Untitled Document
Make Doshdik your homepage
Untitled Document
 
 
 
You are visitor number 84773You are visitor number 84773You are visitor number 84773You are visitor number 84773You are visitor number 84773
 
     
 
2010-01-20
ইয়ূকি একটি মেয়ের নাম (পর্ব ২য়)
 
  ড. এরশাদ উল্লাহ  
  ইয়ামামোতো বলল, সম্ভবত তখন কোজিমাসান বুঝতে পারলেন যে তিনি আইন ভঙ্গ করে ভারতের ভিতরে চলে এসেছেন। তারপর সে ঘর থেকে বের হয়ে আমাকে বলল, চলো ফিরে যাই।
জানতে চাইলাম, তোমাকে কিছু বলেনি?
হাসলো ইয়ামামোতো, তারপর বলল, পুলিশটি আমাকে সম্ভবত তার সন-ান মনে করেছিল। সে আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। তারপর আমরা পশ্চিম দিকে হাঁটতে লাগলাম। তখন সন্ধ্যা হয়েছে। মাসুদের ওখানে পৌঁছার পর দেখি সন্ধ্যা সাতটা বাজে। ঠিক আছে, আর বলতে হবে না। আমি স্বসি-র নিঃশ্বাস নিয়ে ইয়ামামোতোকে থামালাম। তারপর নিজে নিজে খুব হাসলাম।
বললাম, বড় বাঁচা বেঁচে গেছো। এখন হাতমুখ ধুয়ে খেতে যাও।
ব্যাপার হলো জাপান একটি দ্বীপমালার দেশ যে কারণে সে দেশের জনসাধারণ বর্ডার লাইন চেনে না। তাই বর্ডার দেখতে কেমন তা দেখার আগ্রহ বেশি।
বর্ডার লাইন কেমন দেখলেন? কোজিমাসানকে জিজ্ঞেস করার পর তিনি যা উত্তর দিলেন তা শুনে না হেসে থাকতে পারলাম না।
উত্তরে বললেন, বর্ডার লাইনে তো কোনো বাউন্ডারি ওয়াল দেখলাম না।

দুই

জাপানে ফিরার সময় কোজিমাসান আমার স্ত্রীর সাথে সারা পথ কথা বলেছেন।
কয়েক দিন পরে আমার স্ত্রী বলল, তুমি তো জানো না এই কোজিমা সানের জীবন কাহিনী কত করুণ। তাঁর শৈশবের কাহিনী শুনলে তুমি তাঁকে নিয়ে একটি বই লিখতে পারবে। কোজিমাসানের জীবন কাহিনী বড় হৃদয়বিদারক।
কয়েক দিন পরে এক অবসর মুহূর্তে আমার স্ত্রী আমাকে কোজিমাসানের সব কাহিনী খুলে বলেছিল।
জাপানের দক্ষিণে কিউশু অঞ্চলে কাগোশিমা-প্রিফেকচারের অন-র্গত সমুদ্রতীরবর্তী একটি গ্রাম্যবন্দর রয়েছে নাম ‘হিয়োশিমুরা’। সে গ্রামের সাইতো পরিবারটিকে নিয়ে এ কাহিনী রচিত হয়েছে। তা ছিল তিনজনের সংসার, তার স্ত্রী আকিকো ও তাদের নয় বৎসর বয়সের কন্যা ইয়ুকি।
জাপানের দক্ষিণে অবসি'ত কাগোশিমা সুস্বাদু মিষ্টি আলুর জন্য বিখ্যাত। সেই গ্রামে ওকিনাওয়া থেকে এক বৎসর পূর্বে সাইতোসান এসে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে স্ত্রী ও তাঁর মেয়ে ইয়ুকিকে রেখে যায়। সাইতো একজন সৈনিক ছিল। ওকিনাওয়া আক্রান- হওয়ার পূর্বে সে তাঁর পরিবারটি হিয়োশি গ্রামে রেখে আবার ওকিনাওয়াতে চলে যায়। তারপর পাঁচ মাসের মাথায় ইয়ুকির মা একটি চিঠি পেয়ে চিৎকার করে কান্না শুরু করল। সারাদিন সেদিন সে ইয়ুকিকে বুকে চেপে ধরে কাঁদল। ইয়ুকিকে বলল, তোর বাবা আর বেঁচে নেই, ওকিনাওয়াতে মারা গেছে।
তার কিছুদিন পরে কাউন্সিল অফিস থেকে মহিলাকে কিছু টাকা ও একটি সার্টিফিকেট দিল। তাতে ইয়ুকির বাবা সাইতোসানের একটি ছবি আঁটা রয়েছে। ইয়ুকি তখন ৩য় শ্রেণীর ছাত্রী। কিন' ওকিনাওয়া আক্রান- হওয়ার পরে তার স্কুলটি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
সে গ্রামের অনেকেই তাঁদের স্বজনের মৃত্য সংবাদ পেয়েছে। ইদানিং মৃত্যু সংবাদ এই গ্রামের লোকদের মাঝে একটি সাধারণ ব্যাপার। প্রতিবেশীরা এসে ইয়ুকির মাকে সান-না দিয়ে বলেছে, দেশের স্বার্থে প্রাণ দিয়েছে, তাতো বড় গর্বের কথা। কেঁদে কোনো লাভ নেই। এখন আমাদের দেশ যেন যুদ্ধে জয়লাভ করে সে প্রার্থনা করো।
দু’বছর পূর্বে দক্ষিণ পাড়ার আদাচিসান গোয়াডালন্যানালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর বৌ বেশ সুন্দরী, তাঁর কোনো সন-ানাদি নেই, অল্প বয়স, স্বামী বিয়ের ছ’মাস পরে যুদ্ধে গেল, আর ফিরল না । আদাচির বৌ এখন সেনাবাহিনীর স্বার্থে কাজ করছে। এই কথাটা ইয়ুকির মাকে বলল সুজুকির মা।
সেনাবাহিনীর স্বার্থে কাজ করছে, এর মানে কি?
