়ে কথা বলতে চাইছি। আমার ধারণা আমি বুঝিয়ে বলার পরও ব্যাপারটা তুমি বুঝবে না। তোমার মতো পুরুষ মানুষের সংখ্যাই জগতে বেশি। এজন্য তাদের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা না বলাই ভালো। রেজা একটু নড়েচড়ে বসল। কিন্তু এখন তো আমি আর আগের মতো নেই। আমি আমার সেই জীবনটা বদলে ফেলেছি। দিনের কয়েকটি ঘণ্টা ছাড়া বাকি সবসময় আমি তোমার সঙ্গে। একসময় তোমাকে আমি সঙ্গ দিতে পারিনি, এখন সেই সঙ্গটা আমি তোমাকে দিতে চাই। কিন্তু তোমার সঙ্গ এখন আর আমি চাই না। রেজা অবাক হলো। বল কী? হ্যাঁ। তোমার সঙ্গ আমার আসলে ভালো লাগে না। কেন? দীর্ঘদিন তোমাকে ছাড়া থাকতে থাকতে আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। তুমি সঙ্গে থাকলে আমি বরং এখন বিরক্ত হই। এটা তোমাকে কাটাতে হবে। কেন? আমার সঙ্গ যাতে ভালো লাগে সেই অভ্যেস করে নাও। এখন আর তা হয় না। কেন হয় না? একবার কোনও ব্যাপারে মন উঠে গেলে নতুন করে সেখানে আমি আর মন বসাতে পারি না। আমার জীবন থেকে যা হারিয়ে গেছে তা আমি আর পাব না। রুবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রেজা বলল, তুমি খুব অন্যরকম মানুষ। আসলেই আমি খুব অন্যরকম মানুষ। নয়তো তোমার সঙ্গে সংসার করার কোনও কারণ ছিল না আমার। একটু চুপ করে থেকে রুবা বলল, আজ তোমাকে একটা গোপন কথা বলি। অপু যখন আমার পেটে, প্রথম সন্তান আসছে আমার, কনসিভ করার পর শরীর একটু বেশি খারাপ হয়েছিল আমার। অতিরিক্ত মাথা ঘুরত, অতিরিক্ত বমি করতাম। ঠিক সেই সময়টায় রংপুরের ওদিকে কোথায় যেন কাজ চলছে তোমার। সতেরো আঠারো দিন ধরে ওখানে পড়ে আছ। আমার সঙ্গে তখন তোমার মা ভাই বোনরা অনেকেই আছে। তবু আমি একা আমার রুমে থাকতাম। একা একা বমি করতে উঠতাম, একা একা গা পরিষ্কার করতাম। আমার সাড়া শব্দ পেয়েও তোমাদের কেউ আমাকে এতটুকু সাহায্য করতে উঠত না। দুঃখে অভিমানে রাতের পর রাত কেঁদেছি আমি। তারপর আমাদের বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। মার কাছে। সেখানে গিয়ে ডিসিসান নিয়েছিলাম বাচ্চা আমি নেব না। ওয়াশ করে ফেলব। রেজা একেবারে অাঁতকে উঠল, বল কী? হ্যাঁ। শুধু তাই নয়। তোমার সংসারেও আমি আর কখনও ফিরব না। ডিভোর্স করব তোমাকে। হা করে রুবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল রেজা। রুবা বলল, কিন্তু কিছুই করা হলো না আমার। রেজা গম্ভীর গলায় বলল, কেন? আমার মায়ের জন্য। মা আমাকে অনেক বোঝালেন। সন্তান এলে অবস্থাটা বদলাবে। তাকে নিয়ে সময় কেটে যাবে তোর। তাছাড়া নিয়তি বলে একটা কথা আছে। নিয়তিকে মেনে নেয়াই ভালো। আমি আমার নিয়তিকে মেনে নিলাম। আবার ফিরে এলাম তোমার সংসারে। আশ্চর্য ব্যাপার, এসব নিয়ে আমাকে কখনও কিছু বলনি তুমি। বললে কী হতো? আমার জীবনযাপন কিংবা বিজনেসের পদ্ধতি নিয়ে শুরু থেকেই যদি তুমি বলতে, বা তুমি যেমন করে আমাকে চাও তাও যদি বলতে আমি হয়তো সব বদলে নিতাম। তুমি যা চাও তাই করতাম। এখন বলছ, কিন্তু তুমি তা করতে না। কী করে বলছ এ কথা? তোমাকে আমি যতটা বুঝি, তাতেই বুঝতে পারছি। বলে আমার কোনও লাভ হতো না। উল্টো ঝগড়াঝাটি হতো, অশান্তি হতো সংসারে। হতো না। অনেক স্ত্রী আছে যারা স্বামীর যে সমস্ত ব্যাপার পছন্দ করে না সেসব নিয়ে কথা বলে। আমি ওই ধরনের মহিলা নই। আমি মনে করি কেউ যদি হৃদয় দিয়ে আমাকে ফিল করে তাহলে আমি কী চাই তা সে বুঝতে পারবে না। সে ফিলই করবে না