জবাবে সুজুকির মা বলল, সেনাবাহিনীর জোয়ান পোলারা প্রাণপণ যুদ্ধ করছে দেশরক্ষা করার জন্য। তাদের ভোগ-বিলাসের জন্য সুন্দরী কম বয়সী বৌ যারা তাদের স্বামী হারিয়েছে, তাদেরকে এজেন্টেরা পটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারা বলেছে, আমাদের জোয়ানদের জন্য তোমার মতো মহিলার প্রয়োজন। তাছাড়া তোমার স্বামী যখন মারা গেছে সে তো আর ফিরবে না। তোমার এত সুন্দর রূপ যৌবন আমাদের জোয়ানদের জন্য বিলিয়ে দাও।
তাই বলে তাদের কথায় আদাচিসানের বৌ চলে গেল? ইয়ুকির মা জিজ্ঞাসা করল।
--চলে যাবে না তো ঘরে বসে থেকে লাভ কি। বয়স তার মাত্র কুড়ি, জোয়ানরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণ দিচ্ছে, মহিলারদের কি কিছুই করার নেই?
চমকে উঠল ইয়ুকির মা। বুড়ির কথা শোনে তার গলা শুকিয়ে গেল। তারপর ঢোক গিলে বলল, আপনি আমাকে এসব কথা শোনাচ্ছেন কেন?
--বলছি এই জন্য যে তোমার বয়স তো কম। সমস্যা শুধু তোমার এই মেয়েটা। কথা শেষ করার পূর্বেই ইয়ুকির মা বলল, তাহলে আপনিও এজেন্টদের পক্ষে কাজ করছেন?
--না, না, কাজ করি কথাটা ঠিক নয়। আমি শুধু তোমাকে আদাচির বৌয়ের কথাটা বললাম। ভালোমন্দ এখন তুমি চিন-া করে দেখো।
এবার ইয়ুকির মা রেগে বলল, না, আপনি আর আমার কাছে আসবেন না। আমার ইয়ুকিকে নিয়ে আমি জনম কাটাতে পারবো। মনে রাখবেন যে আদাচিসানের বৌয়ের মতো মেয়ে আমি নই।
সুজুকির মা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এত রাগ দেখাও কেন। ভালো করে চিন-া করে দেখো, সেটাও একটা কাজ, তাছাড়া মাসহারাও পাবে।
ইয়ুকির মা আরো রেগে গিয়ে বলল, এখান থেকে যান আপনি, এক্ষুণি চলে যান বলছি। সুজুকির মার কথাগুলো রাতে ঘুমাবার আগ পর্যন- ইয়ুকির মায়ের কানে মেশিনগানের ঠাঃ ঠাঃ ঠাঃ ঠাঃ শব্দের মতো বাজছিল। রাগে এবং স্বামীর মৃত্যুর শোকে রাতে সে কিছুই খেতে পারলো না। সকালে উঠে ইয়ুকিকে বুকে চেপে ধরে বলল, ইয়ুকি কাল আমি শহরে যাবো, সঙ্গে যাবি?
যাবো মা। আমাকে একা ফেলে তুমি কোথাও যেও না।
পরের দিন সকালে একটি পৌলট্রি ফার্মে ইয়ুকির মার কাজ হলো। বাসে করে প্রতিদিন কাজে গেলে তার পোষাবে না। তাই সাইকেলে দশ কিলোমিটার পথ যাবে মনস' করল। সকালে ইয়ুকিকে কোনো প্রকারে বুঝিয়ে ঘরে রেখে প্রতিদিন এখন কাজে যায় ইয়ুকির মা।
তারপর কয়েক মাস ভালোই যাচ্ছিল মা ও মেয়ের। প্রথম মাসের বেতন হাতে নিয়ে ঘরে ফিরে এসে ইয়ুকিকে বলল, আমাদের আর কোনো চিন-া করতে হবে না ইয়ুকি। নিয়মিত কাজ করলে আমাদের ভাত কাপড়ের কোনো অভাব হবে না।
ইয়ুকি বলল, আমাদের স্কুল কবে খুলবে মা?
মেয়ের এই প্রশ্নের কি জবাব দিবে সে ভেবে পাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ চিন-া করে বলল, এই তো আর মাস খানেক পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। যুদ্ধ কি আর চিরদিন থাকবে?
কথাটা বলে আবার নতুন ভাবনায় পড়ল ইয়ুকির মা। মনে মনে ভাবছিল, যুদ্ধ থামলে কি আর না থামলেওবা কি, ইয়ুকির বাবা তো আর ফিরে আসবে না। তাছাড়া দেশে যে অভাব দেখা দিয়েছে ভাবতেও খারাপ লাগে, আজকাল বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার পর্যন- পাওয়া যায় না। আর হাতে টাকা থাকলে কি হবে, যদি বাজারে আটা চাউল পাওয়া না যায়? ফার্মের একজন মহিলা বলেছে যে তিন দিন আগে দূরের শহরগুলো থেকে ব্যবসায়ীরা এসে বাজারে সব আলু, গম, চাউল কিনে নিয়ে বন্দরের জাহাজ বোঝাই করে নিয়ে গেছে। আনেকে বলেছে ওসাকা এবং টোকিও থেকে পাইকাররা এসে সব কিনে নিয়ে যায়। এই সব ভাবনায় ইয়ুকির মায়ের মনে আতঙ্ক দেখা দিল। মাঝে মাঝে সে ইয়ুকিকে জড়িয়ে শুধু কাঁদে।
--তুমি কাঁদো কেন মা?
--না, কই কাঁদিনি তো?
--না, তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদো আমি দেখেছি।
--সামান্য কাঁদলে আর কী দোষ ইয়ুকি। তুই কিছু মনে করিসনে। মাঝে মাঝে তোর বাবার কথা যখন মনে পড়ে তখন আমার কেন জানি কান্না আসে।
--আচ্ছা মা, আমি শুধু ভাবছি বাবার লাশটা নিয়ে আসছে না কেন? পূর্ব পাড়ার সাইয়োরির বাবার লাশ এনে দিয়ে গেল সেদিন। তার বাবার লাশ পুড়িয়ে ছাইগুলো ঘরে এনে রেখেছে। উনচল্লিশ দিন পরে এগুলো কবরে রাখবে সাইয়োরি আমাকে বলেছে।
মেয়ের এই কথার কি উত্তর দিবে কিছু খুঁজে পেল না ইয়ুকির মা। কিছুক্ষণ পরে বলল, যুদ্ধ শেষ হলে একদিন নিশ্চয়ই তোর বাবার লাশ নিয়ে আসবে। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, সাইয়োরি যখন তার বাবার লাশের কথা বলছিল, তখন সে খুব কেঁদেছে, তাইনা ইয়ুকি?
ইয়ুকি বলল, কি যে বলো তুমি! সাইয়োরি খুব কেঁদেছে। কাল যখন তুমি কাজে গেলে তখন সাইয়োরি ও আমি স্কুলের কাছে যে বড় গাছটা আছে, সেটার শিখরের উপরে দুজনে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছি।
--কি বললি, তুই আমার অগোচরে কেঁদেছিস? সে কথা ভাবতেও আমার খারাপ লাগে। এখন আমার সাথে প্রতিজ্ঞা কর ইয়ুকি, তুই আর কোনোদিন আমার অগোচরে কাঁদবি না। এই বলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে নিজের অজানে-ই কিছুক্ষণ কাঁদল ইয়ুকির মা। ইয়ুকি মায়ের কান্না দেখে বলল, মা, তুমিও আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করো আর আমার সামনে কাঁদবে না।
--না, আর আমি তোর সামনে কাঁদবো না, প্রতিজ্ঞা করলাম। মাস খানেক পরে সবাই লক্ষ করল যে আজকাল আমেরিকার যুদ্ধবিমানগুলো হিয়োশি গ্রামের উপর দিয়ে বিকট আওয়াজ তুলে উড়ে যায়।
একদিন ইয়ুকি বলল, যুদ্ধবিমান দেখলে আমার বড় ভয় লাগে মা। --পাগল নাকি! ইয়ুকির মা মেয়েকে সান-্বনা দিয়ে বলল, গ্রামের উপর দিয়ে গেল তো কি হলো? সেগুলো তো আর আমাদের গ্রামে বোমা ফেলবে না।
--সত্যি বলছো মা?
--অবশ্যই সত্যি বলছি। তারা গ্রামে বোমা ফেলে পাবলিক মারবে কেন? এরা সম্ভবত আমাদের জাপানি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিগুলোর উপর হামলা করতে আসে।
--তাহলে আমাদের কি হবে মা? আতঙ্কিত কন্ঠে ইয়ুকি জানতে চাইল।
--এখন কী আর হবে। যখন আমাদের সেনাবাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে বোমা ফেলতে যাবে তখন আমাদের সেনাবাহিনী সেগুলোকে একটার পর একটি করে গুলি করে ফেলে দিবে। তাছাড়া আমাদের সেনাবাহিনী অনেক সাহসী এবং শক্তিশালী। শত্রুপক্ষের কোনো যুদ্ধবিমান তাদের ক্ষতি করতে পারবে না।।
মায়ের সান-্বনার কথা শুনে ইয়ুকি দীর্ঘশ্বাস নিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তাহলে আমার বাবাকে তারা কি করে হত্যা করল বলো?
এবার মেয়ের এই প্রশ্ন শোনে সমস্যায় পড়ল ইয়ুকির মা।
--মা বলছো না কেন আমার বাবাকে তারা কি করে হত্যা কর? ইয়ুকি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
--বাবার চিঠি কেন আসে না? বাবার লাশ নিয়ে আসছে না কেন? ইয়ুকি দুহাতে মায়ের কাঁধে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, বলো মা বাবার লাশ কেন নিয়ে আসছে না?
ইয়ুকির মা সেদিন মেয়ের এই শক্ত প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারল না। নীরবে শুধু কাঁদল কিছুক্ষণ।
১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে পৌলট্রি ফার্মের উপর বোমা ফেলল আমেরিকার যুদ্ধবিমান। দাউ দাউ করে ফার্মটি নিমেষে জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেল। দুই হাজার মুরগী আর সাতজন কর্মচারী সেখানে মারা গেল। তাদের মধ্যে ইয়ুকির মাও একজন। ইয়ুকিকে স'ানীয় ভলান্টিয়াররা এসে জীপে উঠিয়ে নিয়ে গেল। চিৎকার করতে করতে ইয়ুকি ফার্মের কাছে গেল। দমকল বাহিনী ততক্ষণে আগুন নিবিয়েছে। পোড়া গন্ধে তখন ফার্মটির কাছেও ঘন্টাখানেক কেউ যেতে পারল না।
ভলান্টিয়াররা ইয়ুকিকে নিয়ে লাশ সনাক্ত করতে চেষ্টা করতে লাগল। কিন' কোনো লাশ কেউ সনাক্ত করতে পারল না। ইয়ুকি এতদিন তার বাবার লাশ নিয়ে আসছে না কেন সেকথা সে বার বার তার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। কিন' তার ভাগ্য যে তার সাথে এমনভাবে প্রতারণা করবে সেকথা এই অবুঝ শিশুটি কখনো ভাবেনি। বাবার লাশ তো দূরের কথা, আজ হতভাগী এই মেয়েটি তার জীবনে প্রথম এমন এক চিরন-ন সত্যকে আবিষ্কার করল যা সে কখনো ভাবতেও পারেনি। কী দুর্ভাগ্য আজ সে তার নিজের মায়ের লাশটাও সনাক্ত করতে পারল না, বোবার মতো বসে রইল সে। তার মুখের কথাও বন্ধ হয়ে গেল। ভলান্টিয়াররা তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করল, কিন' ইয়ুকি তাদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। রাতে সে ভলান্টিয়ার ক্যাম্পে রইল। সেদিন রাতের খাবারও তাকে কেউ খাওয়াতে পারল না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ইয়ুকি প্রথম কথা বলল, আমি ঘরে ফিরে যাবো। আমাকে আপনারা ঘরে দিয়ে আসেন।
সেদিন ভলান্টিয়াররা সবাই মিটিং করল। এতিম ইয়ুকিকে তার ঘরে দিয়ে আসা আদৌ সঙ্গত হবে কিনা সে ব্যাপারে তারা কথা বলছিল। কয়েক মাস আগেও শিশুদের রাখার জন্য নির্দিষ্ট স'ান ছিল। কিন' বোমায় একসঙ্গে বেশি শিশু মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে শিশুদের আর সেখানে রাখছে না।
ইয়ুকি আবার বলল, দয়া করে আপনারা আমাকে আমার ঘরে দিয়ে আসেন। --ঘরে তুমি একা থাকতে পারবে তো? একজন ভলান্টিয়ার জিজ্ঞসা করল। --হ্যাঁ, একলা থাকতে পারবো। রাতে আমি পাশের বাড়ির খালার ঘরে গিয়ে ঘুমাবো। ভলান্টিয়াররা দেরি না করে ইয়ুকিকে তার ঘরে দিয়ে গেল। পাশের বাড়ির মহিলাকে বলল, ইয়ুকির প্রতি একটু নজর রাখবেন। আমরা প্রতিদিন তার খাবার নিয়ে আসব। এইভাবে সাপ্তাহখানেক গেল। এদিকে পরিসি'তিও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। ইয়ুকি সারাদিন মা মা বলে কাঁদে রাতে তার পড়শী খালার বাড়িতে ঘুমায়। এদিকে যুদ্ধের প্রচন্ডতা দিনের পর দিন বাড়ছেই। স্বেচ্ছাসেবী ভলান্টিয়ারদের মনোবল ধীরে ধীরে ভেঙ্গে গেল। তারা এতদিন এদিক সেদিক থেকে খাবার সংগ্রহ করে অনাথ শিশুদের দিয়েছে। এখন মনোবল হারিয়ে তারা বিভিন্ন দিকে চলে গেছে। তারা আর ইয়ুকির খাবার নিয়ে প্রতিদিন আসে না। পাশের বাড়ির খালার ছেলেটি ‘কামিকাজে’ বিমান যোদ্ধা ছিল। আজ একটি চিঠি এলো তাঁর কাছে। তাতে লিখা আছে, ‘দেশের স্বার্থে আপনার ছেলে বীরের মতো প্রাণ দিয়েছে। তার এই আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না।’
চিঠি পড়ে বুক ফাটা কান্না এসে মহিলার মুখ স-ব্ধ করে দিল। তিনি পাথরের মতো কিছুক্ষণ বসে রইলেন। ইয়ুকি এসে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে খালা, তুমি চুপ করে আছো কেন?
মহিলা কোনো উত্তর না দিয়ে ইয়ুকিকে বুকে চেপে কাঁদতে লাগলেন।
ভলান্টিয়াররা এখন ইয়ুকির খাবার নিয়ে আসে না। একদিন খালা বললেন, ইয়ুকি তুমি অন্য কারো বাড়িতে থাকো আমি আগামীকাল গ্রাম ছেড়ে আমার মারের নিকট চলে যাবো। যদি তুমি আমার সাথে যেতে চাও, তোমাকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাবো। কারণ এ গ্রামে আমার ভালো লাগছে না।
খালার প্রস-াবে ইয়ুকি রাজি হল না। বলল, খালা আমি সাইয়োরিদের বাড়িতে চলে যাবো। মহিলা বললেন, ভালো করে চিন-া করে দেখো সাইয়োরিদের বাড়িতে তোমাকে থাকতে দেবে কি না।
--থাকতে যদি না দেয় তাহলে আমাদের ঘরে আমি একেলাই থাকবো। খালা আমার জন্য আপনি কোনো চিন-া করবেন না।
--ঠিক আছে তাই করো।
পরের দিন পুর্ব পাড়ার সাইয়োরিদের বাড়িতে গেল ইয়ুকি। সাইয়োরির মা বললেন, আমাদের সাথে থাকতে চাও তো থাকো। কিন' আমাদের ঘরে দুদিন যাবত খাবার মতো কিছু নেই। বলতে গেলে আমরা উপোস করছি। আলুর লতি সস্‌ দিয়ে সিদ্ধ করে খাচ্ছি।
ইয়ুকি বলল, কি বললেন খালা আপনাদের ঘরে খাবার নেই?
--নারে মা, নেই।
সে তৎক্ষণাৎ সাইয়োরির হাত ধরে বলল, সাইয়োরি আমার সাথে চল, আমাদের ঘরে কিছু চাউল ও আটা আছে, সেগুলো তোদের ঘরে নিয়ে আসব। রান্না করে আজ রাতে সবাই মিলে খাবো।
সাইয়োরি যেতে রাজি হল। এই দুটি শিশু তাদের কঠিন জীবনের মূল্যবোধ কতটুকু বুঝতে পারল জানি না, তবে তারা তাদের জীবন সংগ্রামে নেমে দৌড়ে পশ্চিম পাড়ায় ইয়ুকিদের ঘরে এসে খুঁজে সের পাঁচেক চাউল ও সের তিনেক আটা পেল। এসব দেখে ইয়ুকি সাইয়োরিকে বলল, মা প্রথম মাসের বেতন পেয়ে এগুলো কিনে এনেছিলেন। তারপর ভাগাভাগি করে দুজনে দুবারের মাথায় দৌড়ে এসে সেগুলো সাইয়োরিদের ঘরে নিয়ে গেল।
সাইয়োরির মা সেগুলি দেখে অবাক হয়ে বললেন, ইয়ুকি এ্যাত খাদ্য তোমাদের ঘরে ছিল!
--হ্যাঁ ছিল। মা প্রথম মাসের বেতন পেয়ে এগুলো কিনে এনে বলেছিলেন যে, বাজার থেকে নাকি খাদ্যদ্রব্য উধাও হয়ে যাচ্ছে, তাই কিছু বেশি কিনে এনেছিলেন।
--তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করি মা। তোমার মা সত্যি কথাই বলেছিলেন। আমাদের হাতে টাকা আছে, কিন' বাজারে আলু পর্যন- পাওয়া যায় না।
সে রাতে সাইয়োরি ও ইয়ুকি একসাথে বিছানায় শুয়ে দুজনে কন্ঠ মিলিয়ে একটি গান গাইল: :
তোরিইয়াঞ্ছে তোরিইয়াঞ্ছে
কোকো ওয়া দোকো নো হোসোমিচি য্যা
তেন্‌জিন-সামা নো হোসোমিচি য্যা
চিইতো তো অসিতে কুদাশানোছে
গোইয়ু নো নাই মনো তোঅশা ছেনু
কোনো কো নো নানাৎসু নো অইওয়াইনি
অ ফুদা অ অসামে নি মাইরিমাৎসু ইকি ওয়া ইয়োই ইয়োই, কায়েরিওয়া কোওয়াই
কোওয়াই নাগারা মো তোরিইয়াঞ্ছে, তোরিইয়াঞ্ছে
এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও
কোাথায় গিয়েছে এ সরু পথ
এটা যে তেন্‌জিন মন্দিরের পথ।
দয়া করে যেতে দিন যেতে দিন
বিনা কাজে সেথা কেউ যেতে পারে না
এই শিশুটির এখন সাত বৎসর
তাই তার উৎসব উদ্‌ যাপন করতে যাচ্ছি
যাওয়া বড় সহজ কিন' ফিরতে লাগে ভয়
ভয় যদি থাকেও এগিয়ে যাও এগিয়ে যাও
ইয়ুকি সাইয়োরির সাথে দিনকয়েক হেসে কেঁদে ভাালেই ছিল। ১৯৪৫ সালের ৬ তারিখ সোমবার আমেরিকা হিরোশিমাতে প্রথম আণবিক বোমা ফেলার পরে একদিন হঠাৎ পঞ্চাশ ষাট জনের মতো লোক দৌড়ে গ্রামে এসে বলল, যদি জানে বাঁচতে চাও বাঙ্কারের ভিতরে থাকো। আমেরিকানরা হিরোশিমাতে আণবিক বোমা ফেলেছে। চারিদিক দাউ দাউ করে জ্বলে যাচ্ছে। তোমরা বাইরে বেশিক্ষণ থাকবে না। প্লেনের আওয়াজ বা সাইরেনের আওয়াজ শুনলেই বাঙ্কারের ভিতরে বসে থাকবে। এরা সেনাবাহিনীর লোক কিংবা স'ানীয় ভলান্টিয়ার, শহর থেকে এসে সকলকে সাবধান করে দিচ্ছে। চেহারা দেখলে মনে হয় যেন তারা নার্ভাস বোধ করছে। কয়েক রাত না ঘুমালে মানুষের যে চেহারা হয়, তাদের দেখতে তেমন মনে হলো। সাইয়োরির মা বলল, আমাদের গ্রামও জ্বালিয়ে দেবে নাকি? বলুন আমরা কোথায় যাবো? একটি অফিসার দাঁড়িয়ে বলল, এই গ্রামে আঘাৎ করবে বলে মনে হয় না। তবে আপনারা কে নো প্লেনের শব্দ শুনলে বাঙ্কারের ভিতরে যাবেন। অফিসারটি কিছু দূরে যাওয়ার পর সাইয়োরির মা বলল, এই যে শোনেন, আমার আরেকটি প্রশ্ন করার আছে।
--কি প্রশ্ন আপনার, বলুন।
--জাপান কি যুদ্ধে হেরে যাবে মনে করেন?
অফিসারটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে হয়তো কি জবাব দেবে তা ভাবছিল, তারপর দুপা এগিয়ে এসে অনুচ্চ স্বরে বলল, মনে হয় না।
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পাঁচ ছজন সৈনিক এসে বলল, সার্জেন্ট আপনি মহিলাকে ‘মনে হয় না’ বললেন কেন? এ ধরনের কথা পাবলিকের কাছে বলা অন্যায় নয় কি? চিৎকার করে সৈন্যগুলো কথা বলাতে অন্যান্য সৈন্যরাও এগিয়ে এসে বলল, কি হয়েছে? যে সৈন্যটি সার্জেন্টের সাথে কথা বলছিল সে জবাব দিল, কিচ্ছু হয়নি, বলো বান্‌জাই। সবাই বলিষ্ঠ কন্ঠে বলল, বান্‌জাই। --আবার বলো, বান্‌জাই। সবাই একসাথে আবার বান্‌জাই বলল। --থামছো কেন তোমরা বান্‌জাই বলতে বলতে বন্দরের দিকে চলো। --সৈন্যগুলো বান্‌জাই ধ্বনি দিতে দিতে চলে গেল। ইয়ুকি, সাইয়োরি ও তার মা নীরবে তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইল। স-ব্ধতা ভেঙ্গে সাইওরির মা বলল, চল্‌ রেডিওটা অন্‌ করে খবর শুনি।
তারা ঘরে গিয়ে রেডিওটা অন্‌ করল। তখন প্রধানমন্ত্রী তোজো ভাষণ দিচ্ছেন, ‘শত্রু আমাদেরকে আত্মসমর্পণ করার কথা বলছে। কিন' তাদেরকে বলছি যে বিজয় ছাড়া জাপান আর কিছু বোঝেনা। এখন রাতের আকাশ দিয়ে যে সব তারা উড়ে যাচ্ছে সেগুলো আমাদের বীর সেনাবাহিনীর তারা। সেগুলো যখন শত্রুর জাহাজের উপরে আঘাত হানবে তখন কাদার উপর ভারী কিছু পড়লে কাদা যেমন চারিদিকে ছিটকে যায়, ঠিক তেমনি সেই শত্রুদের যুদ্ধজাহাজগুলোকে তারা ধ্বংস করে দেবে এবং দিচ্ছেও। এখন জাপানের সামনে জয়ী হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই।’ উল্লেখ্য যে হিরোশিমা আণবিক বোমা দিয়ে ধ্বংস করার পরে কিংবা পূর্বক্ষণে আমেরিকা জাপানকে আত্মসমর্পণের কথা বলায় প্রধানমন্ত্রী জেনারেল হিদেকি তোজো তাঁর ভাষণে এই বক্তব্য রাখেন।
ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা গেছে তা হল: ওকিনাওয়া হাতছাড়া হওয়ার পরে তোজো আত্মঘাতী কামিকাজে বিমানহামলা শুরু করেছিলেন। তাতে ভালো ফল পাওয়া গিয়েছিল। তখন আমেরিকার অনেক যুদ্ধ জাহাজ কামিকাজে সৈন্যদের আত্মঘাতী বোমার হামলায় ডুবে যায়। এক কথায় বলা যায় যে আমেরিকার নৌবহরকে তারা প্রায় থামিয়ে দিয়েছিল এই কামিকাজে জেরো ফোর্স। জেনারেল ম্যাকআর্থার তখন ফিলিপাইন থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন। তিনি নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর আণবিক বোমা দিয়ে আক্রমণ করার ব্যাপারে অনুমতি চেয়েছিলেন। তার পরেই হিরোশিমাতে তা দিয়ে আঘাত করা হয়।
আত্মসমর্পণের ব্যাপারে তোজোর ভাষণ শুনে তার তিন দিন পরে আমেরিকা দ্বিতীয়বার নাগাসাকিতে আণবিক বোমা দিয়ে আঘাত করে। এর ফলে লাখো লাখো সাধারণ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। কেন পর পর দুটি আণবিক বোমা দিয়ে হামলা করেছিল, তার আসল কারণ জানার জন্য উল্টোভাবে একটু ভেবে দেখলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। তা হল, জাপান আত্মঘাতী হামলা করে আমেরিকার নৌবাহিনীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছিল। সে কথা ম্যাকআর্থার ভালো করেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তার হাতের শেষ তুরুপের কার্ড ‘আণবিক বোমা’ দিয়ে জাপানের উপর আঘাত করেছিল।
সে যাই হোক, দুটি আণবিক বোমা দিয়ে আঘাত করার পরে জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। শোওয়া সম্রাট হিরোহিতো বেতারে ঘোষণা করার পরে জাপানের জনসাধারণ জানতে পারল যে জাপান সত্যিই পরাজয় বরণ করেছে।

তিন

বান্‌জাই শব্দটির মানে ‘জাপানের জয়।’
বাঙ্কার প্রত্যেক বাড়িতে তৈরি করা আছে। ওকিনাওয়াতে ফিরে যাবার আগে ইয়ুকির বাবাও ঘরের পাশে বড় একটি বাঙ্কার করেছিল। সাইয়োরিদের বাড়িতেও অনুরূপ একটি বাঙ্কার রয়েছে।
সাইয়োরি বলল, বঙ্কার দিয়ে কি হবে মা। বাবা মারা গেলেন, ইয়ুকির মা ও বাবা দুজনেই মারা গেলেন। একদিন হয় তো আমরা সাবাই মরে যাবো, তাই না ইয়ুকি? ইয়ুকি বলল, আমি ভাবছি আমাদের বেঁচে থাকলেইবা কি হবে আর মারা গেলেইবা কি হবে। আমার মনে হয় প্রাণের ভয়ে এখানে সেখানে পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে আমাদের মৃত্যু হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তা নয় কি?