হাজার বার তাকে বলেও আমার কোনও লাভ হবে না। আমি কেন ওই নিয়ে কথা বলব! অশান্তি বা ঝগড়াঝাটি করে কিছু হয় না। অশান্তি বা ঝগড়াঝাটি আমি তোমার সঙ্গে করতাম না। আমার মনে পড়ে না বড় রকমের কোনও অশান্তি তোমার সঙ্গে আমার হয়েছে। দুর্ব্যবহারও আমি তোমার সঙ্গে করিনি। করনি না, করতে পারনি। কেন? অশান্তি করার কোনও স্কোপ আমি তোমাকে দিইনি। যে সব বিষয়ে কথা বলতে গেলে অশান্তি হবে আমি সবসময় তা এড়িয়ে চলেছি। মা আমাকে বলে দিয়েছিলেন একবার যে জীবনে জড়িয়েছিস তা মেনে নেয়াই ভালো। ওই জীবন থেকে বেরুতে গেলে দেখবি জীবন আরও জটিল মনে হবে। তারপর থেকে ভেতরে ভেতরে নিজেকে আমি সত্যি খুব গুটিয়ে নিয়েছি। আমার নিজস্ব আবেগ অনুভব, একান্ত বিষয়গুলো, মেয়েরা স্বামীকে যা বলে, আমি কখনও আর তোমাকে তা বলি না। আমি আমার মতো করে থাকি। রুবার কথা শুনে রেজা খুবই হতভম্ব হয়েছে। কী কথা জানার জন্য স্ত্রীকে নিয়ে বিকেলবেলা চা খেতে বসল সে, জানল সম্পূর্ণ অন্যধরনের কিছু কথা। যা সে কখনও কল্পনাই করেনি। একসঙ্গে দীর্ঘ জীবন ধরে থেকেও একজন মানুষ কিছুতেই জানতে পারে না আরেকজন মানুষের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা আবেগ, অনুভূতি, অনুপুঙ্খ চাওয়া পাওয়া। একান্ত কিছু বিষয় থেকেই যায় মানুষের। অন্যকেউ সেই বিষয়ের ধারে কাছেও পৌঁছাতে পারে না। রুবা বলল, কুড়ি একুশটি বছর ধরে এভাবে চলতে আমি অভ্যস্থ হয়ে গেছি। প্রথম প্রথম খুব অসুবিধা হতো। নিজের অনেক কথা তোমাকে বলতে খুব ইচ্ছে করত, খুব ছটফট করতাম ভেতরে ভেতরে, তবুও বলতাম না। অতি কষ্টে চেপে রাখতাম। দিন যত গেল এই চেপে রাখাটাই আমার অভ্যেস হয়ে গেল। একটু থামল রুবা। তারপর বলল, চেপে রাখার কথা বলাতে তোমার মনে হতে পারে সত্যি হয়তো চেপে রাখার মতো অনেক কিছু আমার আছে। অনেক গোপন অন্যায় ব্যাপার। তুমি যদি ভাবও আমার কিছু যাবে আসবে না। তবে আমার দিক থেকে আমি শুধু তোমাকে একটি কথা বলতে পারি, এসব ব্যাপারে কখনও কোনও অন্যায় আমি করিনি। আমার কোনও অন্যায় নেই, কোনও পাপ নেই। আমি আমার নিজের কাছে অত্যন্ত পরিষ্কার, অত্যন্ত সৎ। আর তেইশ বছরেও তুমি যে কথাটি জাননি, আজ তাও তোমাকে বলি, তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না কিন্তু কথাটা সত্য, আমি কখনও মিথ্যে বলি না। জেনে বুঝে কখনও মিথ্যে বলি না আমি। যা বলি, পরিষ্কার সত্য। এই সুযোগটা নিল রেজা। বলল, তুমি কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? রুবা মৃদু হাসল। আগে বল। শুনে দেখি বিশ্বাস করার মতো কি না। তুমি যে কখনও মিথ্যে বল না এটা আমি জানি। কীভাবে জান? নানা রকমভাবে তোমাকে আমি পরীক্ষা করে দেখেছি। আমি টের পাইনি। তা তোমার পাওয়ার কথাও নয়। খুব সূক্ষ্মভাবে কাজটা আমি করেছি। তাই নাকি? খুবই অবাক হলে মনে হয়? তা হয়েছি। কেন? তোমার যে কোনও সূক্ষ্ম ব্যাপার আছে এ আমার জানা ছিল না। তুমি অত্যন্ত ভোঁতা এবং মোটা দাগের মানুষ। কন্ট্রাক্টরি করার ফলে শুধু টাকাটা চেন। কিছু অশিক্ষিত, টাকাওয়ালা ফালতু লোকের সঙ্গে ওঠবস। খবরের কাগজটা পর্যন্ত পড় না। সূক্ষ্ম অনুভূতি থাকার কথা তোমার নয়। চালাকি থাকতে পারে। সূক্ষ্মভাব আর চালাকি আলাদা ব্যাপার। রুবার কথাগুলো বেশ অপমানকর। তবু তা গায়ে মাখল না রেজা। মুখ টিপে হাসল। চালাকি করে হলেও তো জেনেছি, না? জেনে কোনও লাভ হয়েছে? হয়েছে। কী লাভ বল? আগের লাভের কথা বলব না, আজকেরটা