সাইয়োরি অস্ফুট স্বরে বলল, চল্‌ আমরা দুজনে একসাথে মরে যাই।
--মরি কি করে বল্‌? মরার কোনো পথ জানা আছে তোর? প্রতি উত্তরে ইয়ুকি বলল। --শোন্‌, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে, সাইয়োরি বলল। যখন সাইরেন বেজে উঠবে এবং যুদ্ধ বিমানের আওয়াজ শুনবো তখন আমরা বাঙ্কারে না লুকিয়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবো। আগুনে বোমা ফেললে আমরা দুজন একসাথে মরে যাবো। ইয়ুকি বলল, এমন সুন্দর ধারণা কি করে তোর মাথায় এলো। ঠিক আছে আমরা মরলে এই গ্রামেই মরবো।
তারপর সাইয়োরি এবং ইয়ুকি প্রতিজ্ঞা করল। সাইয়োরির মা নানা চিন-া-ভাবনায় ঘুমাতে পারছিল না। সাইয়োরির ও ইয়ুকির কথাগুলো শুনে রেগে গিয়ে বলল, এমন ধরনের অলক্ষুণে কথা বলবি না, যা আমার চিন-ার কারণ হয়, বুঝলি?
সাইয়োরি বলল, মা আমাদের তো কেউ নেই। আমাদের ঘরে খাবারও নেই। এসব কথা যখন ভাবি তখন ভালো লাগে না, মা। --শোন্‌ যুদ্ধ শেষ হয়েছে, আজ সন্ধ্যায় সম্রাট শোওয়া সেকথা রেডিওতে ঘোষণা করেছেন। --তা হলে আমাদের এখন কি করতে হবে মা? বাজারে চাউল, আটা কিনতে পাওয়া যাবে? --তা জানি না। তবে যুদ্ধে জাপান হেরে গেছে। এর পর কি হয় কে জানে। হয়তোবা পরিসি'তি ধীরে ধীরে ভালো হবে। --তাহলে আমেরিকার সৈন্যরা আমাদের গ্রামে বোমা ফেলবে না? --হয়তো না, তবুও ভয়ের কারণ আছে। --কিসের ভয়? --খাদ্যাভাব! আমেরিকার বোমাতে আর মরণের সম্ভাবনা নেই। তবে উপোস করতে হবে। --মা শহরে গেলে খাবার কিনতে পারবো না? সাইয়োরি জিজ্ঞেস করল। --শহরে খাবার থাকলে তো কিন্‌ বি। সে যাই হোক, এখন তোরা ঘুমা, অনেক রাত হয়েছে। কিন' মায়ের কথা শুনে সাইয়োরি শান- হল না। বলল, মা আমাদের বাড়ির পিছনের জমি থেকে মিষ্টি আলু তুলে নিয়ে গেছে। আমার মনে হয় মাটির নিচে কিছু হলেও আলু পাওয়া যাবে। আমরা সকালে কোদাল নিয়ে মাটি খুঁড়ে আলু পাই কিনা দেখবো কি? সাইয়োরির মা বিরক্ত হয়ে বলল, সে ভাবনা কাল ভাবা যাবে, এখন তোরা ঘুমা। সকালে সাইয়োরি ও ইয়ুকি একসঙ্গে বাড়ির অনতিদূরে একটি জমিতে আলু খুঁজতে গেল। সাপ্তাহ খানেক আগে এই জমির আলু তোলার কাজ শেষ হয়েছে। সেই জমিতে এই শিশু দু’ট কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। কিন' আলু নেই। উঠানো আলু গাছ গুলিতে ছোট ছোট কিছু আলু রয়েছে। সেগুলো সংগ্রহ করে দুজনে ঘরের সামনে গিয়ে দেখে দরজার সামনে দুজন আমেরিকার সৈন্য দাঁড়িয়েছে আছে। ঘরের দরজা ভিতর থেকে আটকানো রয়েছে। ভয় এবং বিস্ময়ে সাইয়োরি চিৎকার করে মা, মা বলে ডাক দিল। ইয়ুকি বিদেশী সৈন্য দেখে কান্না শুরু করল।
সৈন্য দুজন তাদের ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ থাকার জন্য ইঙ্গিত করল। কিন' সাইয়োরির কান্না থামল না, সে মা মা বলে তখন চিৎকার করছে। ইত্যবসরে ঘরের ভিতর থেকে একজন সৈন্য বের হয়ে এলো। তারপর দ্বিতীয় জন প্রবেশ করল, সে বের হয়ে আসার পরে তৃতীয় জন প্রবেশ করল। মাত্র পনের-বিশ মিনিটের মধ্যে সাইয়োরির মাকে পর পর তিনজন সৈন্য ধর্ষণ করল। সৈন্যগুলো সাইয়োরি ও ইয়ুকিকে গার্ড দিয়ে রেখেছিল। যাতে তারা ঘরে ঢুকতে না পারে। তারপরে তিনজন সৈন্য তাদের দুজনকে ছেড়ে দিয়ে বন্দরের দিকে দ্রুত হেঁটে চলে গেল। অনাহার আর অর্ধাহারে সাইয়োরির মা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। চিৎকার