বলব। বল। লাভটা এখনও হয়নি। হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বলব। চোখ তুলে রেজার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল রুবা। তারপর বলল, তোমার কথা আমি বুঝেছি। কী বুঝেছ বল। একটা বিষয়ে তুমি আমার কাছে এখন জানতে চাইবে। ঠিক বলেছ। তুমি খুবই ইনটেলিজেন্ট। কিন্তু তুমি অতি বোকা একটি লোক। কেন? ভাবলে কী করে যে তোমাকে আমি তা বলব? মানে? বিকেলে তুমি যখন এখানে বসে চা খাওয়ার কথা বললে তখুনি আমি বুঝেছি তুমি আমার কাছে কী জানতে চাইবে। রেজা খুবই থতমত খেল। আশ্চর্য ব্যাপার! আশ্চর্যের ব্যাপার নয়, সরল ব্যাপার। বেশ কিছুদিন ধরে আমার ব্যাপারে তোমার কিছু মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে, যা এই বয়সে শুরু হওয়ার কথা নয়। যখন হওয়ার কথা ছিল তখন তুমি ছিলে উদাস, এখন ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ ধরনের স্বভাব হয়েছে। এজন্য খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা কর, তুমি যখন বাড়িতে না থাক তখন আমি কী করি, কোথায় যাই। হয়তো বাড়িতে ফোন করে দেখ আমি আছি না বাইরে গেছি। কিছুদিন ধরে প্রায়ই বাইরে যাই আমি। সেই ফাঁকে তুমি আমাকে ফোন করে পাও না। বাড়ি ফেরার পর ভাব, কোথায় গিয়েছিলাম তোমাকে আমি তা বলব। বেশ কয়েকদিন দেখার পর বুঝলে না আমি নিজ থেকে বলব না, তখুনি কথা বের করার জন্য আজকের এই চালাকিটা করলে। কিন্তু তুমি এতই বোকা, বুঝলেই না যে যত চেষ্টাই কর কথাটা আমি তোমাকে বলব না। বললে আগেই বলতাম। কিন্তু এটা তো অন্যায়। কীসের অন্যায়? আমাকে না বলে কোথাও তোমার যাওয়া উচিত নয়। কেন? এটা স্ত্রীর কর্তব্য। কী ধরনের কর্তব্য? সে কোথাও গেলে স্বামীকে বলে যাবে, কিংবা ফিরে এসে বলবে কোথায় সে গিয়েছিল। শুধু স্ত্রীরই কি এইসব কর্তব্য থাকে? স্বামীদের থাকে না? তুমি প্রতিদিন কোথায় যাচ্ছ, কী করছ আমি কি তা জানি? আমাকে কি তুমি তা বল? বলার প্রয়োজন হয় না দেখে বলি না। আমারও বলার প্রয়োজন হয় না দেখে আমিও তোমাকে বলি না। কিন্তু আমি যখন তা জানতে চাইছি তখন তোমার তা বলা উচিত। না জানতে চাইলেও হয়তো তোমাকে আমি একদিন বলতাম। এখন আর বলব না। কেন? তোমার এই চালাকির জন্য। তবে আমার মনে হয় আমাকে না বলে তুমি ভুল করবে। কীসের ভুল? আমি তোমাকে সন্দেহ করতে পারি। পার মানে কী? সন্দেহ তুমি করছই। সন্দেহ না করলে চালাকির আশ্রয়টা তুমি নিতে না। সরাসরি আমার কাছে জানতে চাইতে প্রায়ই সাড়ে দশটা এগারোটার দিকে কোথায় যাই আমি। দেড়টা দুটো পর্যন্ত কোথায় থাকি। সরাসরি জানতে চাইলে তুমি বলতে? সব হয়তো বলতাম না। বললেও তুমি বুঝতে না। কিছুটা বলতাম। রুবা উঠল। এখন আর কিছুই বলব না। কোনওদিন বলব না। রুবা বেডরুমের দিকে চলে গেল। [চলবে]
 
 
 
     
[Back]  
Untitled Document
 
 
Designed & Developed by Doshdik Media Ltd.
Japan address:
Akiba Mitaki-kan, 4F,Sotokanda 4-5-5,Chiyoda-ku,Tokyo 101-0021, Japan
Phone: +81-3-3255-5861 Fax: +81-3-3255-5862 E-mail: info@doshdik.com
Bangladesh Address:
House# 2, Road# 7, Sector# 3, Uttara Model Town, Dhaka-1230, Bangladesh Phone: +880-2-8919351,
+880-2-8956608,Fax: +880-2-8963402,E-mail: info@doshdik.com
Home | About Us| Advertise | Terms & Conditions| Contact Us
©Doshdik Media Limited. All rights reserved.