করার শক্তিও তখন তার তার ছিল না। সে বেহুঁশ হয়ে বিছানায় পড়ে রইল। এদিকে শিশু দুটি ঘরে প্রবেশ করে মহিলার এমন অবস'া দেখে প্রথমে মনে করেছিল যে সৈন্যগুলো সাইয়োরির মাকে হত্যা করে চলে গেছে। সাইয়োরি মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে মা বলে ডাক দিল। কিন' সাইয়ুরির মা কোনো জবাব দিল না। তারপর আবার মা মা বলে ডাক দেওয়ার পরে সাইয়োরির মা চোখ মেলে দেখল। কিন' কোনো কথা বলতে পারল না। এবার ইয়ুকি ডাক দিল, খালা, আমরা আলু নিয়ে এসেছি আপনি উঠুন। সাইয়োরির মা এক হাত তুলে ইঙ্গিত করে বললেন, তোরা বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর্‌। আমি ডাক দিলে ঘরে আসবি। এখন তোরা ঘরের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা কর্‌। বোবার মতো মেয়ে দুটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ব্যাপার কি বোঝার চেষ্টা করছিল। তারপর দুজন ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রায় দশ মিনিট পরে তাদের ডাক দেওয়ায় পুনরায় তারা ঘরে প্রবেশ করল। ইতিমধ্যে সাইয়োরির মা কাপড় বদলিয়ে বিছানাতে অর্ধশায়িত অবস'ায় শুয়ে রয়েছে। প্রথমে সাইয়োরি বলল, মা লোকগুলো কি তোমায় মেরেছে? --হ্যাঁ মেরেছে। সাইয়োরির মা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন। --কিন' তারা কেন তোমায় মারল আমাদের বলো? সাইয়োরির মা মেয়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে ক্ষীণকন্ঠে বলল, সকালে তোরা কিছুই খাস্‌ নি। আমার সারা শরীরে ব্যথা করছে। তোরা আলুগুলো কুচিকুচি করে কেটে ঘরে যে সামান্য চাউল রয়েছে সেগুলোর সাথে মিশিয়ে সিদ্ধ কর্‌। সেদিন সাইয়োরির মা সারাদিন কিছু খায়নি। সে সন্ধ্যায় বিছানা থেকে উঠে চারিদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল। তখন তার মনে সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। বাড়ির দক্ষিণ পাশ দিয়ে যে রাস-াটি গিয়েছে, সেখানে কয়েক জন লোক ফিস্‌ ফিস্‌ করে নিচুস্বরে কথা বলছে। সাইয়োরির মা বুঝতে পারল যে এরা আমেরিকার সৈন্য ছাড়া আর কেউ নয়। ইতিমধ্যে গ্রাম্য বন্দরটিতে একটি গান বোট নোঙ্গর করেছে। সে কথা পাশের বাড়ির কিছু লোক বলাবলি করছিল। সে মনে করল যে একবার যেহেতু তিন জন এসে তার উপর বলাৎকার করেছে, তাদের কাছ থেকে শুনে অন্যান্য হায়েনাগুলোও আসবে। তাই সাইয়োরির মা মনোসি'র করে ফেলল। কি ব্যাপারে মনোসি'র করল সে কথা শিশু দুটিকে কিছুই বলল না, বুঝতেও দিল না। কিন' মুহূর্তের মধ্যে মনোবল হারিয়ে তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। (চলবে)
 
 
 
     
[Back]  
Untitled Document
 
 
Designed & Developed by Doshdik Media Ltd.
Japan address:
Akiba Mitaki-kan, 4F,Sotokanda 4-5-5,Chiyoda-ku,Tokyo 101-0021, Japan
Phone: +81-3-3255-5861 Fax: +81-3-3255-5862 E-mail: info@doshdik.com
Bangladesh Address:
House# 2, Road# 7, Sector# 3, Uttara Model Town, Dhaka-1230, Bangladesh Phone: +880-2-8919351,
+880-2-8956608,Fax: +880-2-8963402,E-mail: info@doshdik.com
Home | About Us| Advertise | Terms & Conditions| Contact Us
©Doshdik Media Limited. All rights